শাহী মশলা, গরুর মাংস ও চালের গুঁড়ার মিশ্রণে তৈরি মজাদার পিঠালি; ছবি : প্রথম আলো
ঐতিহ্যবাহী নানা ধরনের খাবার ও সংস্কৃতিতে ভরপুর আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। এ দেশের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে তাদের নিজস্ব স্থানীয় খাবারের বিপুল সমাহার। অনেক ক্ষেত্রে বিখ্যাত এসব খাবার'ই সেই সকল স্থানের পরিচয় তুলে ধরে। যেমন বগুড়ার দই, নাটোরের কাঁচাগোল্লা, সিলেটের সাতকড়া কিংবা মুক্তাগাছার মন্ডা।
আজ আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরতে এসেছি জামালপুর জেলার ঐতিহ্যবাহী প্রিয় খাবার পিঠালি/মিল্লী/ম্যান্দা/মিলানি সম্পর্কে। বিভিন্ন স্থানে এই খাবারটি বিভিন্ন নামে পরিচিত। নাম ভিন্ন হলেই বা কি, খাবারের স্বাদ কিন্তু অপরিবর্তিত। দেশ বিখ্যাত এই খাবারটি জামালপুর জেলার নিজস্ব খাবার, যা জামালপুর জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাথে ওতপ্রোতও ভাবে জড়িয়ে আছে৷
পিঠালি খাবারটি মূলত অনেক ধরণের শাহী মশলা, গরুর মাংস ও চালের গুঁড়ার সংমিশ্রণে তৈরি করা হয়। দেখতে অনেকটা হালিমের মত কিন্তু স্বাদ ভিন্ন।
শুরুতে জানাই, খাবারটির ইতিহাস সম্পর্কে। ঠিক কবে থেকে 'পিঠালি' জামালপুরবাসীর সাথে তার সখ্যতা গড়ে তুলেছে তার সঠিক তথ্য জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হয়, শত বৎসরের বেশি সময় ধরে জামালপুরবাসী পিঠালির এই ঐতিহ্য লালন করে আসছে।
হ্যাঁ, এটি জামালপুরের একটি ঐতিহ্য তো বটেই। বলা হয়ে থাকে, স্বাধীনতার আগেও বিচার-সালিশ বৈঠকে পিঠালি পরিবেশন করা হতো। সাধারণত, এই খাবারটির আয়োজন করা হয়ে থাকে বড় কোনও উৎসবে। যেমন : বিয়ে, আকিকা, খৎনা ও ব্যাপার (কুলখানি) উৎসবে।
জামালপুরের ইতিহাস ঐতিহ্যের সাথে জড়িয়ে আছে পিঠালি খাবারটি; ছবি : বাংলা ট্রিবিউন
অপরদিকে, 'ব্যাপার' হলো জামালপুরবাসীর নিজস্ব এক সংস্কৃতি। মূলত ব্যাপার এর সঙ্গে স্থানীয় মুসলমানদের ধর্মীয় মূল্যবোধ নিবিড়ভাবে জড়িত। সাধারণত, ব্যাপার আয়োজিত হয় কোনও মৃত ব্যাক্তির আত্মার মাগফেরাত কামনা উপলক্ষে৷ এই অনুষ্ঠানে এক সাথে অনেক লোক জড়ো হয় আর তাদের মাঝে বিতরণ করা হয় কলাপাতায় করে ধোয়া ওঠা গরম ভাত ও পিঠালি।
অবশ্য এখন যুগের সাথে তাল মিলিয়ে কলাপাতার পরিবর্তন ঘটেছে, এসেছে আধুনিক থালা/প্লেট। তবুও এখনও কিছু কিছু স্থানে কলাপাতায় করে খাবারের এই রেওয়াজ পরিলক্ষিত হয়৷ কলাপাতায় করে খাবারের রেওয়াজ পরিবর্তিত হলেও, জামালপুরবাসীর কাছে কিন্তু ব্যাপারের খাবারের প্রতি আকর্ষণ একটুও পরিবর্তিত হয়নি।
রন্ধনপ্রণালীর বৈচিত্র্যতা ও পরিবেশনের অকৃপণতা 'পিঠালির' স্বাদকে অতুলনীয় করে তুলেছে। ঐতিহ্যে লালিত ব্যাপারের এই খাবার জামালপুরের সংস্কৃতিকে করেছে সমৃদ্ধ। যুগ যুগ ধরে নিজস্ব সংস্কৃতির চর্চা এই অঞ্চলকে এনে দিয়ে স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্য।