ডে অব দ্যা ডেড : মৃতদের প্রতি উৎসর্গকৃত ধর্মীয় এক উৎসব

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : ডে অব দ্যা ডেড

ডে অব দ্যা ডেড

ছবি : সংগৃহীত


হাজার বছর ধরে মানুষের মনে ঘুরে ফিরে আসা একটা বিষয় হচ্ছে মৃত্যু পরবর্তী জীবন। ক্ষণস্থায়ী এই জীবনের পরের অধ্যায় বা মৃত্যু পরবর্তী জীবন এর ধারনা মানুষের মাঝে প্রথম কবে এসেছে তা হয়তো আমাদের জানা নেই। তবে প্রায় ৫ হাজার বছর পূর্বে মৃত্যুর পরেও মানুষের জীবনকে ধরে রাখার উদ্দেশ্যে মিশরে যে পিরামিড নির্মাণের সূচনা তা থেকে বুঝা যায় মানুষের মাঝে এই ধারণার ইতিহাস ও মৃত্যুর পরেও নিজের আত্মাকে পৃথিবীর মাঝে ধরে রাখার প্রচেষ্টা বেশ প্রাচীন। বিভিন্ন ধর্মে মৃত্যু পরবর্তী জীবন নিয়ে বিভিন্ন মতামত রয়েছে, রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাস। এই যেমন মেক্সিকোতে মৃতদের নিজ নিজ সম্প্রদায়ের অংশ হিসেবেই দেখা হয়।

জীবিতদের স্মৃতি এবং আত্মার মধ্য দিয়ে মৃত ব্যক্তিরা চিরস্থায়িত্ব লাভ করে বলেই এদের বিশ্বাস। আর এসব আত্মার উদ্দেশ্যে এখানে পালন করা হয় তিনদিন ব্যাপী ঐতিহ্যবাহী এক উৎসব। দিনটিকে বলা হয়, ডে অব দ্যা ডেড (Day of the Dead)। চলুন জেনে আসা যাক ডে অব দ্যা ডেড নিয়ে কিছু কথা… ডে অব দ্যা ডেড ইউনেস্কো স্বীকৃত একটি ধর্মীয় প্রথা। কয়েক হাজার বছর পুরনো এই প্রথা আজও পালন করা হয় ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে। এই উৎসবের উদ্দেশ্য হচ্ছে পরিবারের মৃত সদস্যদের আত্মার শান্তি ও চিরস্থায়িত্বের উদ্দেশ্যে। জীবন ও মৃত্যুর এক উৎসব হিসেবেই এটি পরিচিত। এই বিশ্বাসীদের মতে মৃতদের প্রতি শোক করা মানে তাঁদের অশ্রদ্ধা করা। কেননা আত্মা ও মানুষের স্মৃতির মধ্য দিয়ে তারা এখনও বেঁচে আছে। যা তাঁদের এই সমাজ এবং সম্প্রদায়ের অংশ হিসেবেই স্বীকার করছে। আর এই ডে অব দ্যা ডেড উৎসবের সময় তারা পৃথিবীতে ফিরে আসে বলে বিশ্বাস রয়েছে এই সম্প্রদায়ের মধ্যে।


ইতিহাস

প্রায় ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ বছর পূর্বে চালু হওয়া এই উৎসবটি আজটেক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নবম মাসে অর্থাৎ আগস্ট মাসের শুরুতে পালিত হতো। প্রায় ১ মাসজুড়ে এই উৎসব চলতো। বৈচিত্র্যময় এই প্রাচীন উৎসবটি লেডি অব দ্যা ডেড হিসেবে পরিচিত দেবী লা ক্যালাভেরা ক্যাটরিনার প্রতি উৎসর্গ করা হয়।




ছবি : সংগৃহীত


বিংশ শতাব্দীতে এসে ম্যাক্সিকোর প্রায় প্রত্যেকটি অঞ্চলেই নভেম্বরের ১ তারিখে মৃত শিশুদের প্রতি এবং নভেম্বরের ২ তারিখে বয়স্ক মৃতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে উৎসব পালনের রীতি চালু হয়। শিশুদের জন্য পালিত এই দিনকে বলা হতো ডে অব দ্যা এঞ্জেল বা ডে অব দ্যা ইনোসেন্টস। বর্তমানে অক্টোবরের ৩১ তারিখ হতে নভেম্বরের ২ তারিখ পর্যন্ত এই উৎসবটি পালিত হয় এবং জাতীয় উৎসব হিসেবে সরকারি ছুটিও পালন করা হয়।


আয়োজন

বিচিত্র রকমের মুখোশ, কঙ্কাল, খুলি, রঙিন পোশাক, ফুল, আলোকসজ্জা, ফুল, ফলমূল, খাবার দাবার সহ বর্ণিল এক আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই মেক্সিকোর এই জাতীয় উৎসবটি পালিত হয়। গান গেয়ে, কবিতা আবৃতি এবং প্রার্থনার মধ্য দিয়ে মৃত সদস্যদের আত্মার প্রতি সম্মান জানায় উৎসবে অংশগ্রহণকারীরা। মৃতদের সমাধিস্থলে জড়ো হয়ে কিংবা বাসায় বসেও অনেকে এই প্রার্থনার আয়োজন করে। সমাধিস্থলে আসার সময় ফুল এবং বিভিন্ন জিনিশ দিয়ে তৈরি বেদীর পাশাপাশি বাচ্চাদের জন্য বিভিন্ন রকমের খেলনা এবং বয়স্কদের জন্য টাকিলা এবং বিভিন্ন পানীয় নিয়ে আসা হয়। যদিও শহর ও অঞ্চল বেদে এই আয়োজন ও উৎসবের ভিন্নতাও রয়েছে।


ডে অব দ্যা ডেড

ছবি : সংগৃহীত


 ম্যাক্সিকোর বাহিরেও ব্রাজিল, ইকুয়েডর, গুয়েতমালা, পেরুসহ আমেরিকার বিভিন্ন দেশ, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, ফিজি, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশেই পালিত হয়ে থাকে ডে অব দ্যা ডেড উৎসবটি। তবে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন আচার এবং আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই উৎসবটি পালিত হয়ে থাকে। নিজ পরিবারের মৃৎ সদস্যদের কবরকে তাঁদের ছবি, খাবার, ফুল ও মোমবাতিসহ নানান সাজ-সজ্জায় সজ্জিত করা হয়। বর্ণিল এই উৎসব ঘিরে চলে নানান আয়োজন। এবং এই আয়োজনকে ঘিরে এখানে জড়ো হয় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের পর্যটকেরাও।  

সাখাওয়াত হোসেন   এস এম