জাতির সূর্য সন্তান বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ নূর মোহাম্মদ শেখ-এর স্মৃতিসৌধ

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : নড়াইলে অবস্থিত এই কমপ্লেক্সটি গণমানুষের কাছে বীরের স্মৃতিকে চির ভাস্বর করে রেখেছে

nur muhammad complex বীরশ্রেষ্ঠ শহীর নূর মোহাম্মাদ শেখ কমপ্লেক্স, চন্ডিবরপুর, নড়াইল। ছবি : বিডিএলএসটি

'মুক্তির মন্দির সোপানতলে

কত প্রাণ হল বলিদান

লেখা আছে অশ্রুজলে।'

লাখো শহীদের বিন্দু বিন্দু রক্তের দাম দিয়ে কেনা এই স্বাধীন বাংলাদেশ। বাংলাদেশের ইতিহাসের একই সাথে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল এবং করুণ অধ্যায় একাত্তরের সেই রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। জাতি হিসেবে আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে রয়েছে একাত্তরের সেই ইতিহাস। সেই সংগ্রামের অগ্রপথিক যারা, যাদের ত্যাগের বিনিময়ে লাল সবুজ পতাকাটা আমাদের নিজেদের হল, জাতির সেই সূর্যসন্তান্দের মধ্যে থেকে অন্যতম বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ এবং তার পৈতৃক ভিটায় অবস্থিত স্মৃতিসৌধ কমপ্লেক্স নিয়েই আজকে লেখা। ১৯৩৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি নড়াইল জেলার চন্ডীবরপুর ইউনিয়নের অধীনে অবস্থিত মহিষখোলা গ্রামে দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নূর মোহাম্মদ শেখ।

এই বীরশ্রেষ্ঠের নামানুসারে তার গ্রামের নাম হয় নূর মোহাম্মাদ নগর তার পিতা মোহাম্মাদ আমানত শেখ, মাতা জেন্নাতুন্নেছা। পারিবারিক দুরবস্থার দরুন সপ্তম শ্রেণীর পরে আর পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় নাই তার পক্ষে। ১৯৫৯ সালের ১৪ মার্চ তিনি পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস ইপিআর-এ যোগদান করেন। দীর্ঘদিন দিনাজপুর সীমান্তে কর্তব্য পালন করার পরে ১৯৭০ সালের ১০ জুলাই তাকে ল্যান্স নায়েক পদে পদোন্নতি দিয়ে বদলি করা হয় যশোর সেক্টরে। nur muhammad বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ নূর মোহাম্মাদ শেখের প্রতিকৃতি। ছবি : প্রথম আলো

 ১৯৭১ এ দেশে যুদ্ধ শুরু হলে যশোর অঞ্চল নিয়ে গঠিত ৮ নং সেক্টরে স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগদান করেন। যুদ্ধ চলাকালীন তিনি ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদার নেতৃত্বে যশোরের শারশা থানাধীন কাশিপুর সীমান্তের বয়রা অঞ্চলে যুদ্ধ করেন। একাত্তরের ৫ই সেপ্টেম্বর নূর মোহাম্মদকে অধিনায়ক করে ৫ জনের একটি পেট্রলিং টিম পাঠানো হয় সূতিপুরের গোয়ালহাটি গ্রামে। সকাল সাড়ে নয়টার দিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক ঘেরাও হয় পেট্রলিং টিমটি। শত্রুবাহিনী ভারী গোলাবর্ষণ শুরু করলে মুক্তিযোদ্ধারাও পালটা আঘাত করে পেট্রলটিকে উদ্ধারের চেষ্টা করতে থাকেন। গোলাগুলির এক পর্যায়ে সহযোদ্ধা নান্নু মিয়া শত্রুর গুলিতে আহত হলে তাকে কাঁধে তুলেই শত্রুপক্ষকে মোকাবিলা করতে থাকেন নূর মোহাম্মদ শেখ। একসময়ে শত্রুপক্ষের মর্টারের আঘাতে চরমভাবে জখম হন এই বীর সেনানী। আহত অবস্থাতেই নূর মোহাম্মাদ সহযোদ্ধাদেরকে নিরাপদ অবস্থানে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে একাই শুধুমাত্র একটি রাইফেল নিয়ে পাকিস্তানি হানাদারদের মোকাবিলা করতে থাকেন।

এক পর্যায়ে আহত অবস্থায় শত্রুপক্ষের কাছে ধরা পড়েন তিনি এবং নির্মমভাবে হত্যা করা হয় অসীম সাহসী এই বীর যোদ্ধাকে। পরবর্তীতে তার সহযোদ্ধাগণ যুদ্ধক্ষেত্রের পাশের এক ঝোপ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী যশোরের কাশিপুরে তাকে সমাহিত করেন। দেশমাতৃকা স্বাধীন হবার পরে বাংলাদেশ সরকার নূর মোহাম্মদ শেখকে যুদ্ধক্ষেত্রে তার অসীম সাহস, আত্নত্যাগ আর দেশপ্রেমের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে সর্বোচ্চ সামরিক পদক 'বীরশ্রেষ্ঠ' উপাধিতে ভূষিত করেন। জাতির এই সূর্যসন্তানের স্মৃতি গণমানুষের নিকট চির ভাস্বর করে রাখার এবং এক ই সাথে বীর এই সেনানীর আত্নত্যাগ, বীরত্বগাথা এবং দেশমাতৃকার প্রতি প্রবল এই ভালোবাসা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পরিচিত করিয়ে দেয়ার মাধ্যমে তাদেরকে উজ্জীবিত করার লক্ষ্যে তার বাস্তুভিটাতেই তোলা হয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মাদ শেখ কমপ্লেক্স। দেশের এই সূর্য সন্তানের স্মৃতি রক্ষার্থে সরকারি নির্দেশনায় তার জন্মস্থান মহিষখোলা গ্রামটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে 'নূর মোহাম্মাদ নগর'। এই স্মৃতি কমপ্লেক্সে রয়েছে একটি গ্রন্থাগার এবং স্মৃতি জাদুঘর। এছাড়াও তার নামে রয়েছে একটি ট্রাস্ট, একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং একটি মহাবিদ্যালয়। জাদুঘরটি ছুটির দিন ব্যাতীত বাকি দিনগুলোতে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা অবধি খোলা থাকে।

কমপ্লেক্সের অন্তর্গত মহান বীর সেনার স্মরণে নির্মিত স্মৃতি সৌধ কমপ্লেক্সের অন্তর্গত মহান বীর সেনার স্মরণে নির্মিত স্মৃতি সৌধ। ছবি : সংগৃহীত


 হাতে একটু সময় বের করে দেখে আসতে পারেন এই মহান বীর সেনানীর বাস্তুভিটা এবং জাদুঘর। এগুলাই আমাদের জাতীয় ইতিহাস, এদের হাত ধরেই আমাদের স্বাধীন এই বাংলার গোড়াপত্তন হয়েছে। এখানে গেলে অনুভব করতে পারবেন কতটা ত্যাগ, তিতিক্ষা আর চোখের জলের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা, কতটা দাম দিয়ে কেনা এই সোনার বাংলার প্রতিটা ইঞ্চি ইঞ্চি মাটি। নতুন প্রজন্মকে শিকলবিহীন এক দেশ উপহার দিতেই নূর মোহাম্মাদ শেখের মত বীরেরা বিলিয়ে দিয়েছেন নিজেদেরকে। আমরা সকলেই তাদের নিকট দায়বদ্ধ থাকব আজীবন। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই আমাদের প্রতিটি কন্ঠে উচ্চারিত হোক

'এক সাগর রক্তের বিনিময়ে

বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা

আমরা তোমাদের ভুলব না।'

কিভাবে যাবেন  : বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ নূর মোহাম্মদ শেখ স্মৃতি কমপ্লেক্স এ আসতে হলে আপনাকে প্রথমে যেতে হবে নড়াইল জেলায়। সড়ক পথে ঢাকা থেকে নড়াইলের দূরত্ব ৩১০ কিলোমিটার, সময় লাগবে ৫ থেকে ৬ ঘন্টা। ঢাকা থেকে সড়ক পথে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ফেরিঘাট কিংবা মাওয়া ফেরিঘাট পার হয়েও নড়াইল যেতে পারবেন। ঢাকা থেকে দিগন্ত পরিবহন, হানিফ পরিবহন এবং একে ট্রাভেলসের বাস নড়াইলের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। মানভেদে বাসের ভাড়া  ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। নড়াইল সদরে পৌঁছে অটোরিকশায় করে চন্ডীবরপুর হয়ে নূর মোহাম্মাদ নগরে পৌঁছাতে পারবেন। 
তথ্যসূত্র : mailto:https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%A8%E0%A7%82%E0%A6%B0_%E0%A6%AE%E0%A7%8B%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AE%E0%A6%A6_%E0%A6%B6%E0%A7%87%E0%A6%96 mailto:https://www.facebook.com/1863900143834379/posts/1959580447599681/ mailto:http://www.narail.gov.bd/site/tourist_spot/d0b90794-1c3a-11e7-8f57-286ed488c766/%E0%A6%AC%E0%A7%80%E0%A6%B0%E0%A6%B6%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%B7%E0%A7%8D%E0%A6%A0%20%E0%A6%B6%E0%A6%B9%E0%A7%80%E0%A6%A6%20%E0%A6%A8%E0%A7%82%E0%A6%B0%20%E0%A6%AE%E0%A7%8B%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AE%E0%A6%A6%20%E0%A6%B6%E0%A7%87%E0%A6%96%20%E0%A6%95%E0%A6%AE%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B8