রসনামৃত : নাটোরের কাঁচাগোল্লা, নাড়ু, মোয়া ও সিরিঞ্জ পিঠা

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : নাটোরের বিখ্যাত ও জনপ্রিয় খাবার


নাটোরের ঐতিহ্যবাহী কাঁচাগোল্লা;

দেশ ও দেশের বাহিরেও কাঁচাগোল্লা বেশ জনপ্রিয় নাটোরের ঐতিহ্যবাহী কাঁচাগোল্লা; ছবি : উইকিপিডিয়া

 কাঁচাগোল্লা বাংলাদেশের নাটোর জেলায় উৎপন্ন দুধ দিয়ে তৈরি এক প্রকার মিষ্টান্ন। এই মিষ্টান্নটি গরুর দুধ হতে প্রাপ্ত কাঁচা ছানা দিয়ে প্রস্তুত করা হয় বলে এটি কাঁচাগোল্লা বলে পরিচিত।

কাঁচা গোল্লার ইতিহাস :

কাঁচাগোল্লা সৃষ্টির রয়েছে চমৎকার কাহিনী। জনশ্রুতি আছে নিতান্ত দায়ে পরেই নাকি তৈরি হয়েছিল এই মিষ্টি। নাটোর শহরের লালবাজারের মধুসূদন পালের দোকান ছিল নাটোরের প্রসিদ্ধ মিষ্টির দোকান। দোকানে বেশ কয়েকটি বড় বড় চুলা ছিল। মধুসূদন এসব চুলায় দেড় থেকে দু’মণ ছানা দিয়ে রসগোল্লা, পানিতোয়া, চমচম, কালো জাম প্রভৃতি মিষ্টি তৈরি করতেন। দোকানে কাজ করতেন দশ-পনের জন কর্মচারী। হঠাৎ একদিন মিষ্টির দোকানের কারিগর আসেনি। মধুসূদনের তো মাথায় হাত! এত ছানা এখন কি হবে? এই চিন্তায় তিনি অস্থির। নষ্টের হাত থেকে রক্ষা পেতে ছানাতে তিনি চিনির রস ঢেলে জ্বাল দিয়ে নামিয়ে রাখতে বলেন। এরপর মুখে দিয়ে দেখা যায় ওই চিনি মেশানো ছানার দারুণ স্বাদ হয়েছে। নতুন মিষ্টির নাম কি রাখা হবে এ নিয়ে শুরু হয় চিন্তা ভাবনা।

আরও পড়ুন : রসনামৃত : জামালপুরের ঐতিহ্যবাহী খাবার পিঠালি
যেহেতু চিনির রসে ডোবানোর পূর্বে ছানাকে কিছুই করতে হয়নি অর্থাৎ কাঁচা ছানাই চিনির রসে ঢালা হয়েছে, কিন্তু রসগোল্লার ছানাকে তেলে ভেজে চিনির রসে ডোবানো হয়। তাই তার নামকরণ হয়েছে রসগোল্লা। এটা কাঁচা ছানার রসে ডোবানো হয়েছে বলেই এর নাম দেয়া হলো কাঁচাগোল্লা। কাঁচাগোল্লার স্বাদ রসগোল্লা, পানিতোয়া, এমনকি অবাক সন্দেশকেও হার মানিয়ে দেয়। এর রয়েছে একটি মিষ্টি কাঁচা ছানার গন্ধ যা অন্য কোনো মিষ্টিতে পাওয়া যায়না। ধীরে ধীরে মিষ্টি রসিকরা এই মিষ্টির প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকেন। তখন থেকে মধুসূদন নিয়মিতই এই মিষ্টি বানাতে থাকেন। কাঁচাগোল্লার সুখ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। কাঁচাগোল্লার চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে মধুসূদন পালের দোকানে প্রতিদিন তিন থেকে সাড়ে তিন মন ছানার কাঁচাগোল্লা তৈরি হতে লাগল। সে সময় ঢোল বাজিয়ে জানানো হতো কাঁচাগোল্লা কথা।

উপকরণ :

এটি তৈরি উপকরণসমূহ হচ্ছে : ছানা, মাওয়া, এলাচগুঁড়া, চিনি। মাওয়ার জন্য : দুধ, ঘি, পানি।

প্রস্তুত প্রণালী :

কাচা গোল্লা প্রধানত দুই ধাপে তৈরি হয় :

১ম ধাপে দুধ ও পানি একত্রে মিশিয়ে একটি কড়াইতে জ্বাল দিতে হয়। মিশ্রণ ফুটতে থাকলে নাড়তে হয়। ৫ থেকে ৬ মিনিট পরে অল্প অল্প করে সিরকা মিশাতে হবে এবং নাড়তে হয়। দুধ জমাট বাঁধতে শুরু করলে ও যখন হালকা নরম হয় তখন সবুজ রঙের পানি আলাদা হবে, তখন পাত্রটি নামাতে হয়। ছানার পানি ঝরাতে তা একটি ঝাঁঝারিতে রাখতে হয়। পরবর্তীতে ছানা একটি সিল্কের কাপড়ে বেঁধে সারা রাত ঝুলিয়ে রাখা হয়। এসময় কাপড় পেঁচিয়ে চাপ প্রয়োগ করেও পানি বের করা হয়। পানি বের করে ছানা একটি কাঠের পাটাতনে রেখে হাতের চাপ প্রয়োগ করে মিহি ছানা তৈরি করা হয়।

আরও পড়ুন : রসনামৃত : মেজবান, খাবার নাকি খাবারের উৎসব?

ছানা থেকে কাঁচাগোল্লা তৈরি সম্পাদন :

২য় ধাপে ছানা ৩ ভাগে ভাগ করতে হয়। প্রথমে ২ ভাগ একটি পাত্রে মাঝারি আঁচে জ্বাল দিতে হয়। ছানার পানি বেরিয়ে আসলে হালকা নরম হলে মৃদু আঁচে অল্প চিনি দিয়ে জ্বাল দিতে হয়। কিছুক্ষণ পরে চিনি মিশ্রিত ছানা আঠালো ভাব নেয় তখন বাকি ১ ভাগ ছানা মিশিয়ে নাড়তে হয়। এ সময় ক্রিম ও এলাচ গুঁড়া মিশিয়ে জ্বাল দিতে হয়। কিছু পরে হালকা গরম থাকতেই মসৃণ করে ছেঁকে ঠাণ্ডা করতে হয়। এরপর ঐ তৈরি মিষ্টান্নকে গুড়ো গুড়ো অবস্থায় কাঁচাগোল্লা হিসেবে বিক্রি করা হয়।

নারিকেল নাড়ু

নারকেলের নাড়ু

নারকেলের শাঁস দিয়ে তৈরি হয় এই নাড়ু; ছবি : সাজগোজ ডট কম


নাড়ু নাটোরের জনপ্রিয় এবং মজাদার খাবার। এটি হাতে নেড়ে নেড়ে বানায় বলে একে নাড়ু বলে। নাড়ু কয়েক রকমের হয়। এই যেমন: নারিকেলের নাড়ু, তিলের নাড়ু, চালের নাড়ু। নাড়ুর মধ্যে সর্বাধিক প্রচলিত ও পরিচিত হচ্ছে নারিকেলের নাড়ু। অন্যান্য নাড়ুর তুলনায় নারিকেলের নাড়ুটাই বেশি বানানো হয়।

উপকরণ: নারিকেল ও খেজুর গুঁড়।

প্রস্তুত প্রণালী:

প্রথমে নারিকেল ভেঙ্গে নারিকেলে শাঁসগুলো কুড়ানি (নারিকেলের শাঁস পাতলা করে তোলার যন্ত্র) কুড়াতে হবে। এরপর পাতলা করে তোলা নারিকেলের শাঁসগুলো একটি পাত্রে আলাদা করে রেখে খেজুরের গুঁড় ভেঙে ছোট ছোট টুকরোয় পরিণত করতে হবে। খেজুর গুঁড় ভাঙ্গা হয়ে গেলে সেগুলো আগুনে জ্বাল করতে হবে। আগুনে গলে গুঁড় আঠালো সিরায় পরিণত হলে তখন তাতে নারিকেলের শাঁসগুলো দিয়ে দিতে হবে। নারিকেলের শাঁসসহ কিছুক্ষণ আগুনে জ্বাল করতে থাকলে একসময় নারিকেলের শাঁস লালচে রং ধারণ করবে। ঠিক তখন আগুন থেকে গুঁড় ও নারিকেলের তৈরি হালুয়া নামিয়ে আনতে হবে। এবার হালুয়া হাতে নিয়ে ছোট ছোট বলের মত বানালেই তৈরি হয়ে যাবে মজাদার নারিকেলের নাড়ু।

আরও পড়ুন : রসনামৃত : চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী কালাই রুটি

তিলের নাড়ু

তিলের নাড়ু

তিল ও খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরি তিলের নাড়ু; ছবি : মাই উইকেন্ড কিচেন


 তিলের নাড়ু আরেক জিনিস! অসম্ভব মজাদার এই তিলের নাড়ু। যদিও নারিকেলের নাড়ুর চেয়ে কম প্রচলিত এই তিলের নাড়ু। কিন্তু ঐ যে কথায় আছে না, ভাল জিনিস কমই ভাল! সেরকম আরকি। উপকরণ : তিল ও খেজুর গুঁড়।

প্রস্তুত প্রণালী :

এক্ষেত্রে ঐ নারিকেলের নাড়ু বানানোর পদ্ধতিই অবলম্বন করতে হবে। প্রথমে তিল ভেজে নিতে হবে। এরপর গুঁড় জ্বাল করে আঠালো সিরা বানিয়ে তাতে তিল মিশিয়ে নিতে হবে। কয়েক মিনিট পর তিলের হালুয়া নামিয়ে ছোট ছোট বলের মত করে বানাতে হবে দুর্দান্ত স্বাদের তিলের নাড়ু।

আরও পড়ুন : শরীয়তপুরের ঐতিহ্যবাহী খেজুরের গুড়ের একাল-সেকাল

চালের নাড়ু


চালের নাড়ু

চালের নাড়ুও বেশ জনপ্রিয় এবং স্বুসাদু; ছবি : সুলতানা'স কিচেন


চালের নাড়ুও কম যায় না। এর বেশ ভালই চাহিদা রয়েছে গ্রাম-বাংলায়। তবে চালের নাড়ু সবাই বানাতে অভ্যস্ত নয়। তাই চালের নাড়ু যারা বানাতে পারেন তাদের অন্যান্য মহিলারা বেশ গুণের অধিকারী বলে মনে করে থাকেন।

উপকরণ : চাল ভাজা, নারিকেল ও খেজুর গুঁড়।

প্রস্তুত প্রণালী : প্রথমে চাল ভেজে নিতে হবে। এরপর ভাজা চালগুলোকে আধা ভাঙ্গা করে পাটায় পিষতে হবে। চাল পাটায় পিষে পূর্বের ন্যায় নারিকেল ও গুঁড়ের হালুয়া তৈরি করে নিতে হবে। এবার তাতে আধা ভাঙ্গা চালা ভাজা ভাল করে মেশাতে হবে। মেশানো হয়ে গেলে দু'হাতে ছোট ছোট বলের মত করে তৈরি করতে হবে চালের নাড়ু। এই নাড়ুগুলো অন্যান্য নাড়ুর তুলনায় আকারে কিছুটা বড় এবং স্বাদেও অনেক আলাদা।

আরও পড়ুন : ৫৩০ বছর আগে যাত্রা শুরু করা বুধপাড়া কালীমন্দির : নাটোর

মোয়া


মোয়া

গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী খাবার মোয়া; ছবি : যুগান্তর


বাংলাদেশের আরেকটি মজাদার ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের নাম মোয়া। অতিথি আপ্যায়নে নাড়ু, মোয়া যেন দুই ভাই বোন। কেননা এদের একসাথেই অধিকাংশ সময় ব্যবহার করা হয়।

উপকরণ :

মুড়ি ও খেজুর গুঁড়।

প্রস্তুত প্রণালী :

প্রথমে খেজুর গুঁড় আগুনে জ্বাল করে সিরা বানাতে হয়। সিরা হয়ে গেলে নামিয়ে এনে তাতে মুড়ি মেশাতে হবে। এরপর চামচ অথবা নাকড় দিয়ে ভাল করে মুড়িগুলো শিরাতে মিশিয়ে নিতে হবে। একে গুঁড় দিয়ে মুড়ি পাক দেয়া বলে। পাক দেয়া হয়ে গেলে, পাক দেয়া মুড়িগুলো নিয়ে দুই হাতে ভাল করে চেপে টেনিস বলের আকৃতি দিতে হবে। ব্যাস, তৈরি হয়ে যাবে মজাদার স্বাদযুক্ত মুড়ির মোয়া।

আরও পড়ুন : ইমরানস হেরিটেজ হোম : খাবারের পাশাপাশি ঐতিহ্যের সন্ধান

সিরিঞ্জ পিঠা


সিরিঞ্জ পিঠা

সিরিঞ্জ দিয়ে বানানো রঙ বেরঙের পিঠা; ছবি : সংগৃহীত


 সিরিঞ্জ পিঠা নাটোরের একটি ঐতিহ্যবাহী এবং মজাদার খাবার।এই পিঠা সিরিঞ্জ দিয়ে বানানো হয় বলে একে সিরিঞ্জ পিঠা বলা হয়।

উপকরণ :

চালের আটা, সিরিঞ্জ।

প্রস্তুত প্রণালী :

এই পিঠা বানানোর আগে সিরিঞ্জ অবশ্যই সাবান দিয়ে পরিষ্কার করে রোদে শুকিয়ে নিতে হবে। এরপর আটাগুলো পানি দিয়ে গাঢ় করে মিশিয়ে নিতে হবে।তারপর মাখানো আটাগুলো সিরিঞ্জে পুরে কলা পাতার উপর তৈরি করা হয় সিরিঞ্জ পিঠা। এরপর কড়াইয়ের ভেতর পানি দিয়ে তার ভেতর খড়কুটো দেওয়ার পর কলা পাতাসহ পিঠাগুলো তার ওপর রেখে ভাপ দিয়ে নিতে হয়। তারপর পিঠাগুলো কলাপাতা থেকে নামিয়ে কোন বড় পাত্রের ভেতর রেখে রোদে শুকাতে হয়। রোদে শুকানোর পর পিঠা গুলো তেলে ভেজে নিলেই তৈরি হয়ে গেল অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং মজাদার পিঠা। তবে গরম পিঠার উপর চিনি ছিটিয়ে দিলে স্বাদ আরোও বেড়ে যায়।

  রাজিদুল ইসলাম   এস এম