ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট : ইউরোপ মহাদেশ (নরওয়ে এবং ফিনল্যান্ড)

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দুই মহারথী সৌন্দর্যের দিকেও বিশ্বে শীর্ষে



বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত ও সভ্যদেশ হিসেবে খ্যাতনামা এই স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশদুটো ঐতিহ্যেও ভরপুর

বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত ও সভ্যদেশ হিসেবে খ্যাতনামা এই স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশদুটো ঐতিহ্যেও ভরপুর। ছবি : সংগৃহীত


 বলা হয়, ইউরোপে সবচেয়ে সুন্দর রাত হয় বাল্টিক সাগরের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা স্ক্যান্ডেনেভিয়ান অঞ্চলে। ইউরোপের আরও শত শত পর্যটন এলাকার বাইরে যদি জীবনের শ্রেষ্ঠ রাত কাটাতে হয় তাহলে সম্ভবত আপনাকে বাল্টিক সাগর পাড়ি দিতে হবে। সুইডেন, ফিনল্যান্ড আর নরওয়েতে গেলে আপনি বেশ কিছু বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়া জায়গার দেখা পাবেন। আজ থাকছে নরওয়ে এবং ফিনল্যান্ডের মোট ৬ টি জায়গার সন্ধান। বলে রাখা দরকার, নরওয়ে এবং ফিনল্যান্ড, দুটো দেশেই মোট বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়া জায়গা রয়েছে ৮টি করে। তবে এসবের মাঝে সেরা ৬টির বর্ণনাই থাকছে এই পর্বে।


পর্যটকরা নরওয়ের গেইরানগারফিয়র্ডে বসে নয়নাভিরাম সৌন্দর্য উপভোগ করছে

পর্যটকরা নরওয়ের গেইরানগারফিয়র্ডে বসে নয়নাভিরাম সৌন্দর্য উপভোগ করছে। ছবি : জর্ড

নরওয়ে

গেইরানগারফিয়র্ড এবং নিইরয়ফিয়র্ড-(Geirangerfjord and Naeroyfjord)

নিশীথ সূর্যের দেশ নামে পরিচিত দেশটি। এটি এমন এক দেশ যেখানে আপনি ২৪ ঘন্টাইই সূর্য দেখবেন। এখানকার প্রধান জীবিকা মাছ ধরা। বলা হয়, নরওয়ে জেলেদের দেশ। বিশ্বের ৫০ শতাংশ তিমির তেল নরওয়েই সরবরাহ করে। এখানকার ফিয়র্ড বা সমুদ্রখাড়ি ইন্টারনেটে দেখেননি এমন মানুষ সম্ভবত নেই।


নিইরয়ফিয়র্ড

নিইরয়ফিয়র্ড। ছবি : সংগৃহীত


 স্ক্যান্ডেনেভিয়ান অঞ্চলের রাত কেন সবচেয়ে বেশি সুন্দর তা এখানকার সু-উচ্চ সমুদ্র খাড়ির কাছে আসলেই টের পাবেন। রাতের আকাশে অজস্র তারার মাঝে আপনি এক সমুদ্রখাড়ির মাঝে দাঁড়িয়ে... এই অপার্থিব অনুভূতি পেতে হলে আপনাকে যেতে হবে গেইরানগারফিয়র্ড বা নিইরয়ফিয়র্ডে। নরওয়ের একমাত্র প্রাকৃতিক বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে এই দুই সমুদ্রখাড়ি। এসব ফিয়র্ড উপভোগ করার সবচে ভাল উপায় দুটি। প্রথমত পাহাড়ের চূড়ায় যেতে পারেন অথবা ঘুরতে পারেন ছোট কোন নৌকায়। আর জেনে রাখুন, আপনি নৌকায় যে পথে যাচ্ছেন, সে পথেই বাল্টিক সাগরে রাজত্ব করতো ভাইকিংস সভ্যতার মানুষ।


বারগেন

বারগেন। ছবি : জর্ড



বারগেন (Bryggen)

নরওয়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর এবং দেশের অন্যতম প্রধান সমুদ্র বন্দর বারগেন। ১৫শ শতক থেকে শুরু করে এটি দেশের অন্যতম বানিজ্যকেন্দ্র এবং পর্যটনকেন্দ্র। কালের বিবর্তনে এটি বেশ অনেকবার আগুণে পুড়ে আর সমুদ্রের কাছে লড়াইয়ে পরাজিত হয়েছে। তবে, নতুনভাবে তৈরি করার সময় আগের আদল পুরোপুরি রক্ষত হয়েছে। এখানে পাবেন প্রাচীন ঐতিহ্য, অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং বানিজ্যিক বন্দরের জাঁকজমকের অপূর্ব সমন্বয়। অন্যান্য শহরের মত এখানেও পাবেন পুরাতন সব ভবন যেগুলো অতীত নরওয়েজিয়ান কৃষ্টি এখনো বহন করে চলেছে। এখানে এসে আপনি সত্যিকার অর্থে বুঝতে পারবেন ১৪শ কিংবা ১৬শ শতকে ইউরোপের স্থাপত্যকলা ঠিক কেমন ছিল।


রুকান-নটোডেন ইন্ডাস্ট্রিয়াল হেরিটেজ সাইট

রুকান-নটোডেন ইন্ডাস্ট্রিয়াল হেরিটেজ সাইট। ছবি : ইউনেস্কো


 রুকান-নটোডেন ইন্ডাস্ট্রিয়াল হেরিটেজ সাইট-(Rjukan-Notodden Industrial Heritage Site) এই অঞ্চলটিতে বিংশ শতকের গোড়ায় নর্স্ক-হাইড্রো কোম্পানি কৃত্রিম সার উৎপাদন করতো। বর্তমানে এটি নরওয়ের শিল্প বিপ্লবের একটি স্মারক হিসেবে টিকে আছে। এখানে পুরো কোম্পানির শহর অব্দি টিকে আছে, যা প্রতিমুহূর্তে স্মরণ করিয়ে দেয়, শ্রমিকদের জীবনমান বিংশ শতকের শুরুর দিনগুলোতে কেমন ছিল। এছাড়াও এখানে নিজস্ব যোগাযোগ ব্যবস্থা, হাইড্রোলিক পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং ফ্যক্টরি আছে দর্শনার্থীদের জন্য।

ফিনল্যান্ড

পুরাতন রাউমা শহর-(Rauma Old town)

ফিনল্যান্ডে এখন পর্যন্ত কাঠের নির্মিত যে কটি শহর অক্ষত আছে রাউমা শহর তার মাঝে অন্যতম। রাউমান নির্মিত এই শহর ফিনল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলে নির্মিত হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ৬০০ বছর আছে। সেই সাথে এখানে আছে ফিনল্যান্ডের সবচেয়ে পুরাতন বন্দর এবং ১৫শ শতকে নির্মিত চার্চ।


পুরাতন রাউমা শহর

পুরাতন রাউমা শহর। ছবি : ইউনেস্কো


৬০০ বছর আগে সত্যিকার বাড়িঘর আগুনে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে নষ্ট হলেও ১৮শ ও ১৯শ শতকে এসে সংস্কারের সময় সম্পূর্ণভাবে পুরাতন দিনের আদলে গড়ে তোলায় তার আবেগ নষ্ট হয়নি।

সুমেনলিনা (Suomenlinna)

সমরবিদ্যায় যাদের আগ্রহ তাদের জন্য সুমেনলিনা অসাধারণ এক জায়গা। এটি ফিনল্যান্ডের সবচেয়ে জনপ্রিয় অবকাশ কেন্দ্রের একটি। এটি মূলত হেলসিংকি থেকে বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপ। এখানে থাকা সামরিক দূর্গটিই ফিনল্যান্ডের রাজধানী এবং দক্ষিণ উপকূলকে বেশ কয়েক শতাব্দী ধরে সুরক্ষিত রেখেছিল।


সুমেনলিনা

সুমেনলিনা। ছবি : পিন্টারেস্ট


ইউনেস্কো একে অষ্টাদশ শতকের এক অনন্য সামরিক দূর্গ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বর্তমানে এখানে একটি আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা হলেও এই জায়গার আবেদন বা সৌন্দর্যে তাতে ভাটা পড়েনি। এখনো প্রতিদিন হেলসিংকি থেকে প্রতি ১৫ মিনিটে একটি করে ফেরি সুমেনলিনায় চলে যায়।

পেটাজাভেসির পুরাতন চার্চ (Petäjävesi Old Church)

ফিনিশ স্থাপত্যের আরেক অসাধারণ নিদর্শন এই পেটাজাভেসি পুরাতন চার্চটি। কাঠের উপর নির্মিত যে অল্প সংখ্যক পুরাতন চার্চ এখনও ফিনল্যান্ডে টিকে আছে, তার মাঝে একটি হলো, পেটাজাভেসি চার্চ। ১৭৬৩ সালে নির্মিত চার্চটি এখন পর্যন্ত সব প্রাকৃতিক দূর্যোগের মাঝেও টিকে আছে। পার্শ্ববর্তী আরেকটি চার্চের জন্য পেটাজাভেসি বেশ অনেকদিন পরিত্যক্ত ছিল। তবে ১৯২০ সাল নাগাদ এটি আবার নতুনভাবে আবিষ্কার করা হয়। সেইসাথে চলে সংস্কারকাজ।


পেটাজাভেসির পুরাতন চার্চ

পেটাজাভেসির পুরাতন চার্চ। ছবি : সংগৃহীত


এটি বিয়ের জন্য অসাধারণ একটি জায়গা এবং গ্রীষ্মকালে এখনও এই চার্চটি খোলা থাকে। তবে কাঠের যেন ক্ষতি না হয়, সেজন্য প্রবেশের আগে বিশেষ স্লিপার পড়ে নিতে হবে আপনাকে।  

জুবায়ের আহম্মেদ   এস এম