প্রস্তাবিত পৃথিবীর ৮ম মহাদেশ জিল্যান্ডিয়া। ছবি : ন্যাশনাল জিওগ্রাফি
পৃথিবীতে কতটি মহাদেশ আছে? এমন সহজ প্রশ্নের উত্তর যে কেউ দিতে পারবে। আপনার জানার ভেতর ভুল নেই, তবে আবার একটু ভাবুন।
জিল্যান্ডিয়ার নাম শুনেছেন, পৃথিবীর হারিয়ে যাওয়া, জলের নিচে তলিয়ে যাওয়া এক মহাদেশে। ৭ মহাদেশের ক্লাবে যোগ দিতে ইতোমধ্যেই নিজের সম্পর্কে জানান দিয়েছে পৃথিবীর ৮ম মহাদেশ হতে যাওয়া জিল্যান্ডিয়া।
ট্রাভেল বাংলাদেশের পাঠক, যারা আগে জানতেন না কিংবা শুনেছেন উভয়েই হ্যালো বলতে পারেন দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে প্রায় পুরোপুরি নিমজ্জিত এই বিশাল ভূখণ্ড জিল্যান্ডিয়াকে। এটি কিন্তু একেবারেই অপরিচিত নয়, আপনি এর সর্বোচ্চ পর্বতের কথা শুনে থাকতে পারেন, একমাত্র বিট জলের ওপরে প্রদর্শিত : নিউজিল্যান্ড।
পৃথিবির মানচিত্রে জিল্যান্ডিয়া। ছবি : জিএনএস সাইন্স
জিল্যান্ডিয়া একটি মহাদেশ হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করেছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। জিওলজিকাল সোসাইটি অফ আমেরিকান জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে গবেষকরা ব্যাখ্যা করেছেন যে, জিল্যান্ডিয়ার আয়তন প্রতিবেশী অস্ট্রেলিয়ার প্রায় দুই তৃতীয়াংশ যা প্রায় ৫০ লাখ বর্গ কিলোমিটার বা ১৯ লাখ বর্গ মাইল। তবে এর অধিকাংশই পানির নিচে নিমজ্জিত।
পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়া মহাদেশটি অধ্যয়নের জন্য ২০১৭ সালে ১২টি দেশের ৩২ বিজ্ঞানীর একটি দল প্রশান্ত মহাসাগরের অঞ্চলটিতে নয় সপ্তাহ ভ্রমণ করেছিলেন। এই অঞ্চলটির বেশিরভাগ নিমজ্জিত, লুকানো মহাদেশটির সমুদ্রের তলের একটি উন্নত অংশ, অস্ট্রেলিয়ার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ, নিউজিল্যান্ড এবং নিউ ক্যালেডোনিয়ার মধ্যে অবস্থিত।
জিল্যান্ডিয়া অভিযানে মার্কিন গবেষণা জাহাজ জয়েডস রেজ্যুলেশন (JOIDES Resolution)। ছবি : এনএসএফ
২০১৭ সালের গোঁড়ার দিকে বিজ্ঞানীরা জিল্যান্ডিয়াকে পৃথিবীর একটি পূর্ণাঙ্গ মহাদেশ হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া উচিত বলে ভেবেছিলেন। এটি এই অঞ্চলের প্রথম বিস্তৃত জরিপগুলোর মধ্যে একটি। তখন টেক্সাস এএন্ডএম (এগ্রিকালচার এন্ড মেকানিক্যাল) বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক মহাসাগর আবিষ্কার কার্যক্রমের (আইওডিপি) সাথে যুক্ত বিজ্ঞানীরা গবেষণা জাহাজ জয়েডস রেজ্যুলেশন (JOIDES Resolution) করে সবেমাত্র তাসমানিয়ার হোবার্টে ফিরেছেন।
তারা জানায়, অতীতে একসময় জিল্যান্ডিয়া সম্ভবত ভূখণ্ডের মধ্যবর্তী অঞ্চলে কাছাকাছি থাকতে পারে, যা প্রাণী এবং গাছপালাগুলোর জন্য মহাদেশগুলোর মধ্য দিয়ে যাওয়ার জন্য পথ তৈরি করে দিয়েছিল। এমনটাই বিজ্ঞানীদের কাজে ইতোমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে।
গবেষণা জাহাজ থেকে জিল্যান্ডিয়ায় রংধনুর দৃশ্য। ছবি : এনএসএফ
সমুদ্রের তলদেশের প্রায় এক কিলোমিটারেরও বেশি গভীরে ডুবে যাওয়ার কারণে জিল্যান্ডিয়া সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। এখন অবধি এই অঞ্চলটি নিয়ে খুব কম জরিপ করা হয়েছে এবং নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
২০১৭ সালে বিজ্ঞানীরা অভিযানে অংশ নিয়ে জিল্যান্ডিয়ায় ৪ হাজার ফুট জলের গভীরতায় ছয়টি জায়গায় সমুদ্রের তলদেশে খনন করেন। তারা স্তরগুলো থেকে ৮ হাজার ফুট (২ হাজার ৫০০ মিটার) গভীর থেকে অনেক পলল সংগ্রহ করেছে, যেখান থেকে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে এই অঞ্চলের ভূগোল, আগ্নেয়গিরি ও জলবায়ু পরিবর্তনের তথ্যের রেকর্ড রয়েছে।
জিল্যান্ডিয়ার সি ফ্লোর স্যাম্পল। ছবি : এনএসএফ
অভিযানের সহ-প্রধান বিজ্ঞানী টেক্সাসের হিউস্টনের রাইস ইউনিভার্সিটির জেরাল্ড ডিকেন্সের মতে, অভিযাত্রী বিজ্ঞানীরা উল্লেখযোগ্য ধরণের নতুন জীবাশ্ম আবিষ্কার করেছেন, যা প্রমাণ করে যে, জিল্যান্ডিয়া আজকের মতো সবসময় সাগরের ঢেউ-এর নিচে নিমজ্জিত ছিল না।
ডিকেন্স বলেন, ৮ সহস্রাধিক নমুনা অধ্যয়ন করা হয়েছে এবং বেশ কয়েক শতাধিক জীবাশ্ম প্রজাতি চিহ্নিত করা হয়েছিল। উষ্ণ অগভীর সমুদ্রের মধ্যে বসবাসকারী জীবের মাইক্রোস্কোপিক শাঁস এবং জমি ও গাছপালা থেকে বীজ এবং পরাগের আবিষ্কার অতীত জিল্যান্ডিয়ার ভূগোল এবং জলবায়ুর নাটকীয় পার্থক্য দেখাচ্ছিল।
জিল্যান্ডিয়া অভিযানের মানচিত্র। ছবি : এনএসএফ
নতুন এই আবিস্কার থেকে আরও জানা যায়, সমুদ্রের তরঙ্গের নীচে জিল্যান্ডিয়ার নিমজ্জন ঘটায় প্রশান্ত মহাসাগরের রিং অফ ফায়ার (যেখানে প্রায়শই ভূমিকম্প এবং শক্তিশালী আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটে)-এর ভূমিকা আছে। অর্থাৎ, তিনি বলেছিলেন, রিং অফ ফায়ার গঠনের ফলে সমুদ্রের গভীরতা এবং আগ্নেয়গিরির ক্রিয়াকলাপে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে, যা জিল্যান্ডিয়ার সমুদ্র উপকূলকে সজ্জিত করেছিল।
জিল্যান্ডিয়া ও অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ ৮ থেকে ১৩ কোটি বছর আগে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল অ্যান্টার্কটিকা থেকে। আর ৬ থেকে ৮ কোটি বছর আগে জিল্যান্ডিয়া বিচ্ছিন্ন হয় অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ থেকেও- এমনটাই জানান অভিযানের আরেক সহযোগী বিজ্ঞানী, নিউজিল্যান্ডের ওয়েলিংটনের ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী রুপার্ট সুদারল্যান্ড। এরপর ক্রমশ এটি পানিতে নিমজ্জিত হতে থাকে। ধারণা করা হয়, ২ দশমিক ৩ কোটি বছর আগে সম্পূর্ণ মহাদেশটিই নিমজ্জিত ছিল।
অভিযানকালীণ গবেষণা কার্যক্রম। ছবি : এনএসএফ
এটি এখনও সম্ভবত সঠিক, তবে এটি এখন স্পষ্ট হয়ে গেছে যে এই ৮ কোটি বছরের নাটকীয় ঘটনাগুলো জলযাত্রায় এই মহাদেশটির আকার তৈরি করে দিয়েছে।
উত্তর জিল্যান্ডিয়াজুড়ে (যার আয়তন ভারতের মতো) বড় ভৌগলিক পরিবর্তনগুলি : কীভাবে উদ্ভিদ এবং প্রাণী দক্ষিণে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিবর্তিত হয়েছিল এমন প্রশ্নগুলি বোঝার জন্য জড়িত। অতীত জমি এবং অগভীর সমুদ্র আবিষ্কার এখন একটি ব্যাখ্যা প্রদান করে। পশুপাখি এবং গাছপালা পাশাপাশি চলার পথ ছিল।
অভিযানের সময় প্রাপ্ত পলির করগুলি অভিযানের সমাপ্তির পরেও অনেক সময় ধরে বিজ্ঞানীরা গবেষণা করবেন। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেটগুলি কীভাবে চলাচল করে এবং বিশ্ব জলবায়ু ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে তা এই কোরগুলি তাদের বুঝতে সাহায্য করবে।
এই বিজ্ঞানীরা আরও বলেছিলেন যে জিল্যান্ডের ইতিহাসের রেকর্ডগুলি জলবায়ুতে ভবিষ্যতের পরিবর্তনের পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত কম্পিউটার মডেলের সংবেদনশীল পরীক্ষা সরবরাহ করবে।
জিল্যান্ডিয়া। ছবি : দ্য গার্ডিয়ান
এই গবেষণা শেষে হয়তো বিশ্বের মোড়লরা মিলে নতুন এই মহাদেশের স্বীকৃতি দিলেও দিতে পারে। বিশ্ববাসী পাবে নতুন এক মহাদেশ। বলাইবাহুল্য, এই আবিস্কার বিশ্বের পর্যটকদেরকে আকৃষ্ট করবে বেপরোয়াভাবে। নতুন একটি মহাদেশ দেখা যেন অতীতের বিভিন্ন অঞ্চল আবিস্কারের মতোই থ্রিলিং।
যেহেতু জিল্যান্ডিয়া সিংহভাগ অংশ পানির নিচে নিমজ্জিত, তাই এটির মহাদেশ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কোনো যোগ্যতা নেই বলে অনেকে সংশয় প্রকাশ করতে পারে; কেননা পানির উপরে অবস্থিত হওয়া মহাদেশ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেটি আসলে ভুল ধারণা।
বিবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে জানায় ভূবিজ্ঞানীদের মতে, কোনো বিশাল ভূখণ্ডের মহাদেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাবার জন্য মূলত চারটি গুণাবলির অধিকারী হওয়া প্রয়োজন :
আশেপাশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে উঁচু হতে হবে
সুস্পষ্ট কিছু ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে
একটি সুনির্দিষ্ট সীমারেখা থাকতে হবে
সমূদ্র তলদেশের চেয়েও পুরু ভূ-স্তর থাকতে হবে।
নিউজিল্যান্ড এবং জিল্যান্ডের সর্বোচ্চ স্থান মাউন্ট কুক বা কুক পর্বত। ছবি : সংগৃহীত
ভূ-বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন যে, জিল্যান্ডিয়ার মধ্যে এই সকল গুণই বিদ্যমান। তাই পৃথিবী নতুন শিশুর আগমন ঘটতে চলেছে বলে আশা করাটা একদম ভুল হবে না। ভ্রমণপ্রেমীদের জন্যে এমন সংবাদ যেন আকাশের চাঁদ হাতে পাবার মতো। জীবদ্দশায় নতুন মহাদেশ দেখে যেতে পারলে তো মন্দ হবে না নিশ্চই।