জাহাজের আদলে তৈরি কোলকাতার ঐতিহ্যবাহী নাখোদা মসজিদ
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : অনিন্দ্য সুন্দর এই মসজিদটি কোলকাতার মুসলিমদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়
৯৪ বছরের পুরনো নাখোদা মসজিদ। ছবি : সংগৃহীত
মসজিদের নাম নাখোদা! ভারী অদ্ভুত নামটি এসেছে ফারসি ভাষা থেকে। ফারসি ভাষায় নাখোদা বলতে নাবিককে বোঝায়। কোলকাতার প্রধান মসজিদটির নামে যেমন নাবিকের কথা রয়েছে, মসজিদের আকারের সাথেও জাহাজের মিল দেখতে পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, মসজিদের নির্মাতা আব্দুর রহিম ওসমান ছিলেন একজন নাবিক। ১৯২৬ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরে নির্মিত এই মসজিদ পেরিয়ে এসেছে প্রায় ৯৪ বছর। অথচ মসজিদটিকে দেখলে মোটেও এর প্রাচীনতা বোঝা যায় না।
প্রাচীন এই মসজিদটি রাস্তার পাশেই অবস্থিত। মসজিদের একদিকে জাকারিয়া স্ট্রিট এবং অপরদিকে রবীন্দ্র সরণির রাস্তা চলে গেছে। অপূর্ব মসজিদটি তৈরির নেপথ্যে রয়েছে সুন্নি সম্প্রদায়, যার নাম কুচ্চি মেমন জামাত। আর এই কুচ্চি সম্প্রদায়ের নেতা ছিলেন মসজিদের কারিগর-আবদুর রহিম ওসমান। লালচে খয়েরী রঙের মসজিদের সামনে রয়েছে লোহার দরজা। দরজা পেরিয়ে ভেতরে রয়েছে সাদা মেঝের বিশাল বড় আঙ্গিনা। রয়েছে সরু সিঁড়ি। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে রয়েছে আরও একটি তলা। অপূর্ব মসজিদের স্থাপত্যশিল্পের সাথে মুঘল স্থাপত্যের ভাবধারা রয়েছে। মসজিদে মোট তিনটি বড় গম্বুজ রয়েছে। গম্বুজের চারদিকে রয়েছে সাতাশটি মিনার। মিনারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় দুটো প্রায় ১৫১ ফুট উঁচু।
লালচে খয়েরী রঙের নাখোদা মসজিদ। ছবি : সংগৃহীত
অন্যান্য ছোট মিনারগুলোর উচ্চতা ১০০ ফুট থেকে ১১৭ ফুটের মধ্যে। পুরো মসজিদের বাইরের দেয়াল, ভেতরের অংশ এবং উপরের তলাগুলোতে সুন্দর নকশা ও কারুকাজ করা রয়েছে। পশ্চিমমুখী মসজিদটির প্রধান প্রবেশপথটি ভীষণ সুন্দর। এর সাথে বুলন্দ দরজার মিল রয়েছে। দরজাটিতে গ্রানাইট পাথর ব্যবহার করা হয়েছে যা আনা হয়েছিল টোলপুর থেকে। মসজিদের মেঝে সাদা বেলে পাথর দিয়ে তৈরি। এছাড়া মসজিদে ব্যবহৃত হয়েছে বেলজিয়াম কাচ ও লাল বেলে পাথর। এতকিছুর সংমিশ্রণে তৈরী নান্দনিক মসজিদটি বানাতে খরচ হয়েছিলো তখনকার সময়ের ১৫ লাখ টাকা। বর্তমানের হিসাবে সেই টাকার মান আরও বেশি। মসজিদের ভেতরে রয়েছে ওজুখানা। মসজিদে এক সঙ্গে দশ হাজার মানুষ নামাজ পড়তে পারেন। মসজিদের সামনে রয়েছে টুপি ও আতরের দোকান। বিখ্যাত কস্তুরীর আতর এখানেই পাওয়া যায়। ঈদের সময় যেন নতুন রুপে সেজে ওঠে নাখোদা মসজিদ। এছাড়া মহররমের সময় তাজিয়া মিছিলের পাশাপাশি রমজান মাসেও যেন লোকের ঢল নামে এই মসজিদে।
ছবি : জি নিউজ
স্থাপত্য শিল্পের টানে বিভিন্ন জায়গা থেকে পর্যটক ছুটে আসেন এই মসজিদ দেখতে। মসজিদে ঢোকার জন্য কোনো টিকিটের দরকার নেই। প্রতিদিন ভোর ছয়টা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত মসজিদ খোলা থাকে।
কিভাবে যাবেন : নাখোদা মসজিদে ঘুরতে যেতে হলে আপনাকে প্রথমে বাংলাদেশ থেকে কোলকাতায় যেতে হবে। এক্ষেত্রে অবশ্যই ভিসা এবং পাসপোর্ট থাকা বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশ থেকে বাস, ট্রেন এবং বিমানে চড়ে যেতে পারবেন প্রমোদ নগরী কোলকাতায়। বাসে চড়ে কোলকাতায় আসতে হলে শ্যামলী এনআর পরিবহন, গ্রিন লাইন, সোহাগ পরিবহণ, সৌহার্দ্য পরিবহন ইত্যাদি বাসে সরাসরি ঢাকা-কলকাতা যেতে পারবেন। এক্ষেত্রে নন-এসি বাসে ভাড়া ৮০০-১,০০০ টাকা এবং এসি বাসে ১,৫০০-২,০০০ টাকা। এছাড়া ঢাকা থেকে বাসে করে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে কোলকাতায় যেতে পারবেন।
ট্রেনে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও সুবিধাজনক উপায় হল মৈত্রী এক্সপ্রেস। সপ্তাহে চারদিন ( শুক্র, শনি, রবি, বুধ) মৈত্রী এক্সপ্রেসের ট্রেন ঢাকা-কোলকাতা যায়। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে সকাল আটটা দশ মিনিটে ট্রেন ছাড়ে। তবে কোলকাতা খুব সহজে এবং কম সহজে যেতে চাইলে বিমানে যেতে পারেন। বাংলাদেশ বিমান, রিজেন্ট এয়ারলাইনস, নভো এয়ার, এয়ার ইন্ডিয়া, জেট এয়ারওয়েজের বিমানে যেতে পারবেন কোলকাতা শহরে। কোলকাতা শহরের যেকোন জায়গা থেকে ট্যাক্সিতে করে নাখোদা মসজিদে যাওয়া যাবে। এছাড়া কোলকাতা স্টেশন কিংবা শিয়ালদহ স্টেশন থেকে বাস কিংবা ট্রেনে করে মসজিদে যাওয়া যায়।
যেখানে থাকবেন : নাখোদা মসজিদের খুব কাছাকাছি অবস্থিত আবাসিক হোটেলের মধ্যে রয়েছে ঋতুরাজ হোটেল, হোটেল হোয়াইট হাউজ, আফরিন ইন্টারন্যাশনাল গেস্ট হাউজ, হোটেল অর্কিড ইন ইত্যাদি।
খাবার : মসজিদের আশেপাশের খাবার হোটেলের মধ্যে সুফিয়া রেস্তোরাঁ, রয়্যাল ইন্ডিয়ান হোটেল প্রাইভেট লিমিটেড, ইসলামিয়া হোটেল, সাবিরের হোটেল অন্যতম।