যুক্তরাজ্যের আইকনিক বাকিংহাম প্রাসাদ। ছবি : ইনসাইডার
একটা প্রবাদ ছিল, 'ইংল্যান্ডের সূর্য কখনও অস্ত যায় না'। দেশ কালের গন্ডি পেরিয়ে বহুদূর অব্দিই নিজেদের নিয়ে গিয়েছিল অভিজাত ইংরেজরা। তাদের সেই স্বর্ণালী সময় আর নেই।
তবে, রয়ে গিয়েছে সেই দিনগুলোর আভিজাত্য। এখনও ইংল্যান্ড তাই আভিজাত্যের দিক থেকে অতুলনীয়। রাজকীয় পরিবেশ বজায় রেখে চলা এই দেশটিতে সারা বিশ্বের অসংখ্য নিদর্শন এসে মিশেছে।
কালের পরিক্রমায় যা এখন ইংল্যান্ডের নিজস্ব সম্পত্তি। ইংল্যান্ডের আভিজাত্যের স্বীকৃতি মিলেছে ইউনেস্কোর কাছেও। ২৫টি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট আছে দেশটিতে। ব্রিটিশ আভিজাত্যে ঠাসা তেমন কিছু নিদর্শন থাকছে ট্রাভেল বাংলাদেশের ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের এবারের তালিকায়।
ব্লেইনহাম প্যালেস, অক্সফোর্ডশায়ার। ছবি : গেটি ইমেজ
ব্লেইনহাম প্যালেস
ইংল্যান্ডে প্যালেস বা রাজপ্রাসাদের অভাব অন্তত নেই। কিন্তু এত প্রাসাদের মাঝে ব্লেইনহাম প্যালেস একেবারেই আলাদা। এটিই একমাত্র প্রাসাদ, যার মালিকানা রাজপরিবার কিংবা কোন বিশপের কাছে না। এর মালিকানা এখনও সেই মানুষদের কাছেই আছে যাদের পূর্বপুরুষ এই অনিন্দ্য প্যালেস নির্মাণ করেছেন।
ব্লেইনহাম প্যালেসের নির্মাতা জন চার্চিল। ইংল্যান্ডের মার্লবরো অঞ্চলের প্রথম ডিউক ছিলেন জন চার্চিল। চার্চিল নাম শুনলেই মনে আসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী উইন্সটন চার্চিলের কথা।
রাজনীতির মানুষ হয়েও সাহিত্য নোবেলের কীর্তি করেছেন যিনি। জন চার্চিল উইন্সটন চার্চিলেরই পূর্বপুরুষ। সে অর্থে এটি উইন্সটন চার্চিলের বাড়িও বলা চলা।
উইন্সটন চার্চিল ১৮৭৪ সালে এই বাড়িতেই জন্ম নেন। এবং ১৯০৮ সালে এখানেই মিসেস চার্চিলকে বিয়ের প্রস্তাব দেন তিনি।
সেন্ট অগাস্টিন। ছবি : উইকিপিডিয়া
মূল প্যালেসটি জন চার্চিল নির্মাণ শুরু করার পরেই রাজনৈতিক চাপে নির্বাসিত হন। তবে নির্বাসন শেষে ১৯১৭ সালে আবার এখানেই ফিরে আসেন তিনি। কিন্তু বছর তিনেক বাদেই মারা যান তিনি।
১৯৩৩ সালে শেষ হয় ব্লেইনহাম প্যালেসের নির্মাণকাজ। ব্লেইনহাম প্যালেস ঠিক ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে না থাকলেও ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটে জায়গা করে দিয়েছে এর অনন্য সৌন্দর্যগুনে।
এছাড়া, ইংল্যান্ডের সবচেয়ে গুণী উদ্যানবিদ ব্রাউনের হাতে সাজানো হয়েছে এর বাইরের দিকের বাগানটি। ব্রাউনকে ইংল্যান্ডের সেরা বাগানবিদ মানা হয়, পুরো ইংল্যান্ডে যার এমন কীর্তি আছে ১৭০টির মত।
ক্যান্টাবেরি ক্যাথিড্রাল। ছবি : গেটি ইমেজ
ক্যান্টাবেরি ক্যাথিড্রাল, সেইন্ট অগাস্টিন অ্যাবে এবং সেইন্ট মার্টিন চার্চ
ইংল্যান্ডে খ্রিস্ট ধর্মের ব্যাপক বিস্তৃতি ও প্রচারের জন্য এই তিনটি স্থানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অসীম বলা চলে। যীশু খ্রিস্টের মৃত্যুর পর ১ম বছর থেকে ইংল্যান্ডের মাটিতে টিকে আছে খ্রিস্টধর্ম। এবং ধীরে ধীরে ৪র্থ শতকে এসে ইংল্যান্ডের জনজীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে শুরু করে ধর্মটি।
সেইন্ট আগাস্টিন ৫৯৭ সালে পোপ প্রথম গ্রেগরীর নির্দেশে ইংল্যান্ডে প্রথম বড় কোন মিশনারি কাজে আসেন , পরবর্তীতে যা ব্যাপকভাবে সফল হয়। সেইন্ট মার্টিন চার্চ অবশ্য আগে থেকেই ছিল এখানে, পরবর্তীতে সেইন্ট অগাস্টিন একে বর্ধিত করেন।
সেইন্ট অগাস্টিন অ্যাবে। ছবি : সংগৃহীত
বাকি দুটি স্থাপনা অর্থাৎ ক্যান্টাবেরি ক্যাথিড্রাল এবং সেইন্ট অগাস্টিন অ্যাবে দুটোরই প্রতিষ্ঠাতা সেইন্ট অগাস্টিন। আর প্রতিষ্ঠান পর থেকেই ক্যান্টাবেরি ক্যাথিড্রাল অঞ্চলটির আর্চ বিশপের বাসস্থান হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে।
এখানেই ১১৭০ সালে রাজা দ্বিতীয় হেনরির ক্যান্টাবেরির বদলে ইয়র্কের দায়িত্ব নেয়ার প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রাণ হারান তখনকার আর্চবিশপ থমাস বেকেট। ইংল্যান্ডের দেশপ্রেমের ইতিহাসে যা এখনও অমর হয়ে আছে।
দ্য সিটি অফ বাথ। ছবি : উইকিপিডিয়া
দ্য সিটি অফ বাথ
ভুবনবিখ্যাত অক্সফোর্ড থেকে ঘন্টা দেড়েক দূরেই দেখা মিলবে দ্য সিটি অফ বাথের। আর এখানেই আপনি পাবেন ইংল্যান্ডের বুকে রোমান সাম্রাজ্যের ছাপ।
এখানকার উষ্ণ ঝর্ণার নিচে স্নানের রীতিটি চালু করেছিল রোমানরাই। আর এটি করা হয়েছিল দেবী সিউলিসের প্রতি সম্মান রেখে, ইংল্যান্ডে এসে যার পরিচয় হয়েছিল মিনার্ভা নামে।
রোমানদের বিভিন্ন নিদর্শন এখনও এখানে বিদ্যমান। যার মাঝে আছে কার্স টেবল। যেখানে রোমানরা শহর থেকে চুরি হওয়া সম্পদ ফিরে পেতে দেবি সিউলিসকে অনুরোধ করেছেন, সেই সাথে আবেদন করেছেন চোরদের যথাযথ শাস্তি দেবার জন্য।
দ্য সিটি অফ বাথ। ছবি : ব্রিটানিকা
উষ্ণ পানির এই স্নানের ব্যাপারটি জনপ্রিয় হয় সপ্তদশ শতকে। সেই সময় বায়ু পরিবর্তনে আসা রোগীদের এখানকার উষ্ণ জলে স্নান করতে বলা হত এবং সেখান থেকে পুরো ব্যাপারটি একরম ফ্যাশনে পরিণত হয়।
এখানকার বেশিরভাগ স্থাপনাইই এখনো অবিকল আঠারশ শতকের মতই আছে, এবং যা কিছুই সংস্কার করা হয়েছে মূল আদল তাতে অক্ষুণ্ণ আছে।
ডারহাম প্রাসাদ। ছবি : ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ইউকে
ডারহাম প্রাসাদ এবং ক্যাথিড্রাল
হ্যারি পটারের কথা মনে আছে? বাচ্চা হ্যারি যখন ফিলোসফার স্টোনের জন্য হন্য হয়ে ছিল কিংবা প্রফেসর ম্যাকগনাগলের ট্রান্সফিগারেশন ক্লাস? ডারহাম প্রাসাদে গেলে এসব একেবারেই চোখের সামনে উঠে আসবে।
এখানেই হয়েছিল হ্যারি পটারের প্রথম চলচ্চিত্রের শ্যুটিং। এটি ইংল্যান্ডে নর্মান আক্রমণের পরে গড়ে উঠছিল। বর্তমানে প্রাসাদটি ব্যবহার করা হয় ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের আবাসিক কাজে, যার মাধ্যমে বিশ্বের যেকোন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ব্যবহৃত সবচেয়ে পুরাতন ভবনের মর্যাদা পেয়েছে এটি।
১০৭২ সালে নির্মাণ শুরু হওয়া এই ভবনটি ইংল্যান্ডে নর্মান শাসনের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী দিক বললে অত্যুক্তি হয় না। আর এখানের লাইব্রেরীতেই আছে ১২১৬ সালে সাক্ষরিত ম্যাগনাকার্টা দলিলের শেষ চার কপির একটি।
ওয়েস্টমিনিস্টার প্রাসাদ, লন্ডন। ছবি : উইকিপিডিয়া
প্যালেস অফ ওয়েস্টমিনিস্টার এবং ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবে
এই জায়গার নাম শোনেননি এমন লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ব্রিটেনে সংসদ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে রাজকীয় ওয়েস্টমিনিস্টার প্যালেসটি। গথিক স্থাপত্যকলার আরেক অনন্য নিদর্শন বলা যেতে পারে এই ভবনকে, যার সংস্কার হয়েছিল ১৯ শতকের মাঝামাঝি পর্যায়ে।
ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবে ইংল্যান্ড এবং গ্রেট ব্রিটেনের জমিদারি ও অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা হচ্ছিল ১০৬৬ সাল থেকে। এখানে ব্রিটিশ রাজ পরিবারের অন্তত ১৬টি বিয়ে অনুষ্ঠান ঘটেছে।
যার মাঝে প্রথম ছিল ১১০০ সালে প্রথম হেনরির সাথে স্কটল্যান্ডের মাতিলদার বিয়ে আর শেষটি কেট মিডলটনের সাথে প্রিন্স উইলিয়ামের বিয়ে। এছাড়া এখানকার কবরস্থানে বেশ কয়েকজন রাজা শায়িত আছেন।
ওয়েস্ট মিনিস্টার প্রাসাদ, লন্ডন। ছবি : উইকিমিডিয়া কমন্স
সবচেয়ে আকর্ষণের আরেক জায়গা কবি চত্বর বা পোয়েটস কর্নার। যেখানে শায়িত আছেন বিখ্যাত অনেক কবি ও লেখক। এদের মাঝে জিওফ্রে চসার, চার্লস ডিকেন্স, টমাস হার্ডি, লর্ড টেনিসনের নাম উল্লেখ করা যায়।
এছাড়াও এখানে কবর না দিলেও আরো অনেক খ্যাতনামা কবি সাহিত্যিকের স্মরণ করা হয়েছে। ব্রিটেনের সাহিত্য, শিল্প এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রতি আগ্রহী হলে এই জায়গাটি আপনার জন্য আবশ্যক।
লন্ডন টাওয়ার
ইংল্যান্ড বলতেই সবার আগে যে ছবিটি মনের পর্দায় আসে তা সম্ভবত টেমস ব্রিজ আর লন্ডন টাওয়ার। বলতে গেলে এই লন্ডন টাওয়ার থেকে ইংল্যান্ডের ইতিহাসের শুরু।
১০৬৬ সালে প্রবল প্রতিদ্বন্দী রাজা হ্যারল্ড গডউইনসনকে হেস্টিংসের যুদ্ধে পরাজিত করেন নর্মান নেতা উইলিয়াম ইংল্যান্ডে শুরু করেন নর্মান শাসন। আর এখান থেকে বদলে যেতে থাকে ইংল্যান্ডের সমস্ত কিছু। সেটি রাজনীতি থেকে শুরু করে সাহিত্য-শিল্পের সব দিকেই।
টাওয়ার অফ লন্ডন। ছবি : ব্রিটানিকা
লন্ডনের এই টাওয়ারের কিছু ইতিহাস এবারে দেখা যাক। সাল ১৮৪০। রাজা পঞ্চম এডওয়ার্ড এবং তার ভাই রিচার্ড এখানেই বন্দী ছিলেন। সম্ভবত তাদের মৃত্যুদন্ডও এখানেই কার্যকর হয়েছিল।
তারো আগে ষোড়শ শতকে রাজা অষ্টম হেনরির ২য় ও ৫ম স্ত্রীর মৃত্যুদন্ড হয়েছিল এখানেই। একইভাবে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় জেইন গ্রে কে যাকে সপ্তম হেনরির ছেলে রাজা চতুর্থ এডওয়ার্ড সাম্রাজ্যের উত্তরাধীকারী মনোনিত করেছিলেন।
এছাড়া, এখানেই এখন পর্যন্ত আছে ব্রিটেনের রাজমুকুট ও রাজদন্ড। যাকে সাধারণ ভাষায় ক্রাউন জুয়েল বলা হয়। ইংল্যান্ড গেলে এই জিনিস দেখতে ভুলবেন না যেন।