প্রিন্সেপ ঘাঁট : ইতিহাসে মোড়ানো শুভ্র স্থাপনা ও প্রাচীন নিদর্শন

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : কোলকাতায় অবাক করা অন্যতম পুরনো দর্শনীয় স্থান প্রিন্সেপ ঘাঁট

একবিংশ শতাব্দীতেও মানুষের কাছে মোহনীয় প্রিন্সেপ ঘাঁট। একবিংশ শতাব্দীতেও মানুষের কাছে মোহনীয় প্রিন্সেপ ঘাঁট। ছবি : উইকিমিডিয়া কমন্স

কোলকাতা শহর অনেকের কাছে স্বপ্নের আবার অনেকের কাছে যেন বাস্তবতার ভিন্নরূপ। সে যাই হোক না কেন, কোলকাতা মানেই শিল্প-সংস্কৃতি আর বিনোদনের অপূর্ব মিশেল। সাথে এই শহরের পরতে পরতে জমে থাকা ইতিহাস তো আছেই! এককালের ভারতীয় উপমহাদেশের রাজধানী এই শহরের সংগ্রহে রয়েছে অনেক দর্শনীয় স্থান। কোলকাতার এমনই একটি স্থানের কথা না বললেই নয়, সেটি হল- প্রিন্সেপ ঘাঁট। কোলকাতার আরও দুটো বিখ্যাত স্থান : ফোর্ট উইলিয়াম এবং সেন্ট জর্জেস গেটের মাঝে এই ঘাঁটটি অবস্থিত। সিনেমাপ্রেমী মানুষেরা বিভিন্ন সিনেমায় দেখে থাকবেন এই শুভ্র স্থাপত্য নিদর্শনটিকে। ব্রিটিশ শাসন চলাকালীন সময়ে বিভিন্ন ঘাট বানানো হয়েছিল যেন মালামাল আনা-নেওয়া এবং যাতায়াত সহজ হয়। প্রিন্সেপ ঘাটও এর ব্যতিক্রম নয়। এটি কলকাতার অন্যতম পুরনো ঘাট।  প্রথমদিকে এটি বিভিন্ন রকম জিনিসপত্র আনা-নেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হত। নাম শুনে ঘাট মনে হলেও, প্রকৃতপক্ষে নদী থেকে কিছুটা দূরে প্রিন্সেপ ঘাট অবস্থিত। একসময় সিঁড়ি থাকলেও এখন আর তার দেখা মেলে না।

princep-ghat. সাদা রঙের চমৎকার স্থাপনা, প্রিন্সেপ ঘাট। ছবি : সুদিপ্ত মুখার্জী ব্লগার

 সবুজ ঘাসে ভরা প্রাঙ্গনে সদর্পে দাঁড়িয়ে আছে একটি স্থাপনা। পুরো স্থাপনাটি সাদা রঙের। একতলা বিশিষ্ট স্থাপনাটির চারদিকের বড় কলামগুলোতে খিলান আকৃতির গঠন দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়া মাঝের অংশগুলোতে রয়েছে আরো অনেক কলাম। কলামগুলো আয়নিক ধরনের। এই ধরনের কলাম প্রাচীন গ্রীসের স্থাপত্য শিল্পে দেখা যেত। ৪০ ফুট উঁচু ছাদকে দৃঢ়ভাবে ধরে রেখেছে এই কলামগুলো। প্রিন্সেপ ঘাঁটের স্থাপনাটি মূলত দেখতে অনেকটা বারান্দার মত। প্যালাডিয়ান স্থাপনাগুলোতে এধরনের বারান্দা বা আঙ্গিনা ব্যবহার করা হতো। ১৮৪১ সালে নির্মিত হওয়া স্থাপনাটি পেরিয়ে এসেছে প্রায় ১৫৯ বছর। নজরকাড়া এই স্থাপনার নকশাকার ছিলেন ডব্লিউ ফিজগেরাল্ড, আর এই ঘাঁটের নামকরণ করা হয়েছে জেমস প্রিন্সেপের নাম অনুসারে । জেমস প্রিন্সেপকে স্মৃতিতে উজ্জ্বল রাখতে স্থাপনাটি নির্মাণ করেছিলেন তখনকার ব্রিটিশ লাটসাহেব এডেনবরা। জেমস প্রিন্সেপ ছিলেন একজন ব্রিটিশ। পুরাতত্ত্ব, স্থাপনা, প্রাচ্যবিদ্যা ইত্যাদি বিষয়ে জেমস প্রিন্সেপের ভীষণ আগ্রহ ছিল। শুধুমাত্র তাই নয়, তিনি সম্রাট অশোকের শিলালিপিতে কী লেখা আছে সেটা আবিষ্কার করেছিলেন।

একসময় অবহেলায় থাকলেও সরকারি উদ্যোগে ২০০১ সালে এই স্থাপনার সংস্কার কাজ সম্পন্ন করে এর তদারকির ব্যবস্থা করা হয়। স্থাপনার চারদিকে ঘেরাও দেয়া রয়েছে। ২০১২ সালে ঘাঁটের চারদিকে সৌন্দর্য বর্ধনের ব্যবস্থা করা হয়। প্রিন্সেপ ঘাঁট থেকে  কদমতলা ঘাঁটের রাস্তায় আলো, ফোয়ারার ব্যবস্থা এখানকার দর্শনার্থীদেরকে আকৃষ্ট করেছে আরও বেশি। ব্রিটিশ শাসনামল পেরিয়ে একবিংশ শতাব্দীতেও মানুষের কাছে একই রকম মোহনীয় প্রিন্সেপ ঘাঁট। বর্তমানে এটি মানুষের কাছে সময় কাটানোর জন্য দারুণ জায়গা। প্রাচীন এই স্থাপত্য নিদর্শন প্রতিদিনই ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। এখানে ঢোকার জন্য কোনো টিকিটেরও দরকার হয় না।

princep-ghat gate ছবি : ইন্ডিয়া রেইল গেট

প্রিন্সেপ ঘাঁটে যাওয়ার সুন্দর রাস্তার পাশাপাশি স্থাপনাকে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য সবুজ গাছপালার মেলা। এছাড়া রয়েছে সবুজ রঙের বড় ও ছোট হাতির ভাস্কর্য। আরও রয়েছে বসার আসন। এখানে বসে থেকে হুগলি নদীর শান্ত রুপের সাক্ষী হয়ে থাকা যায়। এছাড়া বোনাস হিসেবে মাথার উপরে বিদ্যাসাগর সেতু তো আছেই! ছুটির দিনগুলোতে এখানে ভিড় হয় সবচেয়ে বেশি। স্থানীয় লোকজন তো বটেই দেশের বাইরের মানুষজনও ছুটে আসেন এই প্রাচীন ঘাঁটটি দেখতে। সময় করে স্থাপনা এবং নদীর পানিতে নৌকায় করে ঘুরে কাটিয়ে আসতে পারেন একান্ত কিছু সময়। যদি নিজের মনের মত একা সময় কাটাতে চান তাহলে সপ্তাহের যেকোনো দিনগুলোতে আসতে পারেন ছুটির দিনগুলো বাদ রেখে।

কিভাবে যাবেন : প্রিন্সেপ ঘাঁটে ঘুরতে যেতে হলে আপনাকে প্রথমে বাংলাদেশ থেকে কোলকাতায় যেতে হবে। এক্ষেত্রে অবশ্যই ভিসা এবং পাসপোর্ট থাকা বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশ থেকে বাস, ট্রেন এবং বিমানে চড়ে যেতে পারবেন প্রমোদ নগরী কোলকাতায়। বাসে চড়ে কোলকাতায় আসতে হলে শ্যামলী এনআর পরিবহন, গ্রিন লাইন, সোহাগ পরিবহণ, সৌহার্দ্য পরিবহন ইত্যাদি বাসে সরাসরি ঢাকা-কলকাতা যেতে পারবেন। এক্ষেত্রে নন-এসি বাসে ভাড়া ৮০০-১,০০০ টাকা এবং এসি বাসে ১,৫০০-২,০০০ টাকা। এছাড়া ঢাকা থেকে বাসে করে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে কোঁলকাতায় যেতে পারবেন। ট্রেনে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও সুবিধাজনক উপায় হল মৈত্রী এক্সপ্রেস। সপ্তাহে চারদিন ( শুক্র, শনি, রবি, বুধ) মৈত্রী এক্সপ্রেসের ট্রেন ঢাকা-কোলকাতা যায়। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে সকাল আটটা দশ মিনিটে ট্রেন ছাড়ে। তবে কোলকাতা খুব সহজে এবং কম সহজে যেতে চাইলে বিমানে যেতে পারেন। বাংলাদেশ বিমান, রিজেন্ট এয়ারলাইনস, নভো এয়ার, এয়ার ইন্ডিয়া, জেট এয়ারওয়েজের বিমানে যেতে পারবেন কোলকাতা শহরে। শহরে আসার পর আপনাকে অন্য কোনো যানবাহনের সহায়তা নিতে হবে প্রিন্সেপ ঘাঁটে যাওয়ার জন্য। ধর্মতলা থেকে হেঁটেই যেতে পারবেন প্রিন্সেপ ঘাঁটে। এছাড়া ট্রেন, বাসে করেও যাওয়া যায়।

চক্ররেলে করে যেতে চাইলে দমদম কিংবা মাঝেরহাট স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠতে হবে। এই ট্রেন একদম প্রিন্সেপ ঘাঁট স্টেশনে গিয়ে থামে। এছাড়া প্রতি ১৫ মিনিট পর পর এসএন ব্যানার্জী রোড থেকে বাবুঘাট পর্যন্ত বাস যায়। এসব বাসে সময় লাগে মাত্র ছয় মিনিট। বাবুঘাট থেকে একটি ফেরীতে উঠে চলে আসতে পারবেন প্রিন্সেপ ঘাঁটে।

যেখানে থাকবেন : প্রিন্সেটে ঘাঁটের কাছাকাছি বিভিন্ন মানের বেশ কয়েকটি আবাসিক হোটেল রয়েছে। এসব হোটেলের মধ্যে নিউ মেট্রো গেস্ট হাউজ, রায় গেস্ট হাউজ, কলকাতা গেস্ট হাউজ, হাস্টিং গেস্ট হাউজ, ক্যাপিটাল গেস্ট হাউজ, হোটেল হীরা, হোটেল ফার্স্ট রেসিডেন্ট গেস্ট হাউজ অন্যতম।

খাবার : বেশিরভাগ আবাসিক হোটেলে খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া আশেপাশে আরও কিছু খাবারের হোটেল রয়েছে। যেমন : স্কুপ, প্যালাডিয়ান লাউঞ্জ, আলফ্রেস্কো, রয়্যাল ইন্ডিয়ান হোটেল ও রেস্টুরেন্ট, দ্য ভোজ কোম্পানী ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

বিশেষ দ্রষ্টব্য :

১। স্থাপনার দেয়ালে লেখালেখি কিংবা কোনো কিছু দিয়ে দেয়ালে দাগ কাটবেন না।

২। খাবারের প্যাকেট, পানির বোতল, ময়লা ইত্যাদি স্থাপনার প্রাঙ্গনে কিংবা নদীর পানিতে ফেলবেন না।