টিবিডি ইন্টারভিউ উইকলি : নারীরা আরও বেশি ভ্রমণ করা ও বিশ্বটাকে জানার সুযোগ পাবে এই স্বপ্ন দেখি

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : একধরনের জেদ থেকেই বিশ্বভ্রমণের নেশাটা আসে


কাজী আসমা আজমেরি, বাংলাদেশের অন্যতম একজন আন্তর্জাতিক ট্রাভেলার। দশ বছর ধরে তিনি ভ্রমণের মাধ্যমে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতি, প্রকৃতি ও মানুষ সম্পর্কে বিশদ তথ্য তুলে ধরছেন। ছোটবেলা থেকেই খুব দুরন্ত ছিলেন আজমেরি। সেই থেকে ঘুরে বেড়ানোর স্বপ্ন। তার জন্ম ও স্কুল জীবন কেটেছে খুলনায়। এরপর ঢাকার নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ সম্পন্ন করেছেন।

তখন থেকেই শুরু হয় তার ভ্রমণের গল্প। ২০০৭ সালে প্রথম দেশ হিসেবে থাইল্যান্ড ভ্রমণ করেন আজমেরি। এরপর থেকেই সবুজ পাসপোর্ট হাতে নিয়ে ধারাবাহিক ভ্রমণ করে যান। ২০১৮ সালে তুর্কমেনিস্তানের মাটিতে পা দিয়ে শততম দেশ সফরের রেকর্ড সৃষ্টি করেন।


১১৫টি দেশ ভ্রমণ করা একমাত্র বাংলাদেশি নারী কাজী আসমা আজমেরি

১১৫টি দেশ ভ্রমণ করা বাংলাদেশী পাসপোর্টধারী নারী কাজী আসমা আজমেরি। ছবি : সংগৃহীত


চলতি বছরের শুরুতে ১১৫তম দেশ  হিসেবে ইউরোপের গ্রিসে লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে এখন দেশে অবস্থান করছেন। কোভিড-১৯ মহামারি পরিস্থিতিতে চার মাস ধরে এখন বাড়িতেই অবস্থান করছেন। আজ দেশের এই স্বনামধন্য পর্যটকের মুখোমুখি হয়েছে ট্রাভেল বাংলাদেশ। ব্যক্তিগত ভ্রমণের অভিজ্ঞতার সঙ্গে বিশ্ব পরিস্থিতি ও দেশের পর্যটনশিল্পের ভবিষ্যত নিয়ে কথা হচ্ছে।

ট্রাভেল বাংলাদেশ : আপনি একজন আন্তর্জাতিক পর্যটক। কোভিড-১৯-এর সময় স্বাভাবিকভাবেই ঘরবন্দি জীবন কাটছে। কীভাবে সময় পার করছেন?

কাজী আসমা আজমেরি : গত ২ মাস কেটেছে মানুষকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করার মধ্য দিয়ে। দুস্থ মানুষদের কিছু সাহায্য দেয়ার চেষ্টা করেছি। পাশাপাশি পরিবারকে সময় দেয়া, ব্যক্তিগত লেখালেখি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন দিকে যোগাযোগ স্থাপন; এভাবে কাটছে। আর ভ্রমণের ওপর একটা যাদুঘর এবং লাইব্রেরি করার পরিকল্পনা করছি। এগুলো কীভাবে করা যায় তার যাবতীয় চিন্তা-ভাবনা সাজাচ্ছি। ভ্রমণের ওপর একটা 'মিউজিয়াম অব ট্রাভেলার' করার পরিকল্পনা করছি। একেবারে ইউনিক একটা চিন্তা।


কাজী আসমা আজমেরি

কাজী আসমা আজমেরি। ছবি : সংগৃহীত



ট্রাভেল বাংলাদেশ : এটা আসলেই দারুণ একটি ইউনিক আইডিয়া। এই বিষয়ে একটু বলুন?

কাজী আসমা আজমেরি : আমি এখন পর্যন্ত যেসব দেশ ভ্রমণ করছি, সেসব দেশ সম্পর্কে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জিনিস, তথ্যাদি সেখানে ঠাঁই পাবে। তাছাড়া পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের পর্যটনকদের ভ্রমণের  গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, জিনিসপত্র মজুদ রাখা হবে। ধরুন, জর্জিয়ার পাসপোর্টটা কেমন, আর্মেনিয়ার বাংলাদেশ কী রকম, পাকিস্তানের সময় পাসপোর্ট কেমন ছিল, প্রথম হাতে লেখা পাসপোর্ট কেমন ছিল, পূর্বের পর্যটন-ভ্রমণ প্রক্রিয়া কী রকম ছিল ইত্যাদি কিছু এই যাদুঘরে স্থান পাবে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কিছু জিনিস, যাতে দেশের মানুষ আকৃষ্ট হবে এবং ভ্রমণে উদ্বুদ্ধ হবে। মূলত এটি ট্রাভেল সম্পর্কিত মিউজিয়াম। এটি মূলত পরিকল্পনায় আছে।


কাজী আসমা আজমেরি।

কাজী আসমা আজমেরি। ছবি : সংগৃহীত



ট্রাভেল বাংলাদেশ : আপনার চিন্তায় এমন একটি ইউনিক আইডিয়া কীভাবে আসলো?

কাজী আসমা আজমেরি : ২০১১ সালে সাউথ কোরিয়া ভ্রমণের মাধ্যমে আমার চিন্তায় এটা প্রথম আসে। সেখানকার একজন টমাস আলভা এডিসনের জীবনের বিভিন্ন কিছু সংগ্রহের মাধ্যমে মিউজিয়াম তৈরী করেন। আমি সেখানে যাই, দেখি। খুব আকৃষ্ট হই। আর আমি নিজেও মিউজিয়াম পছন্দ করি। আমি কোনো দেশ ভ্রমণ করলে সেখানকার মিউজিয়ামে ঘুরতে যাই। দেখি তাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতি। যেমন বিলবাও-এর মিউজিয়াম, ব্রাজিলের রিওডি জেনোরিও-এর মিউজিয়াম কিংবা আজারবাইজানের সেই বিখ্যাত হায়দার আলি মিউজিয়াম। এসব অনেক আকর্ষণ করে। এসব দেখতে দেখতে আমার মাথায় আসে মিউজিয়াম অব ট্রাভেলার করার আইডিয়া। এটা এখনও আইডিয়া পর্যায়েই আছে। আমার নিজ বাড়ি খুলনায় এটা করতে চাই।

ট্রাভেল বাংলাদেশ : আপনি ভ্রমণ পছন্দ করেন। কিন্তু এখন লকডাউনের ফলে তা হচ্ছে না। এই বিষয়ে অনুভূতি কী?

কাজী আসমা আজমেরি : এটা অসম্ভব খারাপ অনুভূতি। বুঝাতে পারছি না। তারপরও এভাবে নিজের মনকে প্রবোধ দিচ্ছি যে, নিজের জীবনের থেকে তো ভ্রমণ বেশি মূল্যবান না। ভ্রমণ তো জীবনের একটা অংশ। তাই করোনা ভাইরাসের এই সময় আমি বাসা থেকেই বের হইনা। এই বছর আর ভ্রমণ করতে পারছিও না। এটা সত্যি কষ্টের। তারপরও সময়টাকে কাজে লাগানোর জন্য পুরনো ভ্রমণের ছবিগুলো দেখি, লেখালেখি করি, একেকটি জায়গা সম্পর্কে জানাচ্ছি লোকজনকে, নতুন কিছু চিন্তা করি, পরিবারকে সময় দিই।


পর্যটক কাজী আসমা আজমেরি

পর্যটক কাজী আসমা আজমেরি। ছবি : সংগৃহীত



ট্রাভেল বাংলাদেশ : এই কঠিন সময়ে বিশ্বের অন্যান্য পর্যটকদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন নিশ্চয়?

কাজী আসমা আজমেরি : যোগাযোগ হচ্ছে কম-বেশি সবার সঙ্গে। কারও কারও সাথে ই-মেইলের মাধ্যমে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে, হোয়াটসঅ্যাপে, ইনস্টাগ্রামে ইত্যাদির মাধ্যমে যোগাযোগ হয়। যেমন আমার এক বান্ধবী হংকংয়ে আছে। তার হাজব্যান্ড জার্মান। দুজনই হংকংয়ে চাকরি করতো। নভেম্বরে চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। বিয়েও করেছে নভেম্বরে। ওরা প্রস্তুতি নিচ্ছিলো যে হানিমুনে ইউরোপে যাবে। কিন্তু এখন যেতে পারছে না। আরেক বন্ধু শ্রীলংকায় আছে। তার চিন্তা ছিলো ৯ মাসের জন্য এশিয়া ট্যুর দেবে। কিন্তু এখন শ্রীলংকায় আটকা পড়ে আছে। যেমন আমি বাংলাদেশে আটকে আছি। এভাবে যে যেখানে গেছে সে সেখানে আটকে আছে।

কিছু করার নেই। যে জায়গায় আছে সেখানে থেকে আশপাশের জায়গা উপভোগ করার চেষ্টা করছে সবাই। সত্যি বলতে একটা বিষয় মাথায় আসছে যে, আমরা যারা এখন তরুণ প্রজন্ম, আমরা খুব কঠিন জীবনে অভ্যস্থ। যেমন আমরা দৌঁড়ের মধ্যে থাকি। রানিং রানিং রানিং। কিন্তু এখন সবাই নিজেকে জানার সময় পাচ্ছি। বাড়িতে থেকে নিজেকে জানার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময় এটি। তাছাড়া আত্মীয়-স্বজন, পরিবারকে সময় দিতে পারছি; এটা আমি মনে করি অনেক সুন্দর সময়।

পড়াশোনার জন্য যারা বাইরে ছিলো তারা এখন পরিবারকে, বাবা-মাকে সময় দিচ্ছে, এটা একদিক থেকে পজিটিভ। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির কথা যদি চিন্তা করি, খুবই সংকট। অনেক জায়গায় চাকরি চলে যাচ্ছে অনেকের। ছাঁটাই করা হচ্ছে। এটা পুরো বিশ্বে হচ্ছে। যেমন আমি নিউজিল্যান্ডে যে জব পেয়েছিলাম, এপ্রিলে জয়েন করার কথা সেটাও আমি হারিয়েছি। আমার বন্ধুরাও জব হারাচ্ছে। কাজেই এটি আবার কঠিন সময়।


বাংলাদেশের নারী পর্যটকদের অনুপ্রেরণা কাজী আসমা আজমেরি।

বাংলাদেশের নারী পর্যটকদের অনুপ্রেরণা কাজী আসমা আজমেরি। ছবি : সংগৃহীত



ট্রাভেল বাংলাদেশ : আশা করি করোনা পরিস্থিতি শিগগিরই স্বাভাবিক হয়ে যাবে। এরপর তো আপনার অন্যান্য দেশ ভ্রমণের ইচ্ছা আছে। কিন্তু সেটা কতোটা কঠিন হবে বলে মনে করেন?

কাজী আসমা আজমেরি : অনেকটাই কঠিন হয়ে যাবে। কারণ দেখা যাচ্ছে, আমরা বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা ভ্রমণ করতে পারবো কিনা এটা নিয়ে সন্দেহ থেকে যাচ্ছে। কেননা, বাংলাদেশে করোনা মোকাবিলায় যথাযথ পদক্ষেপ সেভাবে গৃহীত হয়নি। অনেক জায়গায় অনিয়ম, দুর্নীতি দেখা যাচ্ছে। ঠিকঠাক ট্রিটমেন্ট হচ্ছে না। ফলে অন্য দেশে ট্যুরিস্ট হিসেবে আমাদেরকে গ্রহণ করবে কিনা সন্দেহ আছে। আমাদের দেশ যদি পুরোপুরিভাবে করোনামুক্ত না হয় তাহলে ঢুকতে দেবে না। যেসব দেশে করোনামুক্ত হয়েছে, তারা করোনামুক্ত হয়নি এমন দেশের লোককে ঢুকতে দিচ্ছে না। দিলেও ১৪ দিন কোয়ারিন্টিনে রাখবে। কিন্তু পর্যটকরা ঘুরতে গিয়ে ১৪ দিন কোয়ারিন্টিনে পড়ে থাকলে তো আর হবে না!

ট্রাভেল বাংলাদেশ : তাহলে তো দেশের পর্যটনশিল্পের জন্য এটা অনেক বড় একটা সংকট?

কাজী আসমা আজমেরি : হ্যাঁ, অবশ্যই। যেমন ঝুঁকি রয়েছে, তেমনই আবার দেশের পর্যটকদেরও মন ভেঙে যাওয়ার একটা ব্যাপার আছে। আমাদের পর্যটন শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা অনেক খারাপ অবস্থায় আছে। যারা পর্যটন শিল্পের প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে, বিভিন্ন অফিসে কর্মরত কিংবা কোনো হোটেলের ওয়েটার, ম্যানেজার, তারা জব হারাচ্ছে। তাদেরকে ছাঁটাই করা হচ্ছে। একজন ট্রাভেলার হিসেবে খারাপ লাগছে যে একজন পর্যটক সেবকের পেটে লাথি মারা হচ্ছে। তাকে যদি অন্তত ২ মাসের বেতন দিয়ে চাকরি থেকে ছাঁটাই করা হতো তাহলে অন্তত মানা যেতো। অনেক বড় বড় কোম্পানির ট্রাভেল এজেন্সি রয়েছে, তারা চাইলে তাদের কর্মচারীদের সহযোগিতা করতে পারে। কিন্তু সেটা করা হচ্ছে না!


দেশে-দেশে কাজী আসমা।

দেশে-দেশে কাজী আসমা। ছবি : সংগৃহীত



ট্রাভেল বাংলাদেশ : সার্বিকভাবে এখন পর্যটনশিল্পের জন্য কঠিন সময়। এই কঠিন সময় থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসা সম্ভব?

কাজী আসমা আজমেরি : সমগ্র বিশ্বে আজকে ধাক্কা লেগেছে। এটি শুধু ট্যুরিজমে না। বিশ্ব অর্থনীতির সব জায়গায় সংকট তৈরি হয়েছে। তবে আমি মনে করি বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় ট্যুরিজমের জায়গায় আমাদের ধাক্কাটা কম হবে। কারণ আমরা অভ্যন্তরীণ পর্যটনের ওপর বেশি নির্ভরশীল। আমাদের বিদেশি পর্যটক বলতে গেলে ১ শতাংশ। বাকিটা অভ্যন্তরীণ পর্যটক। সূতরাং ১ শতাংশ না আসলেও আমাদের তেমন সমস্যা হবে না বলে মনে করি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেলে আমাদের দেশীয় পর্যটকদের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে অনেকটাই। আমি মনে করছি যে, এটা সেপ্টেম্বরের দিকে স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তবে এটাও সত্য, দেশের অর্থনীতি ধাক্কা খেলে পর্যটনশিল্পও মারাত্মক ধাক্কা খাবে। কিন্তু আমি বলছি, বিশ্বের তুলনায় আমরা তেমন ক্ষতির মুখোমুখি হবো না। যেমন মরক্কো-মিশর পুরোপুরি পর্যটনের ওপর নির্ভর করে থাকে। তারা বেশি ক্ষতির সম্মুখিন হবে।

ট্রাভেল বাংলাদেশ : আপনি বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে ১১৫টা দেশ ভ্রমণ করেছেন। কীভাবে সম্ভব হলো সংক্ষেপে বলুন।

কাজী আসমা আজমেরী : আমার আত্মাবিশ্বাসটা এসেছে জেদ থেকে। আমাদের সমাজে মনে করা হয়, মেয়েরা পারবে না। মেয়েদেরকে অবহেলা করা হয়। কিন্তু এটা আমার মাঝে জেদ তৈরি করেছে। এটা আমার জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল। সেই চ্যালেঞ্জ ও জেদ থেকেই বিশ্ব ভ্রমণের নেশাটা আসে। ছোটবেলা থেকেই সেটা তৈরি হয় আমার মাঝে। আর ভ্রমণ করতে করতে আমার চিন্তায় আসে যে, আমি শুধু নিজেই ভ্রমণ করবো না, যারা সবুজ পাসপোর্টধারী তারা যেন ভ্রমণ করে সেই স্বপ্নও আমি দেখি। বিশেষ করে আমি চাই নারীরা ভ্রমণে আগ্রহী হোক। বিশ্বটাকে জানুক।  

সাক্ষাৎকার প্রকাশ : ১২ই জুলাই, ২০২০

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন : সাইফুল্লাহ সাদেক   এস এম