টিবিডি ইন্টারভিউ উইকলি : ‘পর্যটন সেক্টর থেকে আর পেছনে ফেরার ইচ্ছা বা সুযোগ কোনোটাই নেই’
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : ট্রাভেল বিডি ইন্টারভিউ উইকলিতে 'টিজিবি' এর প্রতিষ্ঠাতা ইমরানুল আলম

ট্রাভেল বাংলাদেশ : নিজের ভ্রমণের প্রতি ভালো লাগার শুরু কীভাবে?
ইমরানুল আলম : ভ্রমণের প্রতি ভালো লাগা শুরু আসলে ছোট বেলা থেকে যখন ভ্রমণ করতাম এবং বিভিন্ন ম্যাগাজিন পড়তাম তখন থেকে। নিউজ পেপারে ভ্রমণের লেখা পড়তাম। এগুলো থেকে মোটামুটি একটা ভালো লাগা তৈরি হয়। আর টেলিভিশন একটা মাধ্যম ছিলো ভালো লাগা তৈরিতে। আমি যখন স্টুডেন্ট ছিলাম, তখন থেকে প্রচুর ঘুরাঘুরি করতাম। ট্রাভেল বাংলাদেশ : নিজে ভ্রমণ উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার পেছনে কারণগুলো কি ছিলো?
আরও পড়ুন : ‘সমাজের নানা প্রতিবন্ধকতা থেকেই ভ্রমণের অনুপ্রেরণা এসেছে’
ইমরানুল আলম : এটা বলা যায় যে হুট করে হওয়া। আমার আসলে সোশ্যাল সায়েন্স এবং ডেভেলপমেন্ট সেক্টরে কাজ করার খুব ইচ্ছা ছিলো। আমি ২০১০ সাল থেকে ২০১৪ সালের শেষ পর্যন্ত ডেভেলপমেন্ট সেক্টরে কাজ করেছি। রানা প্লাজা, পথ শিশুদের নিয়ে ইত্যাদি কাজ করেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সোশ্যাল সায়েন্স থেকে পড়েছি। ওদিকে আমার প্রফেশনাল চিন্তা ছিলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ঘুরাঘুরিটা ২০০৯ সাল থেকে শুরু বন্ধু-বান্ধব মিলে। নিজের জন্য ঘুরতাম। ২০১৪ সালের শেষ দিকে আমরা একটা সুন্দরবন ট্যুর দিয়েছিলাম। ওই ট্যুরটা থেকে আমার প্রফেশনাল চিন্তা আসে আর কি। ওই ট্যুরটা থেকে আমরা প্রফেশনাল ট্যুর দেয়ার ঘোষণা দিলাম। তখন থেকে আমরা অনুপ্রাণিত হয়েছি প্রফেশনাল কিছু করার।
ট্রাভেল বাংলাদেশ : ট্যুর গ্রুপ বিডি'র শুরুর গল্পটা শুনতে চাই।
ইমরানুল আলম : ট্যুর গ্রুপটা ২০০৯ সালেই করা। ঘুরাঘুরি করতে করতে করা । নিজেরা মজা করেই করেছিলাম।আমরা ভার্সিটিতে যখন নিজেরা একসাথে ঘুরতাম, তখন শুরু। বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের বন্ধুরা মিলে আমরা একসাথে ঘুরতাম। ঘুরার সময় আমরা ভাবলাম যে, দলটার একটা নাম দিই। সেই চিন্তা থেকে ওই সময় নাম দিই ট্যুর গ্রুপ। এই গ্রুপ নাম দিয়ে আমরা ৫ বছর ঘুরেছি। আমাদের তখন ঘুরাঘুরি ছিলো আসল ভার্সিটি কেন্দ্রিক। যেখানে যেখানে ভার্সিটির হল পাওয়া যায় সেখানে কম টাকায় আমরা ঘুরতাম। চট্টগ্রাম, খুলনা, ময়মনসিংহ, যেখানে ভার্সিটি থাকতো সেখানে খোঁজ- খবর নিয়ে যেতাম। ২০০১৪ সাল পর্যন্ত আমাদের ট্যুর গ্রুপ নামই ছিলো। যখন আমরা প্রফেশনাল ট্যুর শুরু করি তখন ট্যুর গ্রুপের সঙ্গে বিডি যুক্ত করে দিয়ে যাত্রা করলাম-ট্যুর গ্রুপ বিডি। এভাবেই শুরু ।

ইমরানুল আলম : বিশেষত্ব আসলে আমি সেভাবে বলতে পারবো না। এটা যারা আমাদের সাথে ঘুরেন তারা ভালোভাবে বলতে পারবেন। তারপরও বলি, আমরা যখন ঘুরতাম, তখন তো অনেক মানুষ ঘুরতে যেতে চাইতো। কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের কারণে ঘুরতে যেতে পারেন না। যার মধ্যে অর্থ একটা বড় সমস্যা। আবার অনেকের কাছে টাকা আছে। তারপরও ঘুরতে পারছেন না। তথ্যের অভাব কিংবা একটা ভালো গাইডেন্সের অভাব, বিশ্বস্ত কোনও জায়গার অভাব বা কাদের মাধ্যমে যাবো সেটা একটা বিষয়। এ জিনিসগুলো আমরা চিন্তা করলাম যে, খরচ কমানোর চেয়ে ভালো সার্ভিস যদি আমরা দিতে পারি, তাহলে মনে হয় অনেক মানুষ ঘুরতে যাবে, যারা এসবের কারণে ঘুরতে যেতে পারেন না। আমরা আসলে টোটালি সার্ভিস ওরিয়েন্টেড বিষয়টাকে ফোকাস করেছিলাম, আমরা যা বলবো তা করবো, পারলে তার থেকে বেশি করবো, কিন্তু কম যেন না হয়। এই ফোকাসটা দিয়ে আমরা বন্ধুরা এগিয়ে এসেছি আর কি।
আরও পড়ুন : ‘অভ্যন্তরীণ পর্যটনকে এখন বেশি ফোকাস করা উচিত’
ট্রাভেল বাংলাদেশ : ট্যুর গ্রুপ বিডি'র ট্যুরের বাজেট, নিরাপত্তা ও ট্যুর সার্ভিসকে একটি বিশেষ জায়গায় নিয়ে যেতে কি কি চেষ্টা ছিলো?
ইমরানুল আলম : প্রথমটা হচ্ছে বাজেট। বাজেটের বিষয়ে আমরা একই জায়গায় ২/৩টা ফরম্যাটে সাজিয়েছিলাম। ধরুন, সাজেক একটা কমন জায়গা। সেখানে আমরা ২/৩টা ট্রিপ সাজাই। একটা দেখা যাচ্ছে খুব লাক্সারিয়াস। এসি বাসে যাচ্ছি-খাচ্ছি। এটার বাজেট অবশ্য একটু ভিন্ন হবে। আবার মিড লেভেলের একটা ট্রিপ। মোটামুটি মিডল ক্লাস। তারা যেন খরচ বহন করতে পারেন সেদিকে লক্ষ্য রেখে ট্রিপ সাজাই। আবার একটা গিয়েছিলাম স্টুডেন্ট বাজেটে। এভাবে ৩টা ফরম্যাটে ভাগ করেছিলাম। যে যে বাজেটে ঘুরতে যেতে চান তাকে সে বাজেটে নিয়ে যাওয়া। যেন অন্তত যে কেউ একটা ট্রিপ করে ফেলতে পারেন। আর নিরাপত্তার বিষয়টা আসলে সবার আগে ছিলো। আমরা সব সময় সেফটি ফাস্ট মেইন্টেইন করি। এই বিষয়টাতে শুরু থেকে ফোকাস ছিলো আমাদের। ছেলেরা দেখা যাচ্ছে, নিরাপত্তার বিষয়ে তুলনামূলক কম সমস্যায় পড়েন। তবে মেয়েদের ক্ষেত্রে এটা সবার আগে। এটা সেনসিটিভ। নিরাপত্তার অভাবে বাড়ি থেকে মেয়েদের ঘুরতে যেতে দেয়া হয় না। তারাও সংকোচ বোধ করেন। একারণে আমরা যেটা করতাম, যেখানে ট্যুর করি সেখানে আমাদের নিজস্ব টিম আছে, সার্কেল আছে। ওই সার্কেলের কাছ থেকে যাবার আগে সেখানে কি কি নিরাপত্তার ঘাটতি আছে, কোন দিকে দিয়ে গেলে ভালো, এসব যাবতীয় খবর রাখতাম। কোন দিকে কি অবলম্বন করা উচিত এভাবে একটা প্লান করে আয়োজন করতাম। আমরা মূলত কমন জায়গাগুলোতে ভ্রমণ করতাম শুরুতে। লোকাল কিছু সহযোগিতা আমরা গ্রহণ করতাম।
ট্রাভেল বাংলাদেশ : আপনার রিসোর্টের উদ্যোগগুলো সম্পর্কে জানতে চাই।
ইমরানুল আলম : আমাদের আসলে ৫টার মতো রিসোর্ট আছে। ট্যুর গ্রুপ বিডি থেকেই এগুলো করা। সেন্টমার্টিনে আছে আমাদের নোনাজল বীচ রিসোর্ট, কক্সবাজারে আছে নীলিমা বীচ রিসোর্ট, সাজেকে আছে দুটি রিসোর্ট- লুসাই কটেজ, আরেকটা হচ্ছে আদ্রিকা ইকো কটেজ এবং শ্রীমঙ্গলে আছে হিমাচল কটেজ। আরও একটা নতুন কটেজ করছি। সেটা প্রক্রিয়াধীন। আর সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে আমাদের নিজস্ব একটা বোট আছে-সিন্দাবাদ তরী। আমরা যখন ট্যুর করতাম তখন ওসব জায়গায় স্থানীয়দের সাথে ভালো সম্পর্ক হয়ে যেতো, তাদের মাধ্যমে পরামর্শ করে কোন জায়গাতে রিসোর্ট করা যায় তা খোঁজ খবর নিয়ে তারপর করতাম। এগুলো আমাদের মাথায় আসতে থাকে। প্রথমে আমরা সেন্ট মার্টিন দিয়েই শুরু করেছিলাম। এরপর একটার পর একটা করা। পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে করেছি।

ইমরানুল আলম : এটা আসলে বলার অপেক্ষা রাখে না। অপূরণীয় ক্ষতি। আমরা রাইজিং কোম্পানি। প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি না। একটা রাইজিং কোম্পানির জন্য রাইজিংয়ের শুরুতে ৭ মাসের মতো সময় বসে থাকা, বসে বসে ভাড়া দেয়া, কর্মচারীদের বেতন দেয়া, বিভিন্ন প্রজেক্টগুলোর যে খরচ, ওখানে বিভিন্ন খরচ থাকে; এসময় আমাদের জন্য বিশাল ক্ষতি। অনেকটা পেছনে চলে গেছি আমরা!
আরও পড়ুন : ‘আমার বিশ্বাস, পর্যটনের সকল সংকট আমরা কাটিয়ে উঠতে পারব’
ট্রাভেল বাংলাদেশ : করোনা ক্ষতি থেকে ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচাতে কী কী উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন?
ইমরানুল আলম : করোনার এই কয়েক মাসে দেশে ট্যুরিজম সেক্টর নামে যে কিছু একটা আছে. এটা তো আমরা বুঝতে পারিনি। সরকারের দিক থেকে যদি এই সেক্টর নিয়ে একটু অনুধাবন করতো এবং একটা ভালো বডি যদি দাঁড়ায় এই ভেবে যে, গার্মেন্টস সেক্টর নিয়ে শুধু পড়ে না থেকে, পাশাপাশি আরও সেক্টর আছে। এভাবে যদি সরকার মনে করে তাহলে আমরা ছায়া পেতাম। সরকার হয়তো মনে করে, কিন্তু তার প্রকাশটা আমরা পাচ্ছি না। হয়তো ভেতরে মিটিং হতেও পারে সরকারের। আমরা হয়তো জানতে পারছি না। সরকারের যদি দৃষ্টি ছিটেফোঁটাও পড়ে তাহলে আমরা গার্ডিয়ান খুঁজে পাই। আমরা তো লাস্ট ৭ মাস গার্ডিয়ানের খোঁজ পাইনি।
ট্রাভেল বাংলাদেশ : নিজের ও ট্যুর গ্রুপ বিডিসহ ট্যুরিজম নিয়ে সামনের প্ল্যান কী?
ইমরানুল আলম : এই সেক্টরে আমার আসলে ৫ থেকে সাড়ে ৫ বছর হয়ে গেছে। এখন যতো পিছিয়ে যাই না কেন, এই সেক্টর থেকে আর পেছনে ফেরার কোনো ইচ্ছা বা সুযোগ আমাদের নেই। এখন শুধু সামনে এগিয়ে যাওয়া। করোনার প্রভাব তো থাকবেই। এমনিতেই আমাদের এই সেক্টরে যেকোনো দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে। ঝড়-বৃষ্টি, যাই হোক এখানে সব সময় প্রভাব পড়ে। এগুলো তো থাকবেই। আর করোনা তো আমাদের ভাবনায় ছিল না। তাই একটু সংকটে পড়ে গেছি। এখন আমরা সামনে আগাবো। যেভাবে আগাচ্ছিলাম সেই গতিতে আগাবো আবার। করোনার এই শেষের দিকে এসে আমরা ইতোমধ্যে টাঙ্গুয়ার হাওর ট্রিপ করেছি। চট্টগ্রামের দিকে মিরসরাইয়ের ঝর্ণাগুলোতে ট্রিপ করেছি, রাঙামাটির দিকে ট্রিপ আছে। এভাবে আমরা নতুন করে আবারও শুরু করে দিয়েছি।
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : সাইফুল্লাহ সাদেক এস এম