ব্রিটিশ আমলে তৈরি ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন স্থাপনা নাওডাঙ্গার জমিদার বাড়ি
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে অভিভাবকহীন নাওডাঙ্গার জমিদার বাড়ি
নাওডাঙ্গা জমিদার বাড়ি, কুড়িগ্রাম। ছবি : ব্লগার
দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাথে জমিদার বাড়িগুলোর প্রাচীন স্থাপত্যগুলোর এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। কুড়িগ্রামে রয়েছে তেমন কিছু জমিদার বাড়ি যার মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে 'নাওডাঙ্গা জমিদারবাড়ি'। কুড়িগ্রাম শহর থেকে জমিদার বাড়ির দূরত্ব ২৫ কিলোমিটার। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ি উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত এই জমিদার বাড়িটি প্রায় ১৫০ বছরের পুরনো। শতাধিক বছরের পুরনো এই জমিদার বাড়িটি প্রায় ৯ একর ৪৫ শতক জায়গাজুড়ে অবস্থিত। ইট-সুরকি-রডের তৈরি জমিদার বাড়ি পুরোটা না হলেও নিজের অস্তিত্ব অনেকটা টিকিয়ে রেখেছে। ভারতবর্ষ ভাগ হওয়ার আগে এই জমিদার বাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন জমিদার প্রমদরঞ্জন বক্সী। ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে 'বাহাদুর' খেতাব পেয়েছিলেন জমিদার প্রমদরঞ্জন বক্সী। শুধু নাওডাঙ্গা নয়, প্রমদরঞ্জন বক্সীর জমিদারি এলাকার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল বর্তমান ফুলবাড়ি উপজেলার বিদ্যাবাগীশ, শিমুলবাড়ি ও কবির মামুদ ইত্যাদি। জমিদার প্রমদরঞ্জন বক্সীর তিন ছেলে এবং এক মেয়ে ছিল। তার বড় ছেলে আইন ব্যবসা এবং ছোট ছেলে প্রকৌশলী হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেও তার মেজো ছেলে পড়ালেখায় ভীষণ কাঁচা ছিলেন। ফলস্বরূপ, জমিদারি সামলানোর দায়িত্ব তিনি মেজো ছেলেকেই দেন। মেজো ছেলে বিশ্বেশ্বর প্রসাদ বক্সী জমিদারি সামলাতে শুরু করেন।
এদিকে জমিদার প্রমদরঞ্জন বক্সীকে নিয়ে তার বাকি দুই ছেলে কুচবিহারে থাকতে শুরু করেন। শেষ জমিদার হিসেবে বিশ্বেশ্বর প্রসাদ বক্সী আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন তার জমিদারি টিকিয়ে রাখার। কিন্তু পরে জমিদারি বিলুপ্ত হয়ে গেলে তিনিও কুচবিহারে পাড়ি জমান। তিনি চলে যাওয়াতে নাওডাঙ্গা জমিদার বাড়ি একদম অভিভাবকশুন্য হয়ে পড়ে। একসময় জমিদার বাড়িতে রাণীর গোসলখানা, শোবার ঘর, কয়েদখানাসহ আরও বেশ কয়েকটি ঘর থাকলেও এখন সেসবের খুব কম অংশই অবশিষ্ট আছে। দাঁড়িয়ে থাকা সামনের প্রবেশদ্বারটি প্রায় ১০০ মিটার উঁচু। জমিদারবাড়িতে দুইটি পুকুর রয়েছে।
বিলুপ্তির পথে নাওডাঙ্গা জমিদার বাড়ি। ছবি : জাগো নিউজ ২৪
জমিদার বাড়ির পাশে রয়েছে ত্রিশ ফুট উঁচু শিব মন্দির। শিব মন্দিরটি সংস্কারের অভাবে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে গেলে এটি সংস্কার করা হয়। এখনও অনেক সনাতন ধর্মের মানুষ শিব মন্দিরে আসেন পূজা অর্চনা করতে। এছাড়া, জমিদার বাড়ির ভেতরে রয়েছে একটি দুর্গা মন্দির। দুর্গা মন্দিরের সংস্কারের পর থেকে সনাতন ধর্মের মানুষজন এখানে গীতা পাঠের আসরে ভিড় করেন। একসময়ের জৌলুসময় জমিদার বাড়ি এখন বিলুপ্তির পথে। ইট-চুন-সুড়কি দিয়ে নির্মিত এই জমিদার বাড়ির পশ্চিম দিকের দোতলা ভবন ভেঙ্গে গেছে। এছাড়া বেশিরভাগ দালানেরই ছাদ অবশিষ্ট নেই। জমিদার বাড়ির সংস্কার তাই এখন সময়ের দাবি।
ছবি : সংগৃহীত
কিভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে কুড়িগ্রামে আসার জন্য বাসে আসা সবচেয়ে ভালো। বাসে আসতে চাইলে হক চেয়ার কোচ, জবা চেয়ার কোচ, এসবি চেয়ার কোচ, মোল্লা চেয়ার কোচ, হানিফ চেয়ার কোচ ও নাবিন চেয়ারে সরাসরি ঢাকা-কুড়িগ্রামে আসতে পারবেন। এসব বাসে সময় লাগবে সাড়ে ছয় ঘণ্টা থেকে আট ঘণ্টা। ট্রেনে আসতে চাইলে কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসে করে সরাসরি ঢাকা থেকে কুড়িগ্রামে আসতে পারবেন। কুড়িগ্রাম থেকে রিকশা, অটো কিংবা ইজিবাইকে করে নাওডাঙ্গা জমিদার বাড়িতে যেতে পারবেন।
যেখানে থাকবেন : কুড়িগ্রাম মূল শহরের বিভিন্ন হোটেলে থাকতে পারেন। কুড়িগ্রামের হোটেলগুলোর মধ্যে মেসার্স হোটেল স্মৃতি, মেসার্স হোটেল মেহেদী, মেসার্স হোটেল আরজি, মেসার্স হোটেল অর্ণব প্যালেস, মেসার্স হোটেল নিবেদিকা উল্লেখযোগ্য।
খাবার : কুড়িগ্রাম সদরে বেশ কিছু খাবার হোটেল রয়েছে। যেমন : রব্বানিয়া হোটেল ও রেস্তোরাঁ, রাঁধুনি হোটেল ও রেস্তোরাঁ, রূপসা হোটেল, নান্না বিরিয়ানি হাউজ ও ইষ্টি কুটুম উল্লেখযোগ্য।