দেশের মন্দিরগুলো এখনও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের প্রতিরূপ

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : ভক্তদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় প্রতিনিয়ত সিক্ত হয় মন্দিরের দেব-দেবীরা

বুদ্ধ ধাতু জাদি মন্দির, বান্দরবান বুদ্ধ ধাতু জাদি মন্দির, বান্দরবান। ছবি : সংগৃহীত


প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ নানা ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে পরিপূর্ণ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে সাথে বহু বছরের পুরনো ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরেছে আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি। সুজলা-সুফলা বাংলাদেশের ঐতিহ্য বিশ্ব দরবারে এক অনন্য স্থান লাভ করেছে। বাংলাদেশ মূলত মুসলিমপ্রধান দেশ হলেও একসময় এখানে মুঘল সাম্রাজ্যের আধিপত্য ছাড়াও হিন্দু শাসকেরাও শাসনকার্য পরিচালনা করেছিলেন। বর্তমানে বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা প্রায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। এছাড়া বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ অন্যান্য নানা ধর্মাবলম্বীদের লোক এখানে বাস করে। অন্যান্য বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য এখানে রয়েছে অসংখ্য মন্দির।

শুধুমাত্র বর্তমানের নির্মিত মন্দিরগুলো নয় ঐতিহ্যবাহী হাজার হাজার মন্দির রয়েছে বাংলাদেশের সর্বত্র। আধ্যাত্মিক কার্যকলাপ সম্পন্ন করার জন্য ধর্মাবলম্বী লোকেরা মন্দিরে প্রার্থনা করতে আসে। শুধুমাত্র প্রার্থনা করার জন্যই নয় দেশী বিদেশী অসংখ্য পর্যটক ঐতিহ্যবাহী মন্দিরগুলোতে ভ্রমণ করতে আসে। চলুন জেনে আসা যাক বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী বেশ কিছু সংখ্যক মন্দির নিয়ে।

ঢাকেশ্বরী মন্দির :

dhakesshori ঢাকেশ্বরী মন্দির। ছবি : আমাদের সময়


ঢাকেশ্বরী মন্দিরকে বাংলাদেশের জাতীয় মন্দির বলা হয়। ঢাকেশ্বর শব্দটির অর্থ হচ্ছে ঢাকার ঠাকুরন। এটি নির্মিত হয়েছিল বারো শতকে। রাজা বল্লাল সেন এই মন্দিরের নির্মাণ কাজ করেছিলেন। মন্দিরের অনেক কিছুই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে গিয়েছে। তবে বর্তমানে এটি পুনরায় সংস্করণ করা হয়েছে। ঢাকেশ্বরী মন্দির প্রাঙ্গণে দুইটি মন্দির রয়েছে। দুইটি মন্দির দুই ধরনের স্থাপত্যবিদ্যাকে প্রকাশ করে। পুরনো মন্দির পঞ্চরত্ন দূর্গার। এখানে চারটি শিব মন্দির রয়েছে। ঢাকেশ্বরী মন্দিরের স্থাপত্যবিদ্যার ডিজাইন অনেকটা বুদ্ধ প্যাগোডার মত। মন্দিরের পাশে একটি বড় পুকুর ও বড় গেট রয়েছে। এই বড় গেট দিয়ে পূর্বকালে হাতিদের যাতায়াত ছিল। মন্দিরের পূর্ব দিকে রয়েছে সন্ন্যাসীদের সমাধি। মন্দিরের বাইরে আরো ৫-৬টি দেবমূর্তি রয়েছে। সেই সাথে রয়েছে শিব লিঙ্গ। মন্দিরটিতে মূলত দশভূজা প্রার্থনা করা হয়। দশভূজা দেবীটি স্বর্ণের তৈরি। এর পাশে আরো বেশ কিছু সংখ্যক মূর্তি রয়েছে। অন্যান্য পুরনো মন্দিরের ক্ষেত্রে যেমনটা হয় তেমনই এর  ভেতরটাও অনেকটাই অন্ধকার। তবে এখন কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে।  ১৯৯৬ সালে ঢাকেরশ্বরী মন্দির এর পুরো নাম পরিবর্তন করে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির নামে আখ্যায়িত করা হয়।

সুগন্ধা শক্তিপীঠ :

হিন্দুদের একটি পবিত্র তীর্থস্থান সুগন্ধা শক্তিপীঠ। এটি বরিশাল শিকারপুর গ্রামে অবস্থিত। এই মন্দিরটির পাশ দিয়ে একসময় সুগন্ধা নদী প্রবাহিত হতো। এখন স্রোত হারিয়ে নদীটি আর আগের রুপে নেই, অনেকটা খরস্রোতা হয়ে গিয়েছে। সুগন্ধা শক্তিপীঠ মন্দিরের সম্পূর্ণ অংশে ও আশেপাশে একসময় গভীর জঙ্গল ছিল। অনেক বছর পূর্বে  রাম রায় নামক একজন ব্যক্তি স্বপ্নে একটি ঢিপি এর কথা জানতে পারলেন, যা কিনা গভীর জঙ্গলে রয়েছে। পরবর্তীতে রাম রায় এই সুগন্ধা শক্তিপীঠ মন্দিরটি নির্মাণ কাজ করেছিলেন। তবে দুঃখের বিষয় হলো এখন আর পুরনো মূর্তিগুলো আর নেই।

আদিনাথ মন্দির :

আদিনাথ মন্দির ছবি : অফরোড বাংলাদেশ

দেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালীর মৈনাক পাহাড়ের চূড়ায় নির্মিত হিন্দুদের জন্য পবিত্র তীর্থস্থান শিব মন্দির এটা। কক্সবাজার থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে মহেশখালী দ্বীপে অবস্থিত এই মন্দিরটি। সমতল ভূমি থেকে প্রায় ৬৯টি সিঁড়ির উপর ঐতিহাসিক শিব মন্দির অবস্থিত। চট্টগ্রামের অসংখ্য হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা মন্দিরে পূজা করতে আসে।

জয় কালী মন্দির :

joy kali ছবি : পিন্টারেস্ট


 ১৫৯৩ সালে শ্রী তুলসী নারায়ণ ঘোষ এবং নব নারায়ণ ঘোষ জয় কালী দেবীর উদ্দেশ্যে এটি নির্মাণ করেছিলেন। বিখ্যাত এই মন্দিরটি ঢাকার ওয়ারি এলাকার ঠাঠারিবাজারে অবস্থিত। এখানে চমৎকার দেবী কালীর মূর্তি রয়েছে। সুন্দর অলঙ্করণ এবং পোশাক দিয়ে মূর্তিটি সজ্জিত করা। বছরের বিশেষ দিনগুলোতে সম্পূর্ণ মন্দিরসহ আশেপাশে জায়গাগুলো আলোক সজ্জায় সজ্জিত করা হয়।

রমনা কালী মন্দির :

রমনা কালী মন্দির রমনা কালী মন্দির। ছবি : সংগৃহীত

রমনা কালী মন্দিরকে বলা হয় ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম বিখ্যাত মন্দির। প্রায় পাঁচশত বছরের পুরনো। এটি ঢাকায় রমনা পার্কের বহির্ভাগে অবস্থিত। প্রায় পাঁচশত বছর পূর্বে এক সন্ন্যাসী এখানে আখড়া গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে এই মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়। মন্দিরে পাথরের উপর শ্রী শ্রী ভদ্রকালীর প্রতিমা রয়েছে। প্রতিমাকে লাল কাপড় দিয়ে সুন্দর করে আচ্ছাদন করা রয়েছে। মূর্তির একপাশে ঠাকুর শ্রী রাম কৃষ্ণের মূর্তি এবং অন্য পাশে মা সারদা মনির মূর্তি রয়েছে। রমনা কালী মন্দিরের মূলত কালীপূজা হয়ে থাকে। এছাড়াও দূর্গা পুজাসহ অন্যান্য পূজা অর্চনা করা হয়। নানা প্রান্ত থেকে ভক্তরা এখানে আসেন।