কোভিড-১৯ : যান্ত্রিকতামুক্ত প্রকৃতি দম নিচ্ছে, উন্নত হচ্ছে বৈশ্বিক জলবায়ু

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : চীনের উহানে প্রথম আঘাত হানে নভেল করোনা ভাইরাস, যা আজ কোভিড-১৯ নামে পরিচিত





ছবি : সংগৃহীত


 মুক্ত আকাশ, শূন্য রাস্তাঘাট, জলের ওপর ভাসমান যানগুলোও আচমকা গায়েব হয়ে গেলো, আর এই সুযোগে প্রকৃতি নিজেকে শুদ্ধ করে নিচ্ছে। বর্তমান বিশ্ব নভেল করোনা ভাইরাস তাণ্ডবে এলোমেলো, কয়েক দশকে মানুষ যা কল্পনাও করতে পারেনি চোখে দেখতে না পাওয়া ক্ষুদ্র ভাইরাসের কারনে তা আজ বাস্তব। সমস্ত মানব সভ্যতা এক গভীর সংকটে, সামাজিকতার রীতিগুলোই যেন এখন এক ভয়াবহ অপরাধ। গত বছরের শেষ দিকে চীনের উহানে প্রথম আঘাত হানে নভেল করোনা ভাইরাস, যা আজ কোভিড-১৯ নামে পরিচিত। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে এই ভাইরাসের তাণ্ডবে থমকে গেছে পুরো বিশ্ব। প্রায় দুইশত দেশে আক্রান্তের সংবাদ মিলেছে, সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় আছে ইউরোপ। শুধু ইউরোপ না, বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশগুলো করোনার থাবায় বিপর্যস্ত। থেমে গেছে বিশ্বের অর্থনীতির চাকা, বন্ধ হয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা, ব্যাহত আছে উৎপাদন শিল্প। আর এই সুযোগে যান্ত্রিক অভিশাপ থেকে মুক্তি মিলেছে প্রকৃতির। সমগ্র বিশ্ব যখন ঘরবন্দি, সব কারখানা যখন অচল, পরিবহণ ব্যবস্থা বন্ধ ঠিক তখন হাফ ছেড়ে নিঃশ্বাস নিচ্ছে কার্বন ডাই অক্সাইডের আঘাতে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হওয়া জলবায়ু। এমনকি আমাদের দেশেও এর প্রভাব দেখা গেছে। দেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র কক্সবাজারের সমুদ্রের জলে ৩ দশক পর দেখা মিলেছে ডলফিনের। দূষণহীন বঙ্গোপসাগরের ঘোলাটে পানি এখন নীলচে রঙ ধারণ করতে শুরু করেছে।  




ছবি : সংগৃহীত


কোভিড-১৯- সুসংবাদ প্রকৃতির ইতিবাচক পরিবর্তন

যে বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়ে মানুষ যাচ্ছে, তার থেকে একটি সুসংবাদ ই বিজ্ঞানীরা দিতে সমর্থ হয়েছে। তা হচ্ছে, প্রকৃতির ইতিবাচক পরিবর্তন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে হারে জলবায়ু পরিবর্তন শুরু হয়েছিল তার থেকে বাঁচতে যেন এই মহামারী প্রকৃতির আশীর্বাদ হয়ে আসছে। মানুষ প্রকৃতির এক অংশ, এই মহামারি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে কল্পনাতীতভাবে। এ যেন্ এক দুঃস্বপ্ন। এই দুঃস্বপ্ন দ্রুত কেটে যাক, সাথে বিশ্ব শিখুক প্রকৃতিকে ধ্বংস করে কোনো উন্নতিই কার্যকর নয়। কোভিড-১৯ আঘাতে বৈশ্বিক পর্যটন শিল্প ব্যাপক ক্ষতির সম্মুক্ষীন হয়েছে। মানুষের মধ্যে যে আতঙ্ক, উৎকণ্ঠা কাজ করছে সেটা দ্রুত কেটে যাক। ভাইরাস থেকে মুক্তি মিলুক মানব সভ্যতার। এবং অতিদ্রুত প্রকৃতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে দূষণের বিকল্প খুঁজে নিক। ট্রাভেল বাংলাদেশের পাঠকদের আজ জানানো হবে, এই মহামারীর সময়ে প্রকৃতির ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা। শুক্রবার (২০ মার্চ) বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লুএমও) জানিয়েছে, কোভিড-১৯ এর দ্রুত বিস্তার হ্রাস করার প্রয়াসে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে সীমাবদ্ধ হয়েছে, ফলে কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন হ্রাস পেয়েছে।


কোভিড ১৯ - প্রভাবে বৈশ্বিক জলবায়ুর ইতিবাচক পরিবর্তন

করোনার প্রভাবে বৈশ্বিক জলবায়ুর ইতিবাচক পরিবর্তন। ছবি : নিউ ইয়র্ক টাইমস


এক বিবৃতিতে ডব্লিউএমও বলেছে যে, নিঃসরণ কমানোর অর্থ এই নয় যে বিশ্বকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই বন্ধ করতে হবে। ডব্লিউএমও-এর সেক্রেটারি-জেনারেল পেত্তেরি তালাস বলেন, ‘দূষণ স্থানীয়ভাবে হ্রাস এবং বায়ু মানের উন্নতি সত্ত্বেও, কোভিড-১৯ মহামারীর ফলে বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জ এবং প্রাণহানির বিষয়টি উপেক্ষা করা দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ হবে।’

কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ কম বেড়েছে

কলোরাডো বোল্ডার বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিজ্ঞানী ক্রিস কর্ণউস্কাস টুইটারে লিখেছেন, ‘আমি নিশ্চিত নই যে এটি #কোভিড-১৯ এর কারণে হয়েছিল, তবে ১৯৭৫  সাল থেকে মাত্র দু'বছর হয়েছে এমন, যখন কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ কম বেড়েছে।’ ইউরো সাপ্তাহিক নিউজের খবরে বলা হয়, ক্রুজ জাহাজগুলোকে সাধারণত ভেনিস উপহ্রদে চলাচল করতে দেখা যায় এবং ক্ষতিকারক স্তরে দূষণের কারণ ঘটায়। বর্তমানে এসব বন্ধ থাকায় সেখানকার জল পরিষ্কার হবার একটি সুযোগ পেয়েছে। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের খবরে বলা হয়েছে, সাধারণত মার্চে প্রায় ৭ লাখ মানুষ ক্রুজ জাহাজে বা অন্যথায় ভেনিসে পৌঁছয়। ইতালির স্থানীয় পত্রিকা লা নুভা দি ভেনিজিয়া ই মাস্ত্রে জানিয়েছে, পর্যটন হ্রাসে যুদ্ধোত্তর যুগের প্রাচীন জলাশয়গুলোর ধারা ফিরিয়ে এনেছে। এমনকি খালগুলোর জলে এখন স্নান করাও সম্ভব ছিল। ইতালিতে বায়ু মানেরও উন্নতি হয়েছে।




কক্সবাজার। ছবি : সংগৃহীত




যদিও ওয়াশিংটন পোস্ট-এর বিশ্লেষণ করা ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কঠিন ছিল, তবে এটি কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমনের ওপর ব্যাপকভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইডের ঘনত্ব অনেক কমেছে

ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি (ESA) এর সেন্টিনেল -৫পি উপগ্রহ অনুসারে, পহেলা জানুয়ারি থেকে ১২ই মার্চের মধ্যে ইতালিজুড়ে গাড়ি এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্বারা উত্পাদিত নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইডের ঘনত্ব অনেক কমেছে। জর্জিয়ার টেকের জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ ইমানুয়েল মাসেটে ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, ‘আমার ধারণা, এটি সম্ভব হয়েছে রাস্তা থেকে ডিজেল গাড়িগুলো না থাকায়’। দ্যা গার্ডিয়ান জানিয়েছে, দূষণের অন্যতম বৃহত্তম পতন চীনের উহানে লক্ষ্য করা গেছে যে স্থানটি করোনা ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল হিসেবে পরিচিতি লাভ করে’। জানুয়ারিতে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ লোকের শহর উহানে কঠোরভাবে লকডাউন করা হয়েছিল। নাসার মতে, পূর্ব ও মধ্য চীনজুড়ে নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইডের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ কম রয়েছে।


কোভিড ১৯

ছবি : সংগৃহীত


ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার হাত থেকে রক্ষা পেতে বিশেষজ্ঞরা ঘন ঘন হাত ধোয়ার এবং কনুই দিয়ে ঢেকে কাশির পরামর্শ দেন। একই সাথে তারা অন্যের সাথে যোগাযোগ হ্রাস করতে, যথাসম্ভব বাড়িতে থাকার এবং ঘরের বাইরে বেরোনোর ​​ক্ষেত্রে অন্য ব্যক্তির থেকে দুই মিটার দূরত্ব বজায় রাখার পরামর্শ দেয়। মানব সভ্যতার ওপর থেকে এমন বিপর্যয় দ্রুত কেটে যাক। একই সাথে মানুষকে যান্ত্রিক জীবনের চাঁদর থেকে বের হয়ে পরিবেশবান্ধব জীবনকাঠামো বাছাই করতে হবে। প্রকৃতি ধ্বংস করে প্রাণীকুলের বেঁচে থাকা সম্ভব না। যতোটা সম্ভব পরিবেশ বান্ধব উন্নতির দিকে ছুটতে হবে। যেন আমরা সবাই সুন্দর এই প্রকৃতির মাঝে মন খুলে নিঃশ্বাস নিতে পারি, ঘুরে দেখতে পারি পৃথিবীর অপার সৌন্দর্যকে।  

নাবিলা বুশরা   এস এম