ঊনবিংশ শতাব্দীর সাক্ষী নাগরপুর চৌধুরী বাড়ি, টাঙ্গাইল
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : জমিদার যদুনাথ চৌধুরীর কারুকার্যমণ্ডিত নাগরপুর জমিদার বাড়ি
ঐতিহাসিক নাগরপুর চৌধুরী বাড়ি, টাঙ্গাইল। ছবি : ভ্রমণ গাইড
ঢাকার অদূরে টাঙ্গাইল জেলায় কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কিছু প্রাচীন জমিদার বাড়ি। ভ্রমণপিপাসুদের কাছে আকর্ষণীয় এসব প্রাচীন স্থাপনা খুব সহজেই সবার নজর কাড়ে। প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী ও শৈল্পিক কারুকাজ খচিত এসব জমিদার বাড়ি আজও জমিদারি কালের ইতিহাস ও ঐতিহ্যে ভরপুর। ঢাকা থেকে কাছে অবস্থিত হওয়ায় সহজেই একদিনে এই জমিদার বাড়িগুলো ভ্রমণ করা যায়। কালের গর্ভে জমিদারি প্রথা আজ হারিয়ে গেলেও জমিদারদের রেখে যাওয়া চিহ্নগুলো এখনও তাদের অস্তিত্ব জানান দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবে সমৃদ্ধ ও অপরূপ সৌন্দর্যমণ্ডিত যে কয়টি জমিদার বাড়ি আজ কালের নিদর্শন হিসেবে স্থান করে রেখেছে তাদের মধ্যে টাঙ্গাইলের নাগরপুর চৌধুরী বাড়ি অন্যতম।
পাশ্চাত্য ও মোঘল সাম্রাজ্যের সংমিশ্রণে নির্মিত এই চৌধুরী বাড়িটি তার অপরূপ শোভা ও বৈচিত্র্যতা নিয়ে এখনো স্ব-মহিমায় দাঁড়িয়ে আছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, নাগরপুর চৌধুরী বংশের জমিদারি শুরু হয় জমিদার সুবিদ্ধা-খাঁ র হাত ধরে। চৌধুরী বংশের প্রথম পুরুষ ছিলেন যদুনাথ চৌধুরী। তিনিই প্রায় ৫৪ একর জমির ওপর চৌধুরী বংশের জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে এই জমিদারির হাল ধরেন তার তিন ছেলে : উপেন্দ্র মোহন চৌধুরী, জগদীন্দ্র মোহন চৌধুরী এবং শশাঙ্ক মোহন চৌধুরী।
বাড়ির দেয়ালগুলো মনে করিয়ে দেয় অতীত ইতিহাস। ছবি : নাগরপুর উপজেলা
ঊনবিংশ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত নাগরপুর চৌধুরী বাড়ির পূর্বে বয়ে চলেছে ধলেশ্বরী নদী এবং পশ্চিমে যমুনা নদী। কথিত আছে, সেই সময় কোলকাতা ও নাগরপুরের মধ্যে একটি নৌপথ চালু ছিল। যদুনাথ চৌধুরী নাগরপুর ও কোলকাতার নৌপথকে কেন্দ্র করে এই চৌধুরিবাড়ি নির্মাণ করে। তিনি নাগরপুরকে কোলকাতার মতো করে সাজানোর পরিকল্পনা করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। কালের বিবর্তনে জমিদারি প্রথার সাথে সাথে নৌপথটিও হারিয়ে যায়। নাগরপুর চৌধুরী বাড়ির জমিদার উপেন্দ্র মোহন চৌধুরীর বড় ছেলে সতীশ চন্দ্র রায় চৌধুরী সাধারণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন সেবামূলক কাজ করেন। তার শাসনামলে চৌধুরী বাড়ির সুখ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি নাগরপুরে স্কুল-কলেজ, দাতব্য চিকিৎসালয়, মন্দির, হাট-বাজার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সতীশ চন্দ্র রায় চৌধুরীর জনহিতকর এসব কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিস্বরূপ তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘রায় বাহাদুর’ খেতাবে ভূষিত করে। উপেন্দ্র মোহন চৌধুরীর ছোট ছেলে সুরেশ চন্দ্র রায় চৌধুরী ছিলেন বেশ সংস্কৃতিমনা ও ক্রীড়াপ্রেমী মানুষ।
উপমহাদেশের বিখ্যাত ফুটবল ক্লাব 'ইস্ট বেঙ্গল ক্লাব' প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার হাত ধরেই। প্রাচীন ভারতের বিভিন্ন শিল্প কর্মে মণ্ডিত ঝুলন দালান চৌধুরী বাড়ির একটি অন্যতম স্থাপনা। এই ভবনেই চৌধুরী বংশের নিত্যদিনের পূজা অনুষ্ঠিত হতো। প্রতি বছর শ্রাবণের জ্যোৎস্না তিথিতে সেখানে বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করা হতো। এছাড়াও তৎকালীন নাটক, যাত্রা গানের আসর বসতো ঝুলন দালানে।
উপেন্দ্র সরোবর। ছবি : যমুনা টেলিভিশন
ঝুলন দালানের ছাদ থেকেই দেখা মিলবে বিশাল দিঘির। এটি চৌধুরীবাড়ির দক্ষিণে অবস্থিত। ১১ একর জমির ওপর অবস্থিত এই দিঘিটি 'উপেন্দ্র সরোবর' নামে পরিচিত। দিঘিটির ওপারে দেখা যায় ঘোড়ার দালান। সেসময় জমিদার বাড়িতে সুদর্শন, সুঠাম ঘোড়া পোষা হতো। এসব ঘোড়া ও তার তদারকিতে নিয়োজিতদের থাকার জন্য এই ভবন নির্মাণ করা হয়, যা সকলের কাছে ঘোড়ার দালান হিসেবে পরিচিত। ১৯৪৭ সালে দেশবিভক্তির পর তৎকালীন সরকার নাগরপুর চৌধুরী বাড়ির সকল সম্পত্তি অধিগ্রহণ করে। বর্তমানে চৌধুরী বাড়ির মূল ভবনে নাগরপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রাচীন এই ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখতে প্রতিদিনই দর্শনার্থীরা এখানে ভিড় জমায়।
কীভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে ট্রেন বা বাস যোগে টাঙ্গাইল যাওয়া যায়। ঢাকার মহাখালি ও কল্যাণপুর থেকে টাঙ্গাইলগামী যেকোনো বাসে চড়ে যেতে পারবেন। নিরালা পরিবহন, সোনিয়া পরিবহন, আল-রাফি পরিবহন, ধলেশ্বরী সিটিং সার্ভিস ইত্যাদি বাস যোগে যেতে পারেন টাঙ্গাইল জেলা শহরে। বাস ভাড়া জনপ্রতি ১৫০-২৫০ টাকা। এছাড়া কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে টাঙ্গাইলগামী যেকোনো ট্রেনে চেপে যেতে পারবেন টাঙ্গাইল। টাঙ্গাইল শহর থেকে সিএনজি যোগে নাগরপুর আসা যায়। এরপর অটো রিক্সায় অল্প সময়েই নাগরপুর চৌধুরী বাড়ি যাওয়া যায়।
কোথায় থাকবেন : একদিনেই নাগরপুর চৌধুরী বাড়ি ভ্রমণ করা যায়। তবে টাঙ্গাইল থাকতে হলে আপনি এখানে বেশ কিছু হোটেল ও গেস্ট হাউস পেয়ে যাবেন। এদের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য মসজিদ রোডের আল ফয়সাল হোটেল, পলাশ হোটেল, আফরিন হোটেল, এস এ রেস্ট হাউস; নিরালা হোটেল, টাঙ্গাইল পল্লী বিদ্যুৎ রেস্ট হাউস ইত্যাদি।