ছোট থেকেই আমরা পড়েছি 'জগৎ জুড়িয়া এক জাতি আছে'। তবে, স্রোতের তীর ধরে হাঁটলে, কিংবা মরুভূমির বালুকাবেলায় বা নদীর নির্জন ধারে। জঙ্গলের কোলঘেঁষে কিংবা পাহাড়ের চড়াই উতরাই বেয়ে—অলক্ষ্যে জেগে থাকে লক্ষ লক্ষ জাতির জগৎ। তেমনই এক দৌরাত্ম্যের নাম লেপচা জগৎ যা উচ্চতায় প্রায় ৭ হাজার ফুটের একটু কম।
আজকাল বৈশাখের সকালেও হঠাৎ মেঘ করছে, বৃষ্টি নামছে যখন তখন। আমরা যারা শহুরে গন্তব্যে হেঁটে অভ্যস্ত নই, যারা মেঘ দেখলে বৃষ্টির চিন্তায় কবিতা লিখি, আবার ঝকঝকে আলোয় বরফচূড়া দেখতে ছুটে যাই দার্জিলিং বা সিকিমে। এই দিন বদলের সময়ে সেই মনটা বদল করতেই তাই গল্প হোক মেঘে ঢাকা লেপচাজগতে এক পাহাড়িয়া দিনের। কোলকাতা থেকে ট্রাভেল বাংলাদেশের পাঠকদের কাছে এমন মোহময় ভ্রমণ অভিজ্ঞতা তুলে ধরছেন দীপন দাস।
দার্জিলিং জেলার পাহাড়ি গ্রাম লেপচা। ছবি : দীপন দাস
কাজের চাপে তখন প্রায়ই ছুটতে হত শিলিগুড়ি। সময়টা হয়তো আঠারো সালের মে বা জুন মাস হবে। কিন্তু সাঁড়াশিচাপের একটু আল্গা ফাঁকই বাঙালিকে পৌঁছে দিতে পারে যেকোনো বিরামের চূড়ায়। আবার তা যদি হয় ঘন্টাখানেকের দূরত্বে। তাই দু'হাতে বাঁক সাক্ষী রেখে চেনা গন্তব্য চলতে থাকে বেশ কিছুক্ষণ। ঘন্টাখানেক প্রায় যেন মিনিটখানেক মনে হয়। তবে আকাশের মুখ ভার।
ফোনে শলা-পরামর্শ করতে করতে গাড়িতে বসেই 'নমো নমো' করে 'সুন্দরী মম' দার্জিলিং-এর মায়া ছেড়ে ভাবা হল ঘুম থেকে বাঁদিকে বেঁকোতে হবে। বেশ, তবে তাই হোক! আস্তে আস্তে কার্শিয়ং, 'টুং, সোনাদা, ঘুম পেরিয়ে'—নাহ, এইবার অঞ্জন দত্তে নয়; সোজা দার্জিলিং জেলার 'Secluded Hamlet'-এ যেখানে দেখা মিললো হ্যামিলিনের জাদুস্পর্শের আর 'মায়াবন বিহারিনী'র এক 'গহন স্বপন'-এর যা 'ধরিবারে' কোনো 'পণ' লাগে না—সে নিজেই সমৃদ্ধ 'সঞ্চারিনী'।
আকাশে ছড়ানো মেঘের কাছাকাছি। ছবি : দীপন দাস
তবে বেলা বাড়ার সমৃদ্ধি আকাশের শরীরে ঠিক টের পাওয়া যায় না। তাই পেটের টানে সম্বিৎ ফিরতেই পৌঁছনো গেল ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামে। কিছু লেপচা পরিবার নিয়ে যার বিস্তার কিছু কিলোমিটার মাত্র। আগেই শুনেছিলাম হোম স্টে-এর কথা; কিন্তু পরের ২৪ ঘন্টা যেভাবে কাটলো সেটা ঠিক স্টে নয়। সেটা আসলে 'লিভ' (live)। আর সেই বেঁচে থাকার নামেই এই কয়েক ছত্র লেখা।
দুই মেয়ে নিয়ে তাঁর জীবন ছত্র সাজানো—রোজগারের প্রধানতম উপায় বলতে আমাদের এই ভ্রমণ বিলাসিতা। তবে বিলাসিতা ভুলে দুপুরে ম্যাগি খেয়ে, আর 'রাম'-এর হিসেব কষে বেরিয়ে পড়া কুয়াশা ভরা সেই জটিল রহস্যের সমাধানে। এক-পা দু-পা শব্দে রাস্তার ধার ধরে মিলছে রডোডেনড্রন, ওকদের সারি। চোখের নিচে লেপ্টে যাওয়া কাজলের মত গাছের পাতায়-গায়ে মিশে আছে অশরীরী সেই ধোঁয়ার অমোঘ অত্যাচার; যেখানে ক্লান্তির ছাপে অভিজ্ঞতার আঁচড় স্পষ্ট।
লেপচার স্থানীয় শিশু। ছবি : দীপন দাস
আবেশ-কুন্ডলী আর ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টিতে আলোর স্পষ্টতা মুছে সন্ধ্যা নামতে থাকে সেই অকারণ বেঁচে থাকার প্রসাধনী রাজ্যে। পাহাড়ি সন্ধ্যেগুলো একটু বিরক্তিকর—তাই 'মেঘ পিওনের ব্যাগের ভেতর' তখন 'মন খারাপের দিস্তা'। কিন্তু সেই দিস্তা অনায়াসেই ভালোলাগার মহাকাব্যে পরিণত হয়েছে—কারণ, রাতের পাতে ছিল চিকেনের এক অনবদ্য ঝোল আর রুটি।
পরের দিন সকালেও আর সূর্যের দেখা মিললো না। তবে, পায়ে হেঁটে এইবার দেখা হল খাঁজে খাঁজে বাঁচতে থাকা সেই বাড়িগুলো, সেই ছোট্ট গ্রামটাকে, যার দূরের চোখে কখনো কখনও গিরিরাজ রাজত্ব করে; আর যার প্রতিটা আবরণে প্রকৃতি নিজের হাতে রঙ-বেরঙ-এর ফুলের আল্পনা এঁকে দিয়েছে। কিন্তু, এবার আলভিদার পালা।
ছবি : দীপন দাস
'লেপচা' কথাটা এসেছে নেপালি শব্দ 'লেপচে' থেকে, যার অর্থ 'জড়তাগ্রস্ত শব্দবন্ধ'। তবে, কোনো শব্দ দিয়ে সবসময় বাস্তব যেমন হয় না, তার অর্থ দিয়েও সবসময় কোনো জাতির সারাংশ তৈরী হয় না। তাই যে ভালোবাসার সারাংশ নিয়ে আমরা ঘরমুখী, সেই আতিথেয়তার অভিসার ব্যক্তিতেও আমার কোনো জড়তা নেই—কারণ, 'সে জাতির নাম মানুব জাতি'।
তবে, অনিচ্ছার জড়তা সঙ্গে করে ফিরতে হল সমতলে, তার আগে একবার ঢুঁ মারা দার্জিলিং-এ, এটা বাঙালির সহজাত প্রবৃত্তি থেকেই। নয়তো পেটের চিকেনটা হয়তো হজম হতো না।
পাহাড়ি ফুলের সাথে দিনের শুরু। ছবি : দীপন দাস
সে যাই হোক, রোদের চাকচিক্য দেখতে চাওয়া সেই অভ্যাসের পাহাড়কে দেখলাম এক রহস্যের রচনায়। তাই প্রত্যাশার কাছে হেরেও জিতে গেল প্রকৃতি, জিতলো এক আবছায়া পাহাড়; যার স্মৃতি নিয়ে উপসংহার লিখলাম আমি। ফেরার পথে বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল—'অউর হার কর জিতনে ওয়ালে কো........'।
কলকাতা থেকে ট্রেনে গেলে নিউ জলপাইগুড়ি জংশন/ বাসে গেলে শিলিগুড়ি জংশন। বাস টার্মিনাস/বিমানে গেলে বাগডোগরা বিমানবন্দর, সেখান থেকে শেয়ারড জিপে ঘুম (ভাড়া ১৫০ রুপি)। ঘুম থেকে মিরিক বা শুখিয়াপোখড়িগামী কোনো শেয়ারড জিপে লেপচাজগৎ ২০-২৫ মিনিট (ভাড়া ২০ রুপি)। এখান থেকে দার্জিলিং যেতে হলে একই ভাবে শেয়ারড জিপ পাওয়া যাবে (ভাড়া ৩০ রুপি)।
ছবি : দীপন দাস
যা খাবেন :
লেপচাজগতে হোম স্টে পাওয়া যায়। থাকা খাওয়া নিয়ে ৩ জনের ১ দিনে ২,৫০০-৪,০০০ রূপি পর্যন্ত খরচ হয়। যা খেতে চাইবেন, কম-বেশি বানিয়ে দেবে। বাইরে খাওয়ার তেমন কোনো অপশন নেই। ড্রিঙ্কস এরও তেমন অপশন নেই।