টিবিডি ইন্টারভিউ উইকলি : 'সমাজের নানা প্রতিবন্ধকতা থেকেই ভ্রমণের অনুপ্রেরণা এসেছে'

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : নারীর ক্ষমতায়ন ও অধিকার আদায়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিশেষ কর্মসূচি 'নারীর চোখে বাংলাদেশ'


নারীর ক্ষমতায়ন ও অধিকার আদায়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিশেষ কর্মসূচি 'নারীর চোখে বাংলাদেশ'


সাকিয়া হক, পেশায় একজন ডাক্তার। ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়ালেখা করার সময় প্রতিষ্ঠা করেছেন বাংলাদেশের নারীদের ভ্রমণ বিষয়ক সংগঠন ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশ। স্কুটিতে করে দেশের ৬৪টি জেলা ভ্রমণ করেছেন সেই সংগঠন থেকে। স্কুলের ছাত্রীদের নারীর ক্ষমতায়ন, বয়ঃসন্ধিকালীন সমস্যাসহ নানা বিষয়ে সচেতন করে তোলার জন্য পরিচালনা করছেন 'নারীর চোখে বাংলাদেশ' নামক কর্মসূচি। ট্রাভেল বাংলাদেশের সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে সেইসব অভিজ্ঞতার কথাই শোনাচ্ছেন সাকিয়া হক।

ট্রাভেল বাংলাদেশ : আপনাদের ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশ ও নারীর চোখে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কর্মসূচি সম্পর্কে শুনতে চাই।

সাকিয়া হক : মার্চে মহামারি আসার সাথে সাথে আমরা ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশ থেকে সকল ট্যুর ক্যান্সেল করে দিয়েছি। আমার মনে হয়, ট্রাভেল রিলেটেড গ্রুপ হিসেবে আমাদেরটা ফার্স্ট, যারা মহামারিতে ট্যুরগুলো বন্ধ করেছে। নারীর চোখে বাংলাদেশ কর্মসূচিতে আমরা প্রতি মাসে দুটা করে স্কুলে সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম কাভার করছিলাম। জানুয়ারি - ফেব্রুয়ারি, মার্চে এসে তা শেষ করেছি।



ডা. সাকিয়া হক ও ডা. মানসী সাহা


আমরা পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা করেছিলাম, ২০২০ এ। ওটা আমরা একদম হোল্ড করে রেখেছি এখন। আমার প্ল্যান হচ্ছে ভিশন - ২০২১ নামে নারীর চোখে বাংলাদেশের এক্সটেন্ডেড ভার্শনটা লঞ্চ করবো আবার। আর ২০২০ এ যা করেছি, ওটাতে ট্রায়াল হিসেবে দেখিয়ে দিবো। এটা হচ্ছে আমাদের এখনকার প্ল্যান।



ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশ-এর একটি সচেতনামূলক ইভেন্ট। ছবি: ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশ


 প্রতি মাসে প্রত্যেকটি বিভাগে দুটো করে স্কুলে আমরা সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করব। তার মানে হচ্ছে প্রতি মাসে ১৬টা করে স্কুল। অনেকের কাছে পৌঁছাতে পারব। একেকটা স্কুলে যদি ৩০০ করে শিক্ষার্থী হয়, তাহলে বুঝতে পারছেন কেমন হবে!

আরও পড়ুন : টিবিডি ইন্টারভিউ উইকলি : 'আমার বিশ্বাস, পর্যটনের সকল সংকট আমরা কাটিয়ে উঠতে পারব'

ট্রাভেল বাংলাদেশ : আপনার মতে আন্তর্জাতিক ভ্রমণে কোভিড-১৯ কতটা প্রভাব ফেলছে এবং ফেলবে? বাংলাদেশি ট্রাভেলারদের জন্য কি ভ্রমণ আরও কষ্টকর হয়ে যাবে?

সাকিয়া হক : আন্তর্জাতিক ভ্রমণে কোভিড-১৯ অনেক প্রভাব ফেলছে এবং ভ্রমণ তো কষ্টকর হবে। বাংলাদেশ এবং সাথে এশিয়ার লোকজন যথেষ্ট অসচেতন। আমরা স্বাভাবিক নিয়মগুলোও অনুসরণ করি না। মানুষজনের অসচেতনতার কারণে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে যায়। মানুষ যদি সচেতন না হয়, তাহলে অবস্থা এমনই হবে। এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক ভ্রমণে কিন্তু মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।




স্কুটিতে সারা দেশের ৬৪ জেলা ঘুরেছেন ডা. সাকিয়া হক ও ডা. মানসী সাহা। ছবি: ডা. সাকিয়া হক


আমাদেরকে তো এমনিতে বাইরে ওয়ার্কার ক্লাস ভাবে। তাই বাইরে যাওয়ার জন্য ভিসা পাওয়া কঠিন হবে। যেমন আমি যতোগুলো ভিসা ম্যানেজ করেছি, প্রত্যেকটা ভিসা যথেষ্ট কঠিন করে নিতে হয়েছে। দেখাতে হয়েছে যে, কেন আমি যাব, মানে ডিটেলস দেখাতে হয়েছে। ভিসা পেতে এত প্যারা আমাদের লকডাউনের আগে পোহাতে হতো। এখন কোভিড-১৯ এ অসতর্কতার কারণে কবে যে আন্তর্জাতিকভাবে আমাদেরকে বাকি সব দেশ এলাউ করবে, এটা একটা বড় প্রশ্ন!

ট্রাভেল বাংলাদেশ : আমাদের দেশের ট্যুরিজমে এর প্রভাব কতটা মনে হয়?

সাকিয়া হক : যেভাবে কোভিড- ১৯ এর জন্য ট্যুরিজম সেক্টরে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সেটা কাটিয়ে উঠা আসলে খুব কঠিন। পুরো বিশ্বেই ট্যুরিজম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু ট্যুরিজম নয়,পুরো অর্থনৈতিক অবস্থাটাই ক্ষতিগ্রস্ত। আমাদের দেশেও তাই। যে এলাকায় আমরা একটা ট্যুর দিতাম ওসব এলাকার মানুষজনের আয়ের একটা সোর্স সৃষ্টি হয়েছিল। যেমন সুনামগঞ্জ বা সাজেকের কথা চিন্তা করুন, যেখানে ট্যুরিজমের মাধ্যমে আয় হতো,তারা কিন্তু বিশালাকারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ট্রাভেল বাংলাদেশ : ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশ ও নারীর চোখে বাংলাদেশ থেকে কোভিড ১৯ এর সময় আপনাদের উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে চাই।

সাকিয়া হক : আমরা চেষ্টা করেছি ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের কিছু ত্রাণ দিতে। যেসব জায়গায় আমরা সাধারণত বেশ ট্যুর দিই, সেখানে যারা কোভিড-১৯ এর ফলে অর্থনৈতিকভাবে সংকটে আছে, যেমন পাহাড়ি এলাকা, যেখানে সরকারি ত্রাণ মানুষ সেভাবে পায় না। বেসরকারি ত্রাণও সেভাবে যায়নি। ওসব জায়গাগুলোতে হেল্প করার চেষ্টা করেছি এবং সম্প্রতি আমরা আবার ৫০টা পরিবারকে ত্রাণ দেয়ার কথা ভাবছি। আর বিভিন্নভাবে লোকজনকে সচেতন করার চেষ্টা করেছি আমরা। যথেষ্ট সচেতন করা হয়েছে। সরকারও চেষ্টা করেছে।

আরও পড়ুন : টিবিডি ইন্টারভিউ উইকলি : নারীরা আরও বেশি ভ্রমণ করা ও বিশ্বটাকে জানার সুযোগ পাবে এই স্বপ্ন দেখি

ট্রাভেল বাংলাদেশ : ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড পাওয়া কতটা আনন্দের এবং এর ফলে কি দায়িত্ব আরও বেড়ে গেলো বলে মনে করছেন?




ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড ২০২০ জিতেছেন ডা. সাকিয়া হক


সাকিয়া হক : ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড পাওয়াটা অনেক আনন্দের, বিস্ময়করও বটে। জানতাম না যে আমাকে মনোনীত করা হবে। আর আপনি তো জানেন যে, বাংলাদেশে যখন কোনো অ্যাওয়ার্ড/ প্রতিযোগিতা থাকে, কেউ কাউকে জানায় না। এ বিষয়টা আমি খেয়াল করেছি। কোথায় কি অ্যাওয়ার্ড হচ্ছে, কতজন কোথায় এড হয়ে যায়, এসব আমি মনে হয় মিস করে ফেলি। এসব সাধারণত আমি খেয়াল করি না, চোখেও পড়ে না। আমি মনে করি, কাজ করে যেতে হবে। কখনো থামানো যাবে না। অ্যাওয়ার্ড নিজের মতো করে আসবে। আর আসলে আসবে, না আসলে নাই।

ট্রাভেল বাংলাদেশ : আপনি পর্যটন উদ্যোক্তা। গড়ে তুলেছেন বড় একটি সংগঠন। কিন্তু এখন আপনি পুরোদমে ডাক্তারি পেশায় নিয়োজিত আছেন। কীভাবে উভয় দিক সামলে নিচ্ছেন?

সাকিয়া হক : উভয় দিকটা এখন সামাল দিচ্ছি না। হেলথ সেক্টরে যেহেতু ঢুকে পড়েছি, এখন দুটাতে একসাথে সময় দেয়া পসিবল না। ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশ এখন সংগঠন হিসেবে উঠে গেছে। এটাকে এতটা সময় দেয়ার আর তেমন কিছু নেই। আমাদের বড় একটা ভলান্টিয়ার টিম আছে, আমাদের প্রতিটা জেলায় ভলান্টিয়ার টিম আছে, বিশাল একটা সুন্দর কমিটি আছে। ওরা সব কিছু এখন দেখে নেয়। হ্যাঁ, প্রথম তিন বছর কিন্তু আমি আর মানসী একেবারে নিয়মিত সময় দিয়েছি, সুন্দরভাবে দেখেছি। এখন আমরা ওদের ওপর ছেড়ে দিয়েছি। কোনো পারমিশন বা পরামর্শ লাগলে ওরা আমাদের কাছ থেকে নিয়ে নেয়। তবে যখন আবার ট্যুর হবে, তখন আবার সুপারভাইজ করব। কিন্তু খুব যে পুরোদমে এখন আমি ট্রাভেল করছি এমন না। একটা সময় এসেছে চাকরিকে প্রাধান্য দিতে হবে, যে জন্য ডাক্তার হয়েছি সেটাকেও প্রাধান্য দিতে হবে।




সাকিয়া হক পেশাগতভাবে একজন ডাক্তার। ছবি: ডা. সাকিয়া হক



ট্রাভেল বাংলাদেশ : নারী পর্যটকদের ভ্রমণের ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা ফেস করতে হয়, সেক্ষেত্রে নারীর চোখে বাংলাদেশ ও ট্রাভেলেটেস অব বাংলাদেশ কী কী উদ্যোগ নিচ্ছে এবং সামনে কী কী প্ল্যান আছে?

সাকিয়া হক : উদ্যোগ কিছু নিচ্ছি আমরা। নারীর চোখে বাংলাদেশে যেমন আমরা পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা নিচ্ছি। আগেও বলেছি সেটা। এছাড়াও আমরা এর মাধ্যমে নারীদের সেলফ ডিফেন্সের ওপর ওয়ার্কশপ করাবো, যা ইভটিজিংয়ের মতো সমস্যা দূর করতে অনেকটা সহজ হবে। পুরোটা তো একেবারে করা যাচ্ছে না। কিন্তু অনেক মানুষের মাধ্যমে যেহেতু কাজটি হবে, তাই প্রভাব পড়বে। এছাড়াও আমরা ছোট ছোট ওয়ার্কশপ করাবো, যেমন স্কিলস ডেভেলপমেন্ট এর ওপর ওয়ার্কশপ, ফটোগ্রাফি, মোটর সাইকেল, স্কুটি রাইডিং, বাইসাইকেল রাইডিং ইত্যাদির ওপর ট্রেনিং প্রদান করা হবে। আমার মনে হয় এগুলোর মাধ্যমে একটা মেয়ে আত্মবিশ্বাস ও স্বাধীনভাবে নিজেকে চিন্তা করতে পারবে। নিজের যেকোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সে অতিক্রম করতে পারবে।

আরও পড়ুন : টিবিডি ইন্টারভিউ উইকলি : 'পর্যটন শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি সহযোগিতার বিকল্প নেই'

ট্রাভেল বাংলাদেশ : ভ্রমণের বেলায় আপনার নিজের অনুপ্রেরণার উৎস কোথায়?

সাকিয়া হক : অনুপ্রেরণাটা বাড়ি থেকে এসেছে। যখন বলতো যে, বিয়ে না করে কিছু করতে পারবে না। এগুলো আসলে বাড়ি থেকে, সমাজ থেকে, নানা প্রতিবন্ধকতা থেকে এসেছে। তখন মনে হলো যে, কিছু করা দরকার। এভাবেই মূলত ভ্রমণের অনুপ্রেরণা এসেছে।  

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : সাইফুল্লাহ সাদেক