যেভাবে হলো কোলকাতার বিভিন্ন সড়কের নামকরণ

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : কোলকাতার সড়কের নামকরণ




কোলকাতার সড়কের নামকরণ

ছবি : সংগৃহীত


কোলকাতা, নামটি শুনলেই কেমন আপন মনে হয়। ভূ-রাজনৈতিক কারনে শহরটি অন্যদেশের হলেও বাঙ্গালির সাথে এই শহরটির বন্ধন অত্যন্ত গভীর। শত শত বছরের সমধর্মী সংস্কৃতি লালন করে আছে দুই বাংলার মানুষ। বাংলাদেশের মানুষের কাছে দেশের পরেই যে এলাকাটি সবচেয়ে নিজস্ব মনে হবার কথা, সেই এলাকাটির নাম কোলকাতা। আমাদের পূর্বপুরুষরা আলাদা ছিলেন না, তাদের সেই বন্ধন যেন আজও আমাদের মধ্যে রয়ে গিয়েছে। তাইতো ভ্রমণপ্রিয় বাঙ্গালির কাছে শহর কোলকাতার আবেদন অনেক বেশি। ‘সিটি অফ জয়’ হিসেবে পরিচিত এই শহরটির সম্পর্কে আমাদের কৌতূহলের ও তাই সীমা নেই। আজ তাই ট্রাভেল বাংলাদেশের পাঠকদের জানানো হবে কোলকাতার বিখ্যাত সব এলাকা ও কোলকাতার সড়কের নামকরণ এবং এর ইতিহাস।

কোলকাতার সড়কের নামকরণ: বউবাজার

আমাদের দেশের বহু এলাকাতেও এই নামের অনেক বাজার আছে। বলতে গেলে ঢাকা শহরের প্রায় এলাকাতেই এই নামের বাজারের সন্ধান মেলে। তবে জেনে নিই কোলকাতার বউবাজার নামের ইতিহাস। পূর্বতন ডালহৌসী স্কোয়ার (অধুনা বিনয়-বাদল-দীনেশ বাগ) থেকে শিয়ালদহ পর্যন্ত এই রাস্তাটি প্রসারিত ছিল। পরে এই রাস্তার নাম হয় বউবাজার স্ট্রিট। 'বউবাজার' শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে দুটি মত রয়েছে। একটি মত অনুসারে, মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী বিশ্বনাথ মতিলাল তাঁর বাঙালি পুত্রবধূকে একটি বাজার লিখে দেন, সেই বাজারটিই 'বহুবাজার' (হিন্দিতে 'বহু' শব্দের অর্থ 'পুত্রবধূ') এবং পরে তা বিকৃত হয়ে 'বউবাজার' নাম নেয়। তবে, ঐতিহাসিকেরা এই ব্যবসায়ীর পরিচয় নির্ধারণে অসমর্থ হয়েছেন। তাই দ্বিতীয় মতে, এই অঞ্চলে বহু বাজার ছিল এবং সেই সব বাজারে বহু জিনিসপত্র বিক্রি হত। সেই থেকেই এই বাজারটি প্রথমে 'বহুবাজার' ও পরে তা বিকৃত হয়ে 'বউবাজার' নাম নেয়। প্রথম মত অনুসারে, উক্ত বাজারটি ছিল ৮৪ এ এলাকায় অধুনা নির্মলচন্দ্র স্ট্রিটের মোড়ে। দ্বিতীয় মতে যে বাজারগুলির কথা বলা হয়েছে সেগুলির অবস্থান ছিল ১৫৫-৫৮ এলাকায়।


কোলকাতার সড়কের নামকরণ - বউবাজার

ছবি : সংগৃহীত



পরে বউবাজার স্ট্রিটের নামকরণ করা হয় বিপিনবিহারী গাঙ্গুলি স্ট্রিট (স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপিনবিহারী গাঙ্গুলির (১৮৮৭-১৯৫৪) নামানুসারে। ইনি ২৪ বছর ব্রিটিশ জেলে অতিবাহিত করেন। পরে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন)। যদিও এলাকার নামটি বউবাজারই থেকে যায়। বিপিনবিহারী গাঙ্গুলি স্ট্রিট থেকে মহাত্মা গান্ধী রোড পর্যন্ত এলাকার নাম এখনও বৈঠকখানা রোড।

কোলকাতার সড়কের নামকরণ: শ্যামবাজার

বর্তমান শ্যামবাজার অঞ্চলে অতীতে একটি বিখ্যাত বাজার ছিল। জন জেফানিয়া হলওয়েল এই বাজারটিকে চার্লস বাজার নামে অভিহিত করেন। শেঠ ও বসাক পরিবারগুলি ছিল সুতানুটির আদি বাসিন্দা এবং শোভারাম বসাক ছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দীর কোলকাতার এক বিশিষ্ট বাঙালী ধনী ব্যবসায়ী শোভারাম বসাক তাঁর গৃহদেবতা শ্যামরায়ের (কৃষ্ণ) নামানুসারে এই অঞ্চলের বর্তমান নামকরণটি করেন।

কোলকাতার সড়কের নামকরণ: বাগবাজার

বাগবাজার নামটা সম্ভবত 'বাঁকবাজার' থেকে এসেছে। গঙ্গার ওই বাঁকের মুখে বহুদিন বাজার বসত।

হাতিবাগান এর নামকরন :

হাতিবাগান নাম হয় সিরাজের আক্রমণের সময় হাতির ছাউনি এখানে পড়েছিল বলে। তবে, অন্য একটি মত ও প্রচলিত আছে। রাজা নবকৃষ্ণ দেবের স্থাবর সম্পত্তি শুধুমাত্র শোভাবাজার অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিলোনা। শোভাবাজারের রাজসীমানার যেই দিকে হাতিশালা ছিল বর্তমানে তা হাতিবাগান অঞ্চল, এমন একটি জনশ্রুতিও প্রচলিত।


কোলকাতার সড়কের নামকরণ - হাতিবাগান

ছবি : সংগৃহীত


চিৎপুর এর নামকরন :

এখনকার কাশীপুর এলাকার গঙ্গার তীরের চিৎপুর অঞ্চলে অবস্থিত ‘আদি চিত্তেশ্বরী’ দুর্গামন্দির। কোলকাতার বহু প্রাচীন রাস্তা গুলির মধ্যে চিৎপুর রোড উল্লেখযোগ্য। তখনও শহর ঠিক মতো গড়ে ওঠেনি, এখন যেখানে স্ট্যান্ড রোড, সেখান দিয়েই বইত হুগলি নদী। জঙ্গলাকীর্ণ ওই অঞ্চলে ছিল চিতু ডাকাতের আধিপত্য। কথিত আছে, ভাগীরথী-হুগলী নদীতে ভেসে আসা এক প্রকান্ড নিম গাছের গুঁড়ি দিয়ে চিতে ডাকাত এই জয়চন্ডী চিত্তেশ্বরী দুর্গা মুর্তি তৈরী করেন। পরবর্তীতে মনোহর ঘোষ নামে এক ব্যক্তি চিত্তেশ্বরী দুর্গার মন্দির তৈরি করে দেন। এই চিত্তেশ্বরী দুর্গার নামানুসারেই এঅঞ্চলের নাম চিৎপুর।

সোনাগাছি এর নামকরন :

রাতের রজনীগন্ধা আর সদ্যভাজা চপ-কাটলেটের সুবাসে ভরা রাতপরীদের এলাকা অর্থাৎ কোলকাতার কুখ্যাত নিষিদ্ধপল্লী সোনাগাছির নাম হয় সোনাউল্লাহ গাজী নামক এক পীরবাবার নামানুসারে। ওই অঞ্চলে তার মাজার ছিল বলে শোনা যায়। এই সোনা গাজীর মাজার নামের ব্যাপারেও মতভেদ আছে। ঐ জায়গা মূলত রাত্রিগমনের জন‍্য বেশী প্রসিদ্ধ, এর কাছাকাছি সমব‍্যবসায়ী স্ত্রীলোকদের অপর একটি পাড়া ছিলো বিডন স্ট্রীটের কাছে, যেখানে তুলনায় কম আয়ের মানুষ ও নিম্নবর্গীয়রা গমণ করতেন। দুই জায়গার নাম ছিলো যথাক্রমে সোনাগাছি আর রূপোগাছি-গমনকারী খদ্দেরদের আর্থিক বৈষম‍্যের প্রতি নির্দেশ করে।

কুমোরটুলি এর নামকরণ :

শোভাবাজার রাজবাড়িতে দূর্গাপূজার প্রচলন হলে একেবারে প্রথমদিকে একদল কুমোর কে কৃষ্ণনগর থেকে আনা হত মূর্তি গড়ার জন্য। তাদের রাজবাড়ির সন্নিকটে যে জায়গায় থাকার বন্দোবস্ত করা হয় সেই জায়গা বর্তমানে কুমোরটুলি নামে পরিচিত।

গরানহাটা এর নামকরণ:

গরান কাঠ নৌকা বোঝাই হয়ে এসে যেখানে বিক্রী ও গুদামজাত করা হত ওই জায়গা বর্তমানে গরানহাটা।


গরানহাটা

ছবি : সংগৃহীত


বৈঠকখানা এর নামকরণ :

১৭৮৪ সালের লেফট্যানেন্ট কর্নেল মার্ক উডের মানচিত্রে লালবাজার থেকে পূর্বদিকে তৎকালীন মারাঠা খাত (পরে সার্কুলার রোড এবং বর্তমানে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রোড) পর্যন্ত এলাকার নাম ছিল ‘বয়টাকোন্না স্ট্রিট’ (Boytaconnah Street)। নামটির উৎপত্তি 'বৈঠকখানা' নামটি থেকে। সেকালে এই অঞ্চলের একটি প্রাচীন বটগাছের নিচে ব্যবসায়ীরা তাদের মালপত্র নিয়ে বিশ্রাম করতে বসতেন। শোনা যায়, জব চার্নক যখন কোলকাতাকে বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে নির্বাচিত করেন, তখন তিনিও এখানে আসতেন। সেই থেকেই জায়গাটির নাম হয় বৈঠকখানা। উডের মানচিত্রে বৈঠকখানা বটগাছটির উল্লেখও আছে। এর পূর্বদিকের এলাকাটি ছিল জলাভূমি। ১৭৯৪ সালে অ্যারোন আপজনের মানচিত্রেও বৈঠকখানার উল্লেখ আছে। তবে উক্ত মানচিত্রে যে স্থানটি দেখানো হয়েছে সেটি বর্তমান শিয়ালদহ স্টেশনের জায়গাটি। উডের মানচিত্রে কোনো বৈঠকখানা গাছের উল্লেখ না থেকলেও আপজনের মানচিত্রে আছে। বউবাজার বা অধুনা বিপিনবিহারী গাঙ্গুলি স্ট্রিট থেকে মহাত্মা গান্ধী রোড পর্যন্ত এলাকার নাম এখনও বৈঠকখানা রোড। এই রাস্তার দক্ষিণ প্রান্তের বাজারটির নামও বৈঠকখানা বাজার।

উল্টোডাঙ্গা এর নামকরণ:

এখানে খালের পাশে নৌকা বা ডিঙি উল্টো করে আলকাতরা লাগানো হত। তার থেকে উল্টোডিঙি অপভ্রংশ উল্টোডাঙ্গা। ওই দিকটা কোলকাতার পূর্ব দিক। খাল দিয়ে ভাগ হয়েছে। এই খাল খুব সম্ভব বিদ্যাধরী। এখন খাল মজে হেজে গেছে। ডিঙি উল্টে রাখা একটা রেওয়াজ ছিল যাতে এপার ওপার করতে পারে লোকজন। এখানে অনেকদিন পর্যন্ত বড়ো নৌকা চলাচল করতে দেখা যেত। তখন ওটা বালুমাঠ। তবে, বাঁশ বা কাঠের ব্যবসার অন্য এক ইতিহাস এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কিন্তু তা ধরে নামের ইতিহাস জানা যায় না।