আর্টেমিস মন্দির : প্রাচীন ইফেসাস শহরের অন্যতম স্থাপত্য

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : আর্টেমিস মন্দির

আর্টিমিস মন্দির

আর্টিমিস মন্দির। ছবি : সংগৃহীত


 ইতিহাস-স্থাপত্যের অপূর্ব দেশ তুরস্কের জনপ্রিয় স্থানগুলোর একটি হল ইফেসাস। প্রাচীন বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের একটি হল এই ইফেসাস শহর। গ্রীক ও রোমান ধ্বংসাবশেষের কিছু অংশ এখানে সংরক্ষিত আছে। ইফেসাসের কিছু আকর্ষণীয় স্থান হচ্ছে লাইব্রেরী অফ সেলসিয়াস এবং ট্যাম্পল অফ হেড্রিয়ান এবং প্রাচীন থিয়েটার। এখানে আরও রয়েছে পাহাড়ের ওপর ঈসা বে মসজিদ, অটোমান এস্টেট, গ্র্যান্ড দুর্গ, ভার্জিন মেরির ভবন, আরেও অনেক পুরনো ঐতিহাসিক ভবন। তবে, ইফেসাস সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত হয়েছে প্রাচীন আর্টিমিস মন্দির (Temple of Artemis) এর জন্য। আর্টিমিস মন্দিরটির অপূর্ব স্থাপত্য শিল্প এটিকে করেছে বিশ্বের এক অসাধারণ নিদর্শন। তুরস্কের ইজমির প্রদেশের মাঝখানে সেলকুক জেলা শহর অবস্থিত। এই শহর থেকে ২ কিলোমিটার দূরে প্রাচীন এলাকা 'ইফেসাস'। আর এখানেই 'আর্টিমিসের মন্দির' অবস্থিত। এর অসাধারণ স্থাপত্য শিল্পের জন্য এখানে অসংখ্য পর্যটকদের আগমন ঘটে।

'আর্টিমিস মন্দির'-এর নির্মাণ করেছিলেন গ্রিকরা। প্রাচীন যুগে গ্রিক ও রোমানরা বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা করতো। দেব-দেবীদের জন্য তৈরি করতো মন্দির। রোমানরা এই মন্দিরকে ডাকে 'ডায়না মন্দির' বলে। গ্রিক পুরাণ অনুসারে, আর্টেমিস ছিলেন গ্রিকদের দেবী। রোমানরা আবার তাকে বলতো 'দেবী ডায়না'। দেবী ডায়না বা দেবী আর্টিমিস ছিলেন শিকারের দেবী। প্রাচীনকালে মানুষ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতো। যার কারণে এই দেবীকে সন্তুষ্ট রাখা গুরত্বপূর্ন ছিল। এজন্যই গ্রিকরা খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ অব্দে ইফেসাস নগরীতে এই মন্দির নির্মাণ করে। মন্দিরটি তৈরি করতে সময় লেগেছিল প্রায় ১২০ বছর। অপূর্ব স্থাপত্যের এই মন্দিরটি ৩৭৭ ফুট লম্বা ও ১৮০ ফুট চওড়া। এর পুরোটাই মার্বেল পাথরে তৈরি। এতে ১২৭টি স্তম্ভ ছিল, যার প্রত্যেকটি ৬০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট। দেবীর মূর্তির ঘরের চারিদিকে দুই সারিতে ৩৬টি কলাম ছিল। যার উচ্চতা ছিল ৪০ ফুট।


আর্টিমিস মন্দির

ছবি : সংগৃহীত


 কলামগুলো সোনা দিয়ে মোড়ানো ছিল। দেয়ালে ছিল অনেক চিত্রকর্ম। এর ছাদ তৈরি করা হয়েছিল নকশা করা কাঠ দিয়ে। এর প্রতিটি দেয়ালজুড়ে বসানো ছিল মণি, মুক্তা, রুবি, পান্না আর হীরক খণ্ডের মতো মহামূল্যবান রত্নরাজি।

আর্টেমিস মন্দির ঃ মূর্তি

প্রবেশ পথে ছিল দুটি ডায়নার মূর্তি। যেগুলো ছিল মার্বেল পাথরের তৈরি। যাতে রত্ন খচিত ছিল। এই মন্দিরটি মার্বেল পাথরে তৈরি হওয়ার কারণে অনেক দূর থেকে দেখা যেত। রাতে চাঁদের আলোতে মন্দিরটি চকচক করতো। এই মন্দিরের প্রধান মূর্তিটির নকশা করেছিলেন Endoeus। আর মন্দিরের অন্যান্য অবকাঠামো নকশা করেছিলেন ভাস্কর Rhoeeus। বর্তমানে মন্দিরটির ধ্বংসাবশেষ অবশিষ্ট আছে। এর শুধু ভিত্তি প্রস্তর ও স্থাপত্যের অংশ বিশেষ দেখা যায়। এই মন্দিরটি বেশ কয়েকবার ধ্বংস ও পুনর্নির্মাণ করা হয়। ধারণা করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীতে এক ভয়াবহ বন্যায় মন্দিরটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মন্দিরটির অনেকাংশ বালু ও পলিমাটিতে চাপা পড়ে।

পরে খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ অব্দে এর পুনর্নির্মাণ কাজ শুরু হয়। স্থপতি Chersiphson ও তার ছেলে Metagenes-এর পুনর্নির্মাণের এর কাজ করেন। গ্রিক ও রোমান ইতিহাস মতে এরপরে আরেকটি ঘটনা ঘটে। এই মন্দির ধ্বংস করে বিখ্যাত হওয়ার জন্য Herostratus নামে এক ব্যক্তি খ্রিস্টপূর্ব ৩৫৬ অব্দে মন্দিরটিতে অগ্নি সংযোগ করে। হেরোস্ট্রেটাস ভেবেছিল এই কাজটি করলে বিশ্বব্যাপী তার নাম ছড়িয়ে পড়বে, সে হয়ে উঠবে বিখ্যাত এক ব্যক্তি। কিন্তু বিচারে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় এবং তার নাম প্রকাশ্যে উচ্চারণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এই আইন অমান্য করলে শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড।


আর্টিমিস মন্দির

ছবি : সংগৃহীত


পরবর্তীতে আলেকজান্ডার এই মন্দিরটি তৈরির উদ্যোগ নিলে ইফেসাসের জনগণ কৌশলে আপত্তি জানায়। আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর তারা নিজেরা মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করে। এবার মন্দিরটি আগের চেয়ে আরও বড় করে নির্মাণ করা হয়। এবার এটি লম্বায় ৪৫০ ফুট ও প্রস্থে ২২৫ ফুট ছিল। এর উচ্চতা ছিল ৬০ ফুট এবং কলাম ছিল ১২৭টি। এই কাজ শুরু হয় খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ অব্দে। অনেক বছর শেষে এর নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ হয়। এরপর ২৬৮ সালে পূর্ব জার্মানির গোথ উপজাতি মন্দিরটি আক্রমণ করে ধ্বংস করে দেয়। পরে সম্ভবত এটি আর পুননির্মাণ বা মেরামতের উদ্যোগ নেয়া সম্ভব হয়ে উঠেনি। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের একটি অনুসন্ধানী দল এই মন্দিরটির ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পান। ব্রিটিশ মিউজিয়ামে এ মন্দিরের যাবতীয় তথ্য ও নমুনা সংরক্ষিত আছে।  

পড়ুনঃ ভ্রমণের গল্প বলা কালজয়ী ৫ বই

রুবাইদা আক্তার  এস এম