বধ্যভূমি ৭১' : শৃমঙ্গল ঘুরে এসে জানাচ্ছেন সুমন্ত গুপ্ত
দৃষ্টিনন্দন এই পুণ্যস্থান আরও পবিত্র হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা-সংগ্রামের নয় মাস

ঘড়ির কাঁটাতে তখন হয়তো ভোর ছয়টা বাজি বাজি, আমি নিদ্রা দেবীর আবেশে আবিষ্ট। এর মাঝেই আমার সহ ধর্মিণী সানন্দা গুপ্ত কানের সামনে ঘ্যান ঘ্যান শুরু করেছেন। ঘুম থেকে ওঠে সকালটা কি সুন্দর দেখো। ঝরা পাতাগুলো তার ছন্দে গীতি মালা গেঁথে যাচ্ছে অবিরত। আমি বললাম, উঠছি এই ফাঁকে উনি বদ্ধ ঘরের সব জানালা খুলে দিলেন। বাইরের মিষ্টি হাওয়া ঘরপানে প্রবেশ করতে লাগলো। এই মিষ্টি হাওয়ায় নিদ্রা দেবী আমায় আরও বশ করে নিলেন। পাখির কলরবে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। ঘুম থেকে উঠেই তৈরি হয়ে নিলাম নতুন গন্তব্যে যাবো বলে। ও বলাই হলো না, আমি আমার নতুন ভ্রমণ সঙ্গীকে নিয়ে উঠেছি সিলেটের শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত দুসাই রিসোর্টে। অসাধারণ পরিবেশ, সবুজের মাঝে সর্পিল পথ। বেশ ভালোই কাটছে, আমাদের সকালের নাস্তা শেষ করে আমরা বেড়িয়ে পড়লাম নতুন গন্তব্যের পানে।
বধ্যভূমি ৭১'
কোথায় যাওয়া যেতে পারে এই ভাবছিলাম। আমাদের ভ্রমণের জন্য চার চাকার গাড়িতে উঠে বসলাম। উঠেই চার চাকার মহাজনকে বললাম নতুন কোথায় যাওয়া যায় বলুনতো। পাইলট সাহেব বললেন স্যার বধ্যভূমি ৭১'-এ চলেন। ভানুগাছ সড়কে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সেক্টর হেড কোয়ার্টার সংলগ্ন ভুরভুরিয়া ছড়ার পাশে অবস্থিত বধ্যভূমি ৭১' পার্কটি। এটি এখন শ্রীমঙ্গল শহরের অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র। আমি বললাম, ঠিক আছে। চলো তাহলে। গাড়িতে চলছে পুরনো দিনের গান। এগিয়ে চলছি আঁকা বাঁকা পথ ধরে, প্রকৃতির অসাধারণ রূপ আমাদের মোহিত করছে। দেখতে দেখতে আমরা এসে পৌঁছলাম বধ্যভূমি৭১'-এ। দেখা পেলাম সত্তর থেকে আশি বছরের পুরনো একটি বিশাল বটগাছের। গাছটির ডালপালা বেশ বিস্তৃত। চারপাশে সমানভাবে সম্প্রসারিত। দেখে মনে হয়, সোঁদা মাটির গন্ধ নিতে গাছটি চারপাশে তার অনেকগুলো বাহু মেলে ধরেছে।
বিশাল এই বটগাছের পাশ দিয়ে সাপের মতো এঁকে-বেঁকে বয়ে গেছে পাহাড়ি ঝরনাধারা। আমাদের পাইলট সাহেবের কাছে নাম জানতে চাইলে বললেন এই পাহাড়ি ঝরনাধারার, নাম তার ভুড়বুড়িয়া ছড়া। ভুড়বুড়িয়া ছড়ার এক পাশে জেমস ফিনলে কোম্পানির ভাড়াউড়া চা-বাগান। বাগানে চোখজুড়ানো সমান্তরাল চায়ের আবাদ। অন্যপাশে বিজিবি ১৪ ব্যাটালিয়নের সদর দপ্তর। ধীর পদক্ষেপে আমরা এগিয়ে গেলাম বধ্যভূমি ৭১'-এর দিকে। সিঁড়ি বেয়ে এগিয়ে গেলাম আমরা। দূর থেকে দেখা পেলাম ঝুলন্ত সেতুর।
দেখা পেলাম ঐ এলাকার প্রবীণ রমিজ উদ্দিনের সাথে। তিনি বললেন, পাকিস্তান আমলে এই বটগাছের নিচে একজন সাধুর আস্তানা ছিল। এখানে চা-শ্রমিক ও বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ মানত করত, পূজা দিত। জায়গাটি 'সাধু বাবার থলি' নামে পরিচিত ছিল। দৃষ্টিনন্দন এই পুণ্যস্থান আরও পবিত্র হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা-সংগ্রামের নয় মাসে; এই পুণ্যভূমিতে ঘুমিয়ে আছে শত-সহস্র তাজা প্রাণ।
ইতিহাস
১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে এনে এখানে হত্যা করেছে। হত্যার আগে বটগাছের ডালে ঝুলিয়ে হানাদারেরা তাঁদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছে। শুধু মুক্তিযোদ্ধা নন, তাঁদের স্বজন ও মুক্তিকামী সাধারণ মানুষকেও ধরে এনে বটগাছের ডালে উল্টো করে বেঁধে রেখেছে। তৃষ্ণায়, মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করে তাঁরা এখানে শহীদ হয়েছেন। সবুজ গালিচা বিছানো চায়ের জনপদ থেকে জন্ম নেয়া পাহাড়ি উচ্ছল ঝরনাধারা স্বাধীনতা সংগ্রামের নয়টি মাস এখানটায় এসে রক্তে প্লাবিত হয়েছে।ভুড়বুড়িয়া নামের এই ঝরনাধারাটি না-জানি কত শত-সহস্র অকুতোভয় মুক্তিসেনা, মুক্তিকামী সাধারণ বাঙালি আর পাশের ভুড়বুড়িয়া চা-বাগানের আদিবাসী নিরীহ শ্রমিকদের পবিত্র রক্ত বুকে ধারণ করেছে। হয়তো এর কিছু অংশ তার জন্মঋণ শোধ করতে বয়ে নিয়ে গেছে উপজেলার পশ্চিম সীমান্তে। আমরা নগ্ন পায়ে এগিয়ে গেলাম, দেখা পেলাম ছড়ার পাশে শহীদদের নাম ফলক। সেখানে কিছু সময় দাঁড়িয়ে আমারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানালাম। ২০১০ সালের শেষ দিকে এই বধ্যভূমিতে নির্মিত হয় স্মৃতিস্তম্ভ বধ্যভূমি ৭১'।
এরই ধারাবাহিকতায় এখানে নির্মিত হয় মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য মৃত্যুঞ্জয়ী ৭১', যা গত ২০১৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচিত হয়। আমাদের মতো অনেকেই এখানে এসেছেন মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য মৃত্যুঞ্জয়ী ৭১' দেখতে। চারদিকে সবুজের লীলা-নিকেতন আর চায়ের বাগান। সমতল চা বাগানে গাছের সারি। হয়তো এরই মাঝে একঝাঁক পাখি অতিথিদের আমন্ত্রণ জানাবে তার সুরের মূর্ছনা দিয়ে। স্মৃতিস্তম্ভ বধ্যভূমির চারপাশ যেন প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা মায়াবী এক নৈসর্গিক দৃশ্য। সুনীল আকাশ, শিল্পীর তুলিতে আঁকা ছবির মত চা বাগানের মনোরম দৃশ্য যে কাউকেই নিয়ে যাবে ভিন্ন জগতে। দেখতে দেখতে আমাদের বিদায়ের পালা চলে এলো আমরা ফিরে চললাম আমাদের নতুন কোন গন্তব্য পথে।
যদি যেতে চান :
সিলেটের শ্রীমঙ্গল শহরেই বধ্যভূমি ৭১'-এর অবস্থান। বধ্যভূমি ৭১'-এ যেতে হলে প্রথমে আপনাকে বাস অথবা ট্রেনে করে যেতে হবে শ্রীমঙ্গল শহরে। শ্রীমঙ্গল শহরের চৌমুহনা থেকে রিকশায় আপনি মাত্র ৭/৮ মিনিটের মধ্যেই মৃত্যুঞ্জয়ী ৭১'-এ পৌঁছে যেতে পারবেন।শহরের ভানুগাছ সড়কে বনবিভাগ অফিসের বিপরীতে এবং বিজিবির সদর দপ্তর সংলগ্ন স্থানে বধ্যভূমি ৭১' স্মৃতিস্তম্ভের পাশেই এর অবস্থান।সুমন্ত গুপ্ত এস এম