ষোড়শ শতাব্দীতে রাজা মান সিংহ নির্মাণ করেন বিখ্যাত এই দুর্গটি, জয়পুর, রাজস্থান। ছবি : উইকিপিডিয়া
ভারত মানেই বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্যের এক দেশ। দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম এই দেশটি দারুণ ভ্রমণ অভিজ্ঞতার জন্য পর্যটকদের কাছে চমকপ্রদ।
তুষারপাত থেকে শুরু করে ধু-ধু মরুভূমি- প্রকৃতির কোন রূপ নেই এখানে! বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি, আবহাওয়া, সংস্কৃতির এই দেশটির বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন রূপ মুগ্ধ করে পর্যটকদের।
প্রকৃতির অপার রূপে ভরপুর ভারতের দর্শনীয় স্থানের সংখ্যা গুনে শেষ করা যাবেনা। ভারতের অপূর্ব সৌন্দর্যের একটি জায়গা হল পিংক সিটি বা গোলাপি শহর হিসেবে খ্যাত জয়পুর (Jaipur)।
গোলাপি সৌন্দর্যের এই শহরটি তার সমৃদ্ধ ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর ঐতিহাসিক স্থাপনার মাধুর্যে বিমুগ্ধ করে ভ্রমণ প্রেমীদের। আকর্ষণীয় অজস্র স্থানে ভরপুর জয়পুরের উল্লেখযোগ্য কিছু স্থাপনার কথা চলুন জেনে আসা যাক।
অবস্থান
পিংক সিটি জয়পুর হল সুপরিচিত রাজস্থানের রাজধানী। দিল্লি থেক এই শহরের দূরত্ব ২৮০ কিলোমিটার। এই শহরের তিনদিকে রয়েছে পাহাড়।
শহরজুড়ে রয়েছে নানা রকম মিনার, দুর্গ আর রাজপ্রাসাদ। সপ্তদশ শতাব্দীতে গড়ে ওঠা এই শহরটি ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ একটি শহর। জয়পুর শহর গড়ে তুলেছিলেন রাজা জয়সিং।
তার নামানুসারেই এই শহরের নাম রাখা হয় জয়পুর। জয়সিংহ বিদ্যাধর ভট্টাচার্য নামক একজন বিখ্যাত বাঙালি স্থপতিকে দায়িত্ব দেন এই নগরের নকশা করার।
তাঁর নিরলস পরিশ্রমে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে চমৎকার এই শহরটি।
জয়পুর শহর যেন গোলাপি রংয়ে একাকার হয়ে থাকে। দোকানপাট, বাড়িঘরে গোলাপি রঙের ছোঁয়া। যা শহরটিকে করে তুলেছে আরও বেশি সৌন্দর্যমন্ডিত। জয়পুর মূলত দুই অংশে বিভক্ত : নতুন ও পুরনো শহর।
জয়পুরের কেন্দ্রস্থলে দেখতে পাবেন সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকের সব স্থাপনা। জয়পুর ঐতিহাসিক সব স্থাপনা দ্বারা পরিপূর্ণ। এখানকার প্রাসাদগুলোতে ইউরোপীয় ছাপ দেখা যায়। একদিনে এখানকার সব স্থাপনা দেখে শেষ করতে পারবেন না। এই জন্য বেশ কিছুদিন থাকতে হবে আপনাকে।
সিটি প্যালেস :
১৯ শতকে রাজা জয় সিংহ নির্মিত সিটি প্যালেস। ছবি : টাইমস অব ইন্ডিয়া
রাজা জয় সিংহ ১৯ শতকে চমৎকার এই প্যালেসটি নির্মাণ করেন। এই প্যালেসটি হল স্থাপত্যের একটি অত্যাশ্চর্য নিদর্শন। এই প্রসাদের নির্মাণ কৌশলে রয়েছে মুঘল, রাজপুত এবং ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীর মিশ্রণ। এই প্রাসাদের অভ্যন্তরে সুন্দর মার্বেলের কারুকার্য, চমৎকার স্তম্ভ, জাফরি কাজ এবং খচিত অলঙ্করণ করা আছে।
এই অলঙ্করণগুলো প্রাসাদটিকে করেছে মোহনীয়। যা আপনাকে মুগ্ধ করবে। জালেব চক এবং ত্রিপোলিয়া গেট নামে এখানে দুটি প্রধান প্রবেশপথ দেখতে পাবেন। এই প্রাসাদটির একটি বিশেষ আকর্ষণ হল রুপার তৈরি বিশাল বিশাল পানি রাখার পাত্র। এই পাত্রগুলোকে বলা হয় গঙ্গাজলী। এই পাত্রের উচ্চতা ১ দশমিক ৬ মিটার। এই পাত্রগুলো মহারাজা দ্বিতীয় মধু সিংহ তৈরি করেছিলেন।
হাওয়া মহল :
রাজস্থান ও মুঘল স্থাপত্যের মিশ্রণে নির্মিত ঐতিহ্যবাহী হাওয়ামহল, জয়পুর, রাজস্থান। ছবি : ভার্টুওসো ডট কম
সিটি প্যালেসের পাশেই দেখতে পাবেন অতীব সৌন্দর্যের হাওয়া মহল। ১৭৯৯ সালে মহারাজা প্রতাপ সিংহ এই মহলটি নির্মাণ করেন। রাজস্থানের অন্যতম ঐতিহ্য এই হাওয়া মহলের নির্মাণশৈলী অত্যন্ত চমকপ্রদ। রাজস্থান ও মুঘল স্থাপত্যের মিশ্রণে তৈরি এই হাওয়া মহলের উচ্চতা প্রায় পাঁচ তলার সমান।
চমৎকার এই স্থাপনাটিতে বিভিন্ন বর্ণের বেলে পাথরের কারুকার্য দেখতে পাবেন। এটি মূলত তৈরি করা হয় রাজপরিবারের মহিলাদের জন্য। যাতে তারা সাধারণ মানুষের নজর এড়িয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারেন। এখানে বসেই রাণীরা উৎসব দেখতো। এই মহলে রয়েছে ৯০০টি জানালা।
জন্তর মন্তর মান মন্দির :
পৃথিবীর বৃহত্তম পাথরের মান মন্দির যেটি ১৭৩৮ সালে মহারাজ জয় সিংহ নির্মাণ করেন, জয়পুর, রাজস্থান। ছবি : এন্ড বিয়ন্ড ডট কম
জন্তর মন্তর হল পৃথিবীর বৃহত্তম পাথরের মান মন্দির। সিটি প্যালেসের পিছনেই এটি অবস্থিত। ১৭৩৮ সালে মহারাজ জয় সিংহ এটি নির্মাণ করেন। তিনি নিজেই ছিলেন একজন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ। এই মন্দির জ্যোতির্বিদ্যায় তার অসাধারণ ক্ষমতাকেই প্রমাণ করে।
এই মন্দিরের উত্তর-পূর্বে চমৎকার সাজানো বাগান আছে। এই বাগানের পাশেই রয়েছে জয়সিংসহ রাজপরিবারে অন্য সদস্যদের সমাধি। প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক এই বিখ্যাত মান মন্দিরটি দেখতে আসেন।
আম্বর দুর্গ :
মাওতা হ্রদে আম্বর দুর্গের প্রতিচ্ছবি দূর্গটিকে আরও দৃষ্টিনন্দন করে তোলে। ছবি : ওইকিপিডিয়া
জয়পুরের দুর্গগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ও বিশাল হল আম্বর দুর্গ। জয়পুর থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার দূরত্বে একটি চূড়ায় এটি অবস্থিত। ষোড়শ শতাব্দীতে রাজা মান সিংহ এই বিখ্যাত দুর্গটি নির্মাণ করেন। মুঘল ও রাজপুত স্থাপত্যের অপরূপ মিশ্রণে তৈরি এই দুর্গটি দেখতে অত্যন্ত নজরকাড়া।
সুন্দর সাদা মার্বেল এবং লালপাথরের মিশ্রণে তৈরি এই দুর্গের পাশেই রয়েছে মাওতা হ্রদ। যা এর সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। এখানে আরও দেখতে পাবেন দেওয়ান-ই-খাস, সুখ নিবাস ও শিষ মহল। আম্বর মহলে আছে হাতীর পিঠে চড়ার সুযোগ। তবে সে জন্যে আপনাকে আসতে হবে ভোরবেলায় ।