বিস্ময়কর আলেকজান্দ্রিয়ার বাতিঘর : মিশর
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : সপ্তাশ্চর্যের তালিকায় আলেকজান্দ্রিয়ার বাতিঘর

প্রাচীন সময়ের সবচেয়ে উঁচু বাতিঘরটি হল এই আলেকজান্দ্রিয়ার বাতিঘর। বিস্ময়কর এই বাতিঘরটি ভূমধ্যসাগরের উপকূলে মিশরের ফারোস নামের এক দ্বীপে ছিল। এই দ্বীপটি অবস্থিত ছিল আলেকজান্দ্রিয়া বন্দরের কাছে। পানির ওপর দিয়ে নির্মিত এক উঁচু পথের মাধ্যমে দ্বীপটি মূল ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত ছিলো। এই বাতিঘরটি জিউস সোটার (Zeus Soter) এবং গ্রিক সমুদ্রের দেবতা প্রোটিয়াসকে উৎসর্গ করা হয়েছিলো। প্রোটিয়াসকে সেসময় 'সমুদ্রের বুড়ো' (Old man of the Sea) বলেও অভিহিত করা হতো। আলেকজান্দ্রিয়া শহরের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন অ্যালেক্সান্ডার দ্য গ্রেট। নীল নদের পাড়ে অবস্থিত হওয়ায় এবং এর ধারে প্রাকৃতিক বন্দর হওয়ার কারণে এই শহরটি দ্রুত বাণিজ্যিক বন্দরনগরী হিসেবে উন্নতি লাভ করে। খ্রিস্টপূর্ব ২৯০ অব্দে তৎকালীন মিশরের রাজা সোটার (১ম টলেমি বলেও তাকে অভিহিত করা হয়) তার ক্ষমতা ও মহিমা প্রদর্শনের স্থায়ী স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে এই বিশাল বাতিঘর ভবন নির্মাণ করার উদ্যোগ নেন।
এই প্রকল্প গ্রহণ করার প্রায় ২০ বছর পর ২য় টলেমির রাজত্বকালে এই বাতিঘর নির্মাণের কাজ শেষ হয়। আলেকজান্দ্রিয়ার বাতিঘর সেই প্রাচীন সময়ে স্থাপত্যশিল্পে এক বিশাল নিদর্শন ছিল। এই বাতিঘরটি শুধু জাহাজগুলোকে দিক নির্দেশনাই দিত না, এটি সেই সময় একটি ব্যাপক আলোচিত এক দর্শনীয় জায়গাও ছিল। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা এটি পরিদর্শনে আসতেন। এর স্থাপত্যকলার অনুসরণ করে তখনকার সময় অন্য সকল বাতিঘর নির্মাণ করা হতো।
আলেকজান্দ্রিয়ার বাতিঘর ঃ সপ্তাশ্চর্যের তালিকায় জায়গা
বিশাল এই বাতিঘরটি প্রাচীন সপ্তাশ্চর্যের তালিকায়ও জায়গা করে নিয়েছিল। এই বাতিঘরটি ৩৫০ ফুটেরও বেশি উঁচু ছিলো । উপকূলের পাশের এক চুনাপাথরের খনি থেকে উত্তোলিত চুনাপাথর দিয়ে এটি নির্মাণ করা হয়েছিলো। ১৯০৯ সালের দিকে থিয়েরশের একটি গবেষণা (Pharos, antike, Islam und Occident) থেকে এই বাতিঘরের নির্মাণ প্রণালি সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য জানা যায়। এর পুরো গায়ে একটি পেঁচানো সিঁড়ি নির্মাণ করা হয়েছিল। এই সিঁড়ি বেয়েই ওপরে উঠে আগুন জ্বালানো হতো। এ আগুন দিন-রাত সবসময় সতর্কতা ও রক্ষণাবেক্ষণের সাথে জ্বালিয়ে রাখা হতো। নির্মাণের পর থেকে ধ্বংসের হওয়ার আগ পর্যন্ত এই বাতিঘরের আলো কোনো দিন নিভতে দেখা যায়নি। এর চারপাশে প্রায় ৫০ কিলোমিটার অঞ্চল পর্যন্ত এটির আলো দৃশ্যমান ছিল। এই বাতিঘর সম্পর্কিত প্রাচীন তথ্য থেকে জানা যায়, এর শীর্ষে একটি ভাস্কর্য স্থাপিত হয়েছিল। ধারনা করা হয়, এই ভাস্কর্যটি সম্ভবত সূর্যদেবতা হিলিওসের রূপে ১ম টলেমি সোটার বা অ্যালেক্সান্ডার দ্য গ্রেটের ছিল। মধ্যযুগে সুলতান আহমেদ ইবন তৌলুন বাতিঘরটিকে একটি ছোট মসজিদ হিসেবে পরিণত করেন। দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বাতিঘরটি সগর্বে তার মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিলো। ১৪৭৭ শতাব্দীতে মামলুক সুলতান কা'ইত বে বাতিঘরটির ধ্বংসাবশেষ থেকে একটি দুর্গ তৈরি করেন।
১৯৯৪ সালে আলেক্সান্দ্রিয়ান অধ্যয়ন কেন্দ্র (Centre d’Etudes Alexandrines) এর প্রতিষ্ঠাতা প্রত্নতত্ত্ববিদ জন-ইভস এমপেরার এই ফারোস দ্বীপের তলায় কিছু চমকপ্রদ জিনিস খুঁজে পান। তিনি এখানে কয়েকশ' রাজমিস্ত্রির তৈরি গাঁথুনি খুঁজে পেয়েছিলেন। সম্ভবত যখন বাতিঘরটি ধ্বংস হয়ে যায়, তখন এই গাঁথুনিগুলো সমুদ্রের পানিতে ডুবে গিয়েছিল। ধারণা করা হয়, সম্ভবত ১৩৩০ সালের কোনো এক প্রলয়কারী ভূমিকম্পে এটি পানিতে ধ্বসে পড়ে। এর আগেও বাতিঘরটির আশেপাশে বেশ কয়েকটি ভূমিকম্প হয়েছিল যা বাতিঘরটিকে প্রচণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত করে।
রুবাইদা আক্তার এস এম