যেভাবে সূচনা হয়েছিল বাঙালির ঐতিহ্য মঙ্গল শোভাযাত্রার

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : মঙ্গল শোভাযাত্রা: পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রার শুরুটা চারুকলায় নয়, হয়েছিল অন্যত্র



মঙ্গল শোভাযাত্রা

মঙ্গল শোভাযাত্রা। ছবি : স্ক্রল ইন


 নববর্ষ বাঙালির সংস্কৃতির অন্যতম বৃহৎ ঐতিহ্য। বাঙালি চেতনার, বাঙালির আত্মপরিচয়ের অনুষঙ্গ, ধর্মনিরপেক্ষ সর্বজনীন মহোৎসব এই নববর্ষ। হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানসহ বাংলার আপামর জনতার কাছে পহেলা বৈশাখ হচ্ছে এক মিলনমেলার নাম। দেশজুড়ে সমগ্র মানুষের মধ্যে জরাজীর্ণ, পুরনোকে ভুলে নতুন সাজ-বাজনায়, খাবারে, নতুন দিনের মঙ্গল বন্দনার মধ্য দিয়ে বাংলার চিরায়ত রূপ ফুটে ওঠার নাম নববর্ষ। দেশের বহু সম্প্রদায়, বর্ণ, গোত্রের বাঙালি ভাষাভাষীর মধ্যে আত্মিক যোগাযোগের মধ্য দিয়ে যাপিত জীবনের উজ্জ্বল প্রকাশে এই যে পরিচয় দাঁড় হয়েছে, তার পেছনের গল্পে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত হয়েছে নানা অনুষঙ্গ ও উপাদান। এক সময়ের শান্তির আহ্বানে উদযাপিত লোক উৎসব বদলে গেছে আলোর পথে হাঁটার প্রত্যয়ে। এই পথে মুক্তি পেয়েছে প্রতিবাদ। নববর্ষ কেবল কোনো উৎসবই নয়, এটা এক আত্মিক শক্তির নাম। বাঙালি জাতিসত্তাকে জানান দেয় এই উৎসব। পশ্চিমা ধারা, মৌলবাদ-উগ্রবাদের ভয়ানক ছোবল এবং আর যা কিছু বাঙালি সংস্কৃতিকে তুচ্ছ করার হাওয়া জোগায়, তার বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে অভয় দেয় সর্বজনীন এই উৎসব। আর এই উৎসবের সবচেয়ে অন্যতম আমেজ হলো মঙ্গল শোভাযাত্রা। যা ২০১৬ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্থান করে নেয়। বাঙাকি জাতির স্বাতন্ত্র পরিচয়ের মধ্যে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা অন্যতম। ট্রাভেল বাংলাদেশের পাঠকদের আজ জানানো হবে ঠিক কীভাবে সূচনা হয়েছিল এই মঙ্গল শোভাযাত্রা।


মঙ্গল শোভাযাত্রা

শুরুর দিককার মঙ্গল শোভাযাত্রার পোস্টার। ছবি : সংগৃহীত



মঙ্গল শোভাযাত্রা : ইতিহাস

বর্তমান বাংলাদেশ একদিনে গড়ে ওঠেনি, শত শত বছর পরাধীন থাকতে হয়েছে এই জাতিকে। ১৯৭১ সালে ন’মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। সেই স্বাধীনতার পরেও এদেশের মানুষ স্বাধীন হতে পারেনি। উগ্র ধর্মান্ধ ও স্বৈরতন্ত্রের শৃঙ্খল ভাঙতে পারেনি। এমনকি যে মানুষটার নেতৃত্বে দেশটা স্বাধীন হলো তাকেও হত্যা করলো এদেশেরই কিছু বিপথগামী মানুষ। তবে, আজ সেই অবস্থা থেকে অনেকটা বর্তমানটা উন্নত অনেকট। ধর্মীয় উগ্রতাকে রক্তচক্ষু দেখিয়ে বাঙালি চেতনাকে বুক চিতিয়ে ঠিকই সামনে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বাঙালি চেতনা সর্বদাই দেশের মানুষকে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহস জুটিয়েছে। ঠিক যেমন ১৯৮৫ সালে স্বৈরাচারী এরশাদের ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় সূচনা হয় মঙ্গল শোভাযাত্রার।

চারুপীঠের হাত ধরেই শুরু হয়েছিল প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রার

১৯৮৫ সালে চারুকলার পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে কিছু তরুণ ফিরে গিয়েছিল নিজ শহর যশোরে। রঙ, পেন্সিল আর কাদামাটি দিয়ে শিশুদের শৈশব রাঙানোর উদ্দেশ্যে তারা চারুপীঠ নামে একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিল। এই চারুপীঠে তাঁদের হাত ধরেই শুরু হয়েছিল প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রার। অনেকে মঙ্গল শোভাযাত্রার সূচনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাত ধরেই বলেই জানতেন, তবে তা সঠিক না। যদিও এর সূচনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটের শিক্ষার্থীদের হাত ধরেই হয়েছিল। শুরুটা হয়েছিল হুট করে প্ল্যানের মাধ্যমে। বাংলা নতুন বছরকে বরণ করে নিতে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে। চৈত্রের শেষ রাতে পুরো যশোর শহরজুড়ে আলপনা আঁকতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সবাই। একটা মিছিল বের করার ও পরিকল্পনা হয়েছিল : একটা শোভাযাত্রা। তবে, তারা তখন হয়তো জানতেন না যে তাঁদের এই শোভাযাত্রা একদিন জাতীয় উৎসবে পরিণত হবে। স্বীকৃতি পাবে, ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হবে।


মঙ্গল শোভাযাত্রা

শুরুর দিককার মঙ্গল শোভাযাত্রার পোস্টার। ছবি : সংগৃহীত


শোভাযাত্রার পরিকল্পনাতেই থেমে ছিল না তারা, জিনিসপত্রও বানানো শুরু করলো। পরী, পাখি এবং বাঘের মুখোশ বানানো হলো। পরদিন ভোর বেলায় যশোর শহর দেখল এক অদ্ভুত দৃশ্য! একদল ছেলে মেয়ে পাঞ্জাবি আর শাড়ি পরে সানাইয়ের সুরে, ঢাকের তালে মুখোশ আর ফেস্টুন নিয়ে নেচে গেয়ে পুরো শহর ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর এভাবেই জন্ম হল মঙ্গল শোভাযাত্রার। শুরুতে যে উৎসবের নাম ছিল বর্ষবরণ শোভাযাত্রা।


১৯৮৫-৮৬ সালের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্যোক্তা

১৯৮৯ সালে চারুকলা অনুষদের ডিন ও শোভাযাত্রা শুরুর অন্যতম উদ্যোক্তা নিসার হোসেন শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তিনি জানান, ১৯৮৫-৮৬ সালের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্যোক্তা। তিনি জানান, এরা ১৯৮৮ সালের বন্যায় কিছু কাজ করেছিল। সেই সময় তাদের চারুশিল্পী সংসদ সহায়তা করেছিল। শিক্ষকেরা পেছনে ছিলেন, কিন্তু সব কাজ হয়েছে শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে। ১৯৮৯ সালে বঙ্গাব্দ ১৩৯৬ বর্ষবরণের সময় শিক্ষার্থীদের আয়োজনে প্রথম ঢাকায় শুরু হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শুরু হলেও মঙ্গল শোভাযাত্রা প্রথম হয় ১৯৮৯ সালে।


লক্ষ্মীসরা

প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রার পোস্টার করেছিলেন চারুকলার পেইন্টিং ডিপার্টমেন্টের ছাত্র সাইদুল হক জুইস। ‘লক্ষ্মীসরা’ ছিল সেই পোস্টারের প্রতিপাদ্য। তখন কেউ খুব ভালো মুখোশ বানাতে পারতেন না। অতঃপর দৃশ্যপটে হাজির হলেন তরুণ ঘোষ। বিদেশে মাস্টার্স করতে গিয়ে তিনি মুখোশ বানানো শিখে এসেছিলেন। ব্যাস আর কি লাগে!



ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রা। ছবি : দ্যা ডেইলি স্টার


 এভাবে শুরু হওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রার পুরো অনুষ্ঠানের ১৯৯১ সালে সাথে যুক্ত হয় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। ঐ বছরই সবার অংশগ্রহণে একটি জাতীয় উৎসবের পরিকল্পনা শুরু হয়। সেই শোভাযাত্রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর, বিশিষ্ট লেখক, শিল্পীগণ-সহ সাধারণ নাগরিকরা অংশ নেয়। সে বছরেই বিশালকায় হাতি সহ বেশ কিছু বাঘের প্রতিকৃতির কারুকর্ম স্থান পায় মঙ্গল শোভাযাত্রায়। ছিল কৃত্রিম ঢাক আর অসংখ্য মুখোশ দিয়ে তৈরি প্ল্যাকার্ডসহ মিছিলটি নিয়ে একদল ছেলে মেয়ে নাচে গানে উৎসব মুখর পরিবেশ সৃষ্টি করে।

১৯৯২ সালে মঙ্গল শোভাযাত্রার একদম সামনে রং ছাত্র ছাত্রীদের কাঁধে ছিল বিরাট আকারের একটি কুমির। বাঁশ এবং নানা রং এর কাপড় দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল কুমিরটি। ইংরেজি ১৯৯৩ সালের বর্ষবরণ ছিল বঙ্গাব্দ ১৪০০ সালের সূচনা। আর সে উপলক্ষ্যে ‘১৪০০ সাল উদযাপন কমিটি’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরর চারুকলা ইন্সটিটিউটের সামনে থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করে। শোভাযাত্রার আকর্ষণ ছিল বাঘ, হাতি, ময়ূর, ঘোড়া সহ আরও বিভিন্ন ধরনের মুখোশ।


প্রস্তুতকৃত মুখোশ-ফেস্টুন

মঙ্গল শোভাযাত্রার জন্যে প্রস্তুতকৃত মুখোশ-ফেস্টুন। ছবি : দ্য ডেইলি স্টার


চারুকলার সামনে থেকে শোভাযাত্রাটি শুরু হয়ে শাহবাগ মোড় দিয়ে শিশু একাডেমি হয়ে আবার চারুকলায় এসে শেষ হয়। এই বছর থেকেই মঙ্গল শোভাযাত্রা বাংলাদেশে বাঙালির জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়। আর এরপর দাবানলের মত সেটি ছড়িয়ে পরে ‍পুরো বাংলাদেশে। বর্তমানে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা দেশের প্রায় সব জেলায় প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে বের হয়। অশুভ শক্তির বিরূদ্ধে শান্তি, গণতন্ত্র ও বাঙালি জাতিসত্বার ঐক্যের প্রতীক হিসেবে মঙ্গল শোভাযাত্রা আজ বাঙালি জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।  


নাবিলা বুশরা   এস এম