যেভাবে সূচনা হয়েছিল বাঙালির ঐতিহ্য মঙ্গল শোভাযাত্রার
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : মঙ্গল শোভাযাত্রা: পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রার শুরুটা চারুকলায় নয়, হয়েছিল অন্যত্র


মঙ্গল শোভাযাত্রা : ইতিহাস
বর্তমান বাংলাদেশ একদিনে গড়ে ওঠেনি, শত শত বছর পরাধীন থাকতে হয়েছে এই জাতিকে। ১৯৭১ সালে ন’মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। সেই স্বাধীনতার পরেও এদেশের মানুষ স্বাধীন হতে পারেনি। উগ্র ধর্মান্ধ ও স্বৈরতন্ত্রের শৃঙ্খল ভাঙতে পারেনি। এমনকি যে মানুষটার নেতৃত্বে দেশটা স্বাধীন হলো তাকেও হত্যা করলো এদেশেরই কিছু বিপথগামী মানুষ। তবে, আজ সেই অবস্থা থেকে অনেকটা বর্তমানটা উন্নত অনেকট। ধর্মীয় উগ্রতাকে রক্তচক্ষু দেখিয়ে বাঙালি চেতনাকে বুক চিতিয়ে ঠিকই সামনে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বাঙালি চেতনা সর্বদাই দেশের মানুষকে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহস জুটিয়েছে। ঠিক যেমন ১৯৮৫ সালে স্বৈরাচারী এরশাদের ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় সূচনা হয় মঙ্গল শোভাযাত্রার।চারুপীঠের হাত ধরেই শুরু হয়েছিল প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রার
১৯৮৫ সালে চারুকলার পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে কিছু তরুণ ফিরে গিয়েছিল নিজ শহর যশোরে। রঙ, পেন্সিল আর কাদামাটি দিয়ে শিশুদের শৈশব রাঙানোর উদ্দেশ্যে তারা চারুপীঠ নামে একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিল। এই চারুপীঠে তাঁদের হাত ধরেই শুরু হয়েছিল প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রার। অনেকে মঙ্গল শোভাযাত্রার সূচনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাত ধরেই বলেই জানতেন, তবে তা সঠিক না। যদিও এর সূচনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটের শিক্ষার্থীদের হাত ধরেই হয়েছিল। শুরুটা হয়েছিল হুট করে প্ল্যানের মাধ্যমে। বাংলা নতুন বছরকে বরণ করে নিতে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে। চৈত্রের শেষ রাতে পুরো যশোর শহরজুড়ে আলপনা আঁকতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সবাই। একটা মিছিল বের করার ও পরিকল্পনা হয়েছিল : একটা শোভাযাত্রা। তবে, তারা তখন হয়তো জানতেন না যে তাঁদের এই শোভাযাত্রা একদিন জাতীয় উৎসবে পরিণত হবে। স্বীকৃতি পাবে, ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হবে।
১৯৮৫-৮৬ সালের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্যোক্তা
১৯৮৯ সালে চারুকলা অনুষদের ডিন ও শোভাযাত্রা শুরুর অন্যতম উদ্যোক্তা নিসার হোসেন শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তিনি জানান, ১৯৮৫-৮৬ সালের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্যোক্তা। তিনি জানান, এরা ১৯৮৮ সালের বন্যায় কিছু কাজ করেছিল। সেই সময় তাদের চারুশিল্পী সংসদ সহায়তা করেছিল। শিক্ষকেরা পেছনে ছিলেন, কিন্তু সব কাজ হয়েছে শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে। ১৯৮৯ সালে বঙ্গাব্দ ১৩৯৬ বর্ষবরণের সময় শিক্ষার্থীদের আয়োজনে প্রথম ঢাকায় শুরু হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শুরু হলেও মঙ্গল শোভাযাত্রা প্রথম হয় ১৯৮৯ সালে।লক্ষ্মীসরা
প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রার পোস্টার করেছিলেন চারুকলার পেইন্টিং ডিপার্টমেন্টের ছাত্র সাইদুল হক জুইস। ‘লক্ষ্মীসরা’ ছিল সেই পোস্টারের প্রতিপাদ্য। তখন কেউ খুব ভালো মুখোশ বানাতে পারতেন না। অতঃপর দৃশ্যপটে হাজির হলেন তরুণ ঘোষ। বিদেশে মাস্টার্স করতে গিয়ে তিনি মুখোশ বানানো শিখে এসেছিলেন। ব্যাস আর কি লাগে!
১৯৯২ সালে মঙ্গল শোভাযাত্রার একদম সামনে রং ছাত্র ছাত্রীদের কাঁধে ছিল বিরাট আকারের একটি কুমির। বাঁশ এবং নানা রং এর কাপড় দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল কুমিরটি। ইংরেজি ১৯৯৩ সালের বর্ষবরণ ছিল বঙ্গাব্দ ১৪০০ সালের সূচনা। আর সে উপলক্ষ্যে ‘১৪০০ সাল উদযাপন কমিটি’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরর চারুকলা ইন্সটিটিউটের সামনে থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করে। শোভাযাত্রার আকর্ষণ ছিল বাঘ, হাতি, ময়ূর, ঘোড়া সহ আরও বিভিন্ন ধরনের মুখোশ।

নাবিলা বুশরা এস এম