হোয়াইট হাউজ : বিশ্বের ক্ষমতাধর ব্যক্তির চোখধাঁধানো অট্টালিকা

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : হোয়াইট হাউজ ঃ দুইশত বছরের ঐতিহ্যেমাখা সাদা বাড়ি



হোয়াইট হাউজ

হোয়াইট হাউজ, ওয়াশিংটন ডিসি। ছবি : সিএনএন


 এই মুহূর্তে যদি কাউকে জিজ্ঞেস করা হয় বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি কে? কিংবা আরও নির্দিষ্ট করে যদি জানতে হওয়া সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপ্রধানের নাম? সে আর কেউ নয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট। নির্দ্বিধায় সবাইই এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে। গেল প্রায় একশতক ধরে বৈশ্বিক ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান করছে এই রাষ্ট্রটি। দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধ, স্নায়ুযুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধসহ গত একশ বছরে সবচেয়ে বেশি যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে এই দেশটি। সামরিক এবং অর্থনৈতিক দু-দিক থেকেই রাষ্ট্রটির অভূতপূর্ব পরিবর্তন হয়েছে। আজ থেকে প্রায় ২৪৪ বছর আগে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে দেশটি। এরপর থেকে ধীরে ধীরে বৈশ্বিক ক্ষমতার কেন্দ্রে উন্নীত হতে থাকে। আর প্রেসিডেন্সিয়াল এই দেশটির রাষ্ট্রপ্রধানকেই বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট কিংবা কোনো রাজনৈতিক বিষয়ে আজ আলোচনা করা হচ্ছে না।

ট্রাভেল বাংলাদেশের পাঠকদের আজকে বলা হবে এই ক্ষমতাধর ব্যক্তির রাষ্ট্রীয় বাসস্থানের বিস্ময়কর সব গল্প। যেহেতু তিনিই সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি, তাই তার থাকার স্থানটিও যে তেমন সুরক্ষিত হবে তা বলাই বাহুল্য। এককালে রাজ-রাজাদের রাজমহলকে নিরাপদ রাখা হতো চারিপাশে দুর্গ নির্মাণ করে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবনটির চারপাশের তেমন উঁচু দুর্গ দেখা না গেলেও, এই বাসভবনকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে নিরাপদ বাড়ি হিসেবেই বিবেচনা করা হয়ে থাকে। সাদা বাড়ি বললে কেউ হয়তো চিনবে না, তবে যদি বলা হোয়াইট হাউজ! এক শব্দেই সবার চিন্তায় ভেসে উঠবে ২০০ বছরের পুরাতন বাড়িটির ছবি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির ১৬০০ পেনসিলভানিয়া এভিনিউয়ে অবস্থিত মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই কার্যালয় ও বাসভবন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই রাষ্ট্রপ্রধানের ভবনে দর্শণার্থীরাও ভ্রমণের সুযোগ পান।


হোয়াইট হাউজ এর নকশা

হোয়াইট হাউজ। ছবি : দা সান


 

হোয়াইট হাউজ এর নির্মান ইতিহাস

স্বাধীন হবার পর ১৭৯১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন হোয়াইট হাউজ নির্মাণের জায়গা নির্বাচন করেন। এর নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৭৯২ সালের ১৩ অক্টোবর। হোয়াইট হাউজের নকশার জন্য স্থপতিদের মধ্যে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। সেই প্রতিযোগিতায় জয়ী হন আইরিশ বংশদ্ভূত স্থপতি জেমস হোবান। প্রেসিডেন্ট ওয়াশিংটন স্থপতিদের দেয়া নকশাগুলোর অন্তত ছয়টি নকশা থেকে হোবানের জর্জিয়ান ঘরানার সুবিশাল অট্টালিকার নকশাটি বেছে নেন। এর থেকেই যাত্রা শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের আইকনিক এই ভবনটির। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, এই বাসভবনে বাস করতে পারেননি জর্জ ওয়াশিংটন।

দুর্দান্ত এই বাসভবনে রয়েছে ৬টি ফ্লোর, ১৩২টি কক্ষ, ৩৫টি বাথরুম। এছাড়া ৪১২টি দরজা, ১৪৭টি জানালা, ২৮টি ফায়ারপ্লেস, ৮টি সিঁড়ি এবং ৩টি লিফট রয়েছে। হোয়াইট হাউজ তিনটি অংশে বিভক্ত। দুই পাশে ইস্ট উইং ও ওয়েস্ট উইং এবং মাঝখানে এক্সিকিউটিভ রেসিডেন্স অংশ। গুরুত্বপূর্ণ কক্ষগুলোর বেশিরভাগই ওয়েস্ট উইংয়ে অবস্থিত। এগুলোর মধ্যে ওভাল অফিস, সিচুয়েশন রুম, রুজভেল্ট রুম উল্লেখযোগ্য। এছাড়া এক্সিকিউটিভ রেসিডেন্স ও ইস্ট উইংয়েও রয়েছে আকর্ষণীয় বেশ কিছু কক্ষ। তবে, যতটুকু জানা যায় তারথেকেও কিছু লুকানো বৈশিষ্ট্য রয়েছে এই বাসভবনের। নিরাপত্তার স্বার্থে যা জানা যায়নি।


হোয়াইট হাউজের ওভাল অফিসে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা

হোয়াইট হাউজের ওভাল অফিসে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ছবি : উইকিমিডিয়া কমন্স



ওভাল অফিস

মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রধান কার্যালয় হলো হোয়াইট হাউজের এই ওভাল অফিস। এখানে রয়েছে বিখ্যাত ‘রেজলুট ডেস্ক’। এছাড়া বিভিন্ন পেইন্টিংস, আবক্ষ মূর্তি ও অন্যান্য অলঙ্কার দিয়ে পরিপূর্ণ এই কক্ষটি। প্রেসিডেন্টরা তাদের ব্যক্তিগত পছন্দ অনুসারে এই কক্ষটি সাজিয়ে থাকেন। ওভাল অফিসের ঠিক সামনেই রয়েছে হোয়াইট হাউজ গার্ডেন। এই জায়গাটি ব্যবহার করা হয় কোনো বিশেষ অনুষ্ঠান পালনের জন্য। হোয়াইট হাউজে আগত অতিথিদের শুভেচ্ছা জানানোর কাজটিও করা হয় এখানে।


সিচুয়েশন রুম

বিন লাদেন থেকে সোলাইমানিকে হত্যার নীল নকশা করার সিচুয়েশন রুম। ছবি : দা বোস্টন গ্লোভ



সিচুয়েশন রুম

প্রায় ৫ হাজার বর্গ ফুটেরও বেশি জায়গাজুড়ে ওয়েস্ট উইংয়ের বেসমেন্টে অবস্থিত সিচুয়েশন কক্ষটি। একে সিচুয়েশন রুম বলা হলেও এটি প্রকৃতপক্ষে কয়েকটি কক্ষ নিয়ে গঠিত। ১৯৬১ সালে প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির সময়ে এই কক্ষটি নির্মিত হয়। সিচুয়েশন রুমে বর্তমানে দুটি কনফারেন্স রুম আছে। একটিতে ৪০টি আসন রয়েছে। অন্যটি তুলনামূলক ছোট যেখানে বসে ২০১১ সালের মে মাসে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও তার প্রশাসনের কর্মকর্তারা মার্কিন সেনাবাহিনীর দ্বারা ওসামা বিন লাদেনের হত্যার অভিযান পর্যবেক্ষণ করছিলেন।


প্রেস ব্রিফিং রুম

প্রেস ব্রিফিং রুম। ছবি : সংগৃহীত



প্রেস ব্রিফিং রুম

‘জেমস এস ব্র্যাডি প্রেস ব্রিফিং রুম’ নামেই পরিচিত হোয়াইট হাউজের প্রেস ব্রিফিং রুম। সাবেক হোয়াইট হাউজ প্রেস সচিব জেমস ব্র্যাডিকে সম্মান জানিয়ে ২০০০ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এই কক্ষের নামকরণ করেন। জেমস ব্র্যাডি প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান প্রশাসনের প্রেস সচিব ছিলেন। ১৯৮১ সালে রোনাল্ড রিগ্যানকে গুলিবিদ্ধ করে হত্যাচেষ্টা করার সময় ব্র্যাডি মারাত্মকভাবে আহত হন। এরপর তাকে সারাজীবন হুইল চেয়ারে বসে কাটাতে হয়।

ব্যায়ামাগার

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ব্যায়াম করতে বাইরে যাবেন! বললে কেমন যেন শুনায় না। হোয়াইট হাউজে কোনো জিম থাকবে না তাও তো হতে পারে না। তাই মিউজিক রুমের পাশেই রয়েছে একটি জিম বা ব্যায়ামের কক্ষ। প্রেসিডেন্ট ও তার পরিবারের সদস্যরা দিনের যেকোনো সময় এখানে এসে ব্যায়াম করতে পারেন। নব্বইয়ের দশকের আগে এই কক্ষটিকে অতিথিদের বসার কক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হতো।



চকোলেট শপ, হোয়াইট হাউজ

চকোলেট শপ, হোয়াইট হাউজ। ছবি : সংগৃহীত



চকলেট শপ

হোয়াইট হাউজের রয়েছে আকর্ষণীয় রান্নাঘর, যা রেসিডেন্সের নীচতলায় অবস্থিত। এখানকার শেফ বা পাচকরা বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে ডেজার্ট জাতীয় খাবার প্রস্তুত করেন। তারা ইস্টার এগ রোল উপলক্ষে ডিমও প্রস্তুত করেন। এছাড়া হোয়াইট হাউজের রেপ্লিকাও তৈরি করেন তারা, যা ছুটির সময়ে একটি দর্শনীয় বস্তু হিসেবে কাজ করে।

ফ্যামিলি থিয়েটার

হোয়াইট হাউজের ইস্ট উইংয়ে রয়েছে থিয়েটার। মার্কিন প্রেসিডেন্ট পরিবারের সদস্যরা দিনের যেকোনো সময় এখানে এসে যেকোনো মুভি দেখতে পারেন। এমনকি কোনো মুভি মুক্তি পাওয়ার আগেই তাদের দেখার সুযোগ রয়েছে। ফ্রাংকলিন ডি রুজভেল্ট এই থিয়েটারটি তৈরি করেন।


হোয়াইট হাউজ ফ্যামিলি থিয়েটার

হোয়াইট হাউজ ফ্যামিলি থিয়েটার। ছবি : সংগৃহীত


এসব ছাড়াও মার্কিন প্রেসিডেন্টের বাসভবনটিতে রয়েছে আরও অনেক চমক। রয়েছে ব্লুরুম, ইস্ট রুম, ম্যাপ রুমসহ আরও অনেক অনেক সুবিধা। বলতে গেলে জাগতিক সবধরনের সুবিধাই রয়েছে এই বাসভবনে। এই বাসভবনটি সবচেয়ে নিরাপদ বাসভবন হিসেবেই বিবেচিত। একে প্রথম দিকে 'প্রেসিডেন্ট প্যালেস', 'প্রেসিডেন্ট হাউজ', 'এক্সিকিউটিভ ম্যানশন' ইত্যাদি নামে ডাকা হতো। ১৯০১ সালে প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট আনুষ্ঠানিকভাবে এর নাম হোয়াইট হাউজ রাখেন। হোয়াইট হাউজের দেয়াল রঙ করার জন্য ৫৭০ গ্যালন রঙের প্রয়োজন হয়।  

নাবিলা বুশরা   এস এম