সৌন্দর্য আর ঐতিহ্যে বিশ্ব দরবার উজ্জ্বল নাম গ্রীস। ছবি : লুক্সাটিক
চোখ বন্ধ করে ভাবুন তো সক্রেটিস, অ্যারিস্টটল, প্লেটো, আর্কিমিডিস, পিথাগোরাস, ইউক্লিড, অ্যারিস্টাকার্স, থিওফ্রাস্টাস... এসব নাম যদি ইতিহাসে না থাকতো, তাহলে আমাদের অবস্থা কি হতো? জিউস, আফ্রোদিতি, হেডিস, পোসাইডন, অ্যারিস, অ্যাথেনা! এসব রূপকথা না থাকলে? একথা সত্য, পৃথিবীর ইতিহাস থেকে যদি শুধুমাত্র গ্রিস তুলে নেয়া হয়, তবে একটা বিশাল শুন্যতা তৈরি হবে।
বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব আর অর্থনৈতিক সংকট থাকলেও একসময় গ্রিস ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বিকশিত সভ্যতা। বলা চলে, ইউরোপীয় জ্ঞান বিজ্ঞান ও দর্শনের সূতিকাগার ছিল গ্রিস।
এথেন্সের দর্পন দ্য অ্যাক্রোপলিস। ছবি : পিন্টারেস্ট
ইতিহাসের নানা উত্থান পতন পেরিয়ে আসা গ্রিসে দর্শনীয় স্থানেরও তাই অভাব নেই। ইউনেস্কো স্বীকৃতি পাওয়া ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট আছে ১৭টি। আজকে থাকছে জ্ঞানের রাজ্যে গ্রিসের পাঁচটি সেরা বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়া স্থানের বর্ণনা।
দ্য অ্যাক্রোপলিস (The Acropolis)
লন্ডনের দর্পন যেমন টাওয়ার ক্লক, রোমে কলোসিয়াম, প্যারিসে যেমন আইফেল টাওয়ার তেমনই গ্রিসের রাজধানী এথেন্সের একেবারে দর্পন বলা চলে দ্য অ্যাক্রোপলিস'কে। গ্রিসের রাজধানী এথেন্সের বুকে এই অ্যাক্রোপলিস ঠিক কে কবে নির্মাণ করেছে তা জানা যায়নি। তবে এটা যে অত্যন্ত প্রাচীণ এবং পবিত্র স্থান ছিল তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা চলে না। এখানে আপনি পাবেন দেবী এথেনা, পার্থেনিয়ন, এরেথনিয়ন এর মন্দির... এছাড়াও দেখার মত আছে আরো অনেক স্থাপনাই।
দ্য অ্যাক্রোপলিস। ছবি : সংগৃহীত
অলিম্পাস পর্বতের উপর বাস করা দেবতারা মাটির পৃথিবীতে ঠিক কতটা সম্মানিত ছিলেন, প্রাচীণ গ্রিসের ধর্মবিশ্বাস কতটা শক্ত ছিল তা বুঝতে পারবেন অ্যাক্রোপলিসের ভেতরকার বিভিন্ন মন্দিরের মাধ্যমে।
দ্য অ্যাক্রোপলিসের আরেক বড় আবেদন এই স্থাপত্য নিয়ে। পশ্চিম ইউরোপের রোমান ধ্যানধারণার বাইরে গিয়ে পূর্ব ইউরোপে একেবারেই অন্যরকম এক স্থাপনা গড়ে তোলে প্রাচীন গ্রিসের অধিবাসীরা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যা অগণিত স্থাপত্যবিদের জন্য প্রেরণা হয়ে আছে।
রোডস, গ্রিস। ছবি : ব্রিটানিকা
রোডস (Rhodes)
গ্রিক মিথে সূর্য দেবতা হেলিয়াসের স্মরণে নির্মিত দ্য কলোশাস অফ রোডস-এর নামেই একটি আস্ত শহরের নাম হয়ে গিয়েছে রোডস। প্রাচীন সেই স্থাপত্য এখন আর না থাকলেও হেলিয়াসের সম্মানে এখনও এই শহরের নাম রোডস। ১৯৮৮ সালে ইউনেস্কো এই শহরকে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়।
গ্রিসে অবস্থান করলেও এই শহরটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই সময়ের প্রতিনিধিত্ব করে এই সময়ে এসে। রোডস শহরটি উচ্চভূমি এবং নিম্মভূমি দু-ভাগে বিভক্ত। এর মাঝে উচ্চভূমিতে আপনি পাবেন গোথিক সময়কাল অর্থাৎ ষোড়শ শতকের শুরুর দিকের স্বাদ। আর নিম্মভূমির দিকে এসে পাবেন অটোমান শাসনামলের ছাপ। গ্রিসের মাটিতে এমন একটি জায়গা বাদ দেয়া আপনার জন্য অসম্ভব বলা চলে।
গ্রিসের প্রাচীন শহর করফু। ছবি : গ্রেগরি
প্রাচীন শহর করফু (Old city of Corfu)
সাগরের ওপারে আলবেনিয়া। ভিন্ন মহাদেশ আর ভিন্ন সংস্কৃতির এক দেশ। এপাশে গ্রিস, দোর্দন্ড প্রতাপশালী এক জগত। ৮ম শতকে গড়া এই শহর সেসময়ে সমুদ্রপথে বাণিজ্যের মূল পথ ছিল বলা যায়। সেসময়ে এই বাণিজ্যিক শহরের নিরাপত্তা বিখ্যাত ভিটেনিয়ান স্থাপত্যবিদদের হাতে মোট তিনটি দূর্গ স্থাপন করেন প্রাচীন গ্রিসের শাসকেরা। ৮ম শতকে পত্তন হওয়া শহরের মূল কাঠামো অক্ষুন্ন রেখেই এখন পর্যন্ত এই শহরটি টিকে আছে।
ভূ-মধ্যসাগরীয় এলাকার এই বাণিজ্যিক নগরীতে গেলে একেবারে নব্য প্রস্তর যুগের বাড়িঘর আপনি দেখতে পাবেন। দেখতে পাবেন প্রাচীন গ্রিসের আভিজাত্য। তবে, প্রাচীন শহর হলেও ইউনেস্কোর কাছে এই শহরের স্বীকৃতির বয়স ১ যুগের কিছু বেশি।
মধ্য গ্রিসের ডেল্ফি। ছবি : পিন্টারেস্ট
মধ্য গ্রিসের ডেল্ফি (Delphi of Central Greece)
পারনাসাস পাহাড়ের চূড়ায় দেবতা অ্যাপোলোর জন্য গড়া এই মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ গ্রিক মিথোলজির বাস্তবিক প্রভাবের আরেক অসাধারণ নিদর্শন। বলা হয়, দৈববাণী পাওয়া এবং তা মেনে চলার ব্যাপারে গ্রিকরা ছিল অতুলনীয়। আর অ্যাপোলোর সম্মানে করা এই ডেল্ফি তার উজ্জ্বল প্রমাণ।
প্রাচীন গ্রিসের ধারণা অনুযায়ী এটি ছিল নাভেল বা পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৮৭ সালে এথেনা এবং অ্যাক্রোপলিসের আর সব মন্দিরের সাথে এটিও যুক্ত হয় ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের তালিকায়।
প্যাটমোস অঞ্চলের এই জায়গাটি এখন একইসাথে একটি উপাসনালয় এবং গ্রিসের সনাতনী ধ্যান-ধারণা শিক্ষার একটি জায়গা হিসেবে বিবেচিত।
এটি মূলত ছিল সেন্ট জনের আশ্রম। বলা হয়ে থাকে, এখানেই সেন্ট জন বাইবেলের গসপেল এবং অ্যাপোক্যালিপ্স লিখেছিলেন। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো এই জায়গাটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঘোষণা দেয়।