নান্দনিক পাকুটিয়া জমিদার বাড়ি : টাঙ্গাইল

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : তিন মহলা বা তিন তরফ জমিদার বাড়ি নামে খ্যাত পাকুটিয়া জমিদার বাড়ি



পাকুটিয়া জমিদার বাড়ি Pakutia Zamindar Bari

ছবি : সংগৃহীত


 প্রাচীন জমিদার বাড়ি মানেই অপূর্ব কারুকাজ করা বিশাল ভবন। দেয়ালের পরতে পরতে সৌন্দর্য আর ইতিহাসের ছোঁয়া মাখা। ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা জমিদার বাড়িগুলো তাই একেকটি অতীতের কাব্য। ঢাকা বিভাগের সবচেয়ে বড় জেলা টাঙ্গাইলে রয়েছে অনেকগুলো প্রাচীন জমিদার বাড়ি। এই জমিদার বাড়িগুলো তাদের স্থাপত্যশৈলী ও সৌন্দর্যের জন্য ভ্রমণ পিপাসুদের নজর কাড়ে। চাইলে ঢাকা থেকে একদিনেই এই জমিদার বাড়িগুলো ভ্রমণ করে ফিরে আসা যায়। টাঙ্গাইলের জমিদার বাড়িগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি আকর্ষণীয় জমিদার বাড়ি হল পাকুটিয়া জমিদার বাড়ি (Pakutia Zamindar Bari)। প্রাচীন এই জমিদার বাড়িটি দেখতে দারুণ দৃষ্টিনন্দন।

ঢাকার কাছেই বলে একদিনের ভ্রমণের জন্য আদর্শ স্থান পাকুটিয়া জমিদার বাড়ি। টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর উপজেলায় পাকুটিয়ায় এই জমিদার বাড়িটি অবস্থিত। প্রায় ৫৪ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এ জমিদার বাড়িটি দেখতে অত্যন্ত নান্দনিক। অন্যান্য জমিদার বাড়ির চেয়ে একটু হলেও বাড়তি সৌন্দর্য খুঁজে পাবেন এই জমিদার বাড়িতে। এখানকার মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ পর্যটকদের মুগ্ধ করে। এই জমিদার বাড়ির ভবনগুলো চমৎকার কারুকার্য খচিত। নান্দনিক সৌন্দর্য আর দুর্লভ স্থাপত্যশৈলীর জন্য এই জমিদার বাড়িটি বিশেষভাবে নজর কাড়ে। ১৯১৫ সালে জমিদার রামকৃষ্ণ সাহা এই বাড়িটি নির্মাণ করেন। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ইংরেজ আমলের শেষ দিকে এবং পাকিস্তান আমলের দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তৎকালীন ব্রিটিশ রাজধানী কলকাতার সাথে মেইল স্টিমারসহ মাল এবং যাত্রীবাহী স্টিমার সার্ভিস চালু ছিল। একপর্যায়ে নাগরপুরের সাথে কলকাতার একটি বাণিজ্যিক এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে উঠে। পরবর্তীতে পশ্চিম বঙ্গ কলকাতা থেকে এখানে আসেন রামকৃষ্ণ সাহা মণ্ডল। যিনি কলকাতার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ছিলেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে তিনি পাকুটিয়ায় জমিদারী শুরু করেন।

তিনি এখানে একই নকশার পর পর তিনটি প্যালেস বা অট্টালিকা নির্মাণ করেন। এই জমিদার বাড়িটি তিন মহলের হওয়ার কারণে এটি তিন মহলা বা তিন তরফ নামে পরিচিত ছিল। প্রতিটি মহলের রয়েছে নিজস্ব সৌন্দর্য আর লতাপাতার চমৎকার কারুকাজ। প্রতিটি জমিদার বাড়ীর মাঝ বরাবর মুকুট হিসেবে লতা ও ফুলের মুকুট অলংকরণের চমৎকার কারুকার্য মণ্ডিত দুইটি নারী মূর্তি ছিল। এছাড়া দ্বিতীয় তলার রেলিং বা কার্নিশের উপরে পাঁচ ফুট পর পর বিভিন্ন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য সুন্দর সুন্দর ছোট আকৃতির নারী মূর্তি আছে।


পাকুটিয়া জমিদার বাড়ি Pakutia Zamindar Bari

ছবি : সংগৃহীত


 পাশ্চাত্য শিল্প সংস্কৃতির অনুসরণে সমৃদ্ধ স্থাপত্যশৈলীতে গড়ে তোলা এই অট্টালিকাগুলো অনন্য এক সৃষ্টি । তিনটি প্রাসাদের সামনেই রয়েছে তিনটি নাট্য মন্দির। পূজা মণ্ডপের শৈল্পিক কারুকাজ শোভিত এই নাট্য মন্দিরগুলো পর্যটকদের মোহিত করে। জমিদার বাড়ির সামনে রয়েছে বিশাল মাঠ আর মাঠের মাঝখানে রয়েছে দ্বিতল নাচঘর। জনশ্রুতি আছে, টিনের ও কাঠের তৈরি এই নাচঘরে বসে এখানকার জমিদাররা সে সময় নাচ দেখতো। এই জমিদার বাড়ির আশে পাশে রয়েছে বেশ কয়েকটি বড় বড় কূয়া। সেসময় জমিদার বাড়ির রান্নাসহ নানা কাজে এ সকল কূয়ার পানি ব্যবহার করা হতো। এখানে আরো আছে কালীমন্দির এবং দক্ষিণ দিকে আছে বিশাল দীঘি, যার নাম উপেন্দ্র সরোবর। রায় বাহাদুর সতীশ চৌধুরীর বাবার নামে এটির নামকরণ করা হয়। বর্তমানে এই জমিদার বাড়িটি পাকুটিয়া বিসিআরজি ডিগ্রি কলেজ এর প্রশাসনিক ভবন ও ক্লাস রুম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ১৯৬৭ সালে এই কলেজটি প্রতিষ্ঠা করা হয়।

যেভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল-গামী বিভিন্ন পরিবহনের বাস রয়েছে। তার মধ্যে আছে নিরালা পরিবহন, ধলেশ্বরী সিটিং সার্ভিস, আল-রাফি পরিবহন, সকাল-সন্ধ্যা, সোনিয়া পরিবহন ইত্যাদি। টাঙ্গাইল শহর হতে দক্ষিণে দেলদুয়ার হয়ে লাউহাটি হতে পাকুটিয়া জমিদার বাড়ি। এছাড়া ঢাকা থেকে সরাসরি ঢাকা-আরিচা রোডে কালামপুর স্ট্যান্ড হতে সাটুরিয়া হয়ে সোজা উত্তরে ১৫কি.মি এলেই পেয়ে যাবেন পাকুটিয়া জমিদার বাড়ী।

যেখানে থাকবেন: টাঙ্গাইলে থাকার জন্য বেশকিছু হোটেল ও গেস্ট হাউজ রয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : পলাশ হাউজ/নাইট গন্ধা রেসিডেনসিয়াল হোটেল; মসজিদ রোড, টাঙ্গাইল, আল ফয়সাল হোটেল রেসিডেনসিয়াল; মসজিদ রোড, টাঙ্গাইল, হোটেল সাগর রেসিডেনসিয়াল, আফরিন হোটেল;মসজিদ রোড, টাঙ্গাইল, এস এস রেস্ট হাউজ; আকুরাটাকুর পাড়া, টাঙ্গাইল, পল্লী বিদ্যুৎ রেস্ট হাউজ, এলজিইডি রেস্ট হাউজ (সরকারি), সুগন্ধা হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট; পুরাতন বাস-স্ট্যান্ড, টাঙ্গাইল, নিরালা হোটেল; নিরালা মোড়, টাঙ্গাইল, পিয়াসি হোটেল; নিরালা মোড়, টাঙ্গাইল।  

রুবাইদা আক্তার   এস এম