দ্রুত এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের অর্থনীতি

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : বিগত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন ঘটে

বাংলাদেশের অর্থনীতি। বাংলাদেশের অর্থনীতি। ছবি : সংগৃহীত।

বর্তমান বিশ্বে একটি দ্রুত উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে পরিণত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছে খুব বেশি দিন হয়নি। স্বাধীনতার সময় আমাদের দেশ ছিল অত্যন্ত দরিদ্র। বিভিন্ন বাধা-বিপত্তির মধ্য দিয়ে আমাদের দেশ এগিয়ে গিয়েছে সব সময়। আয়তনের তুলনায় দেশে লোকসংখ্যা অনেক বেশি। যদি রাশিয়ার সাথে তুলনা করা হয় সেদিক থেকে রাশিয়া পৃথিবীর সব থেকে বড় দেশ এবং বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ১৬৫ গুণ বড়। অথচ রাশিয়ার লোকসংখ্যা বাংলাদেশের থেকে কম। তবে, এত বিপুলসংখ্যক জনসমষ্টি থাকার পরেও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে ক্রমান্বয়ে।

বর্তমানে আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি দেশ। যে দেশটি পূর্বে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বিবেচিত ছিল তা এখন পরিবর্তন হয়ে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অবস্থা তৈরি করতে পেরেছে। বাংলাদেশ মোট জিডিপি'র প্রবৃদ্ধি প্রায় ৬ দশমিক ৩ শতাংশ হার ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। গত এক দশক ধরে বাংলাদেশ সম্পূর্ণ বিশ্বের মধ্যে অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান ৩৮ তম এবং ক্রয় ক্ষমতার দিক থেকে অবস্থান ২৯ তম। শুধু তাই নয়, আমাদের দেশ বর্তমানে বিশ্বের দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতির খাতায় নিজের নাম লেখাতে পেরেছে। মূলত পাঁচটি জায়গা হতে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি এসে থাকে, তা হলো : উৎপাদন, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা, পরিবহন, নির্মাণ এবং কৃষি খাত। বাংলাদেশের সব থেকে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আসে পোশাক শিল্প হতে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি। ক্রমবর্ধমান বাংলাদেশের অর্থনীতি। ছবি : ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস

অর্থনীতির প্রতিটি খাতে যথাযথ মূল্যায়ন এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজের প্রক্রিয়া সম্পাদন করার কারণে বাংলাদেশে আজ উন্নয়নের আদর্শ মডেল হিসেবে পৃথিবীতে জায়গা করে নিতে পারছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে ক্ষুধা-দারিদ্রমুক্ত সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ হিসেবে পরিণত করার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বৈপ্লবিক কর্মসূচি গ্রহণ এই ক্ষেত্রে সবার সামনে আসবে। ক্ষুধা এবং দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশকে রূপান্তরিত করার জন্য তখন দেশীয়  কাঁচামাল এবং সম্পদের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে আমাদের দেশ আজকে এই পর্যায়ে আসতে পেরেছে।

জাতিসংঘের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশে উন্নয়ন দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী আমরা নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বর্তমানে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। শিল্পায়নের এই যুগে পরিবেশবান্ধব যেকোনো কিছু তৈরির ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে টেকসই শিল্প খাত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র টেকসই সরকারি খাতই নয় টেকসই বেসরকারিখাত যেন এই অগ্রযাত্রার সামিল হতে পারে এর জন্য সরকার বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি ধরনের শিল্পের প্রতি নেওয়া হয়েছে আলাদা পরিকল্পনা।

১৯৮০-এর দশকে বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প খাতের অন্তর্ভুক্ত সকল  ছোট বড় মাঝারি পণ্যসহ এলাকাগুলোকে একত্রিত করে উন্নয়নের দিকে সুগঠিত করার দিকে মনোযোগ দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের ৬৪টি জেলায় মোট ৬৪টি শিল্প সহায়ক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে করে উদ্যোক্তারা এবং ছোট-বড়-মাঝারি বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িরা ঋণ কার্যক্রম থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের সুপারিশ ও ট্রেনিং নিতে পারেন। বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশে প্রায় ১০ লক্ষাধিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে উঠেছে। আমাদের জিডিপি'র প্রায় ২৩ শতাংশ আসে এই ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্প থেকে।

ক্রমবর্ধমান বাংলাদেশের অর্থনীতি, সাথে দৃশ্যমান উন্নয়ন ক্রমবর্ধমান বাংলাদেশের অর্থনীতি, সাথে দৃশ্যমান উন্নয়ন, ছবি : উইকিপিডিয়া

স্বল্প উন্নত দেশ ক্যাটাগরি থেকে উত্তরণের জন্য মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম এই তিনটি সূচকের যেকোনো দুটি অর্জনের শর্ত থাকে। আর বাংলাদেশ তিনটি সূচকের মানদণ্ডতেই উন্নীত হয়েছে। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী একটি দেশের মাথাপিছু আয় হতে হবে কমপক্ষে ১ হাজার ২৩০ মার্কিন ডলার, যদিও প্রায় ১ হাজার ৯০৯ ডলার নিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় মানদণ্ডের থেকে অনেক বেশি।

আরেকটি মজার বিষয় হলো, মানবসম্পদ সূচকে ৬৬ প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশ অর্জন করেছে ৭২ দশমিক ৯। পোশাকশিল্পের পাশাপাশি বর্তমানে প্রসার ঘটেছে কৃষিজাত পণ্যের, খাদ্য শিল্পের, আবাসন শিল্পের, ঔষধ ও জাহাজ শিল্পের। আইসিটি শিল্প বিগত কয়েক বছরে ব্যাপক প্রশংসনীয় কার্যাবলী সম্পাদন করেছে যা বহির্বিশ্বে সুনাম কুড়িয়েছে। আমাদের দেশের রপ্তানির প্রায় ৮৫ শতাংশ আসছে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে। এখন পোশাক খাতের আকার হয়েছে ৩০ বিলিয়ন ডলারে। এছাড়া অর্থনীতির বহুমুখীকরণ পাশাপাশি এগিয়ে যাচ্ছে। প্রায় ৫৩ শতাংশ দেশজ উৎপাদনের অংশ আসছে সেবা খাত থেকে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন যাত্রা শুরু করুক না কেন এর মধ্যেও বিশেষ প্রতিবন্ধকতা পরিলক্ষিত হয়,

যেমন : ১/ দুর্বল অবকাঠামো

২/ বিদ্যুৎ এবং জ্বালানির সমস্যা

৩/ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা

৪/ আন্তর্জাতিক এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদার অনিশ্চয়তা

দৃশ্যমান দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র। ছবি : সংগৃহীত


গ্যাস এবং বিদ্যুৎ এর জ্বালানির ঘাটতি অন্যতম বড় সমস্যা। এতে করে দেখা যায় বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন বাড়াতে পারে না। যার ফলাফলে বিনিয়োগের ঘাটতি এবং রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ সমস্যা তৈরি হয়। এছাড়া ন্যায্য দাম এবং পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার অভাবে অর্থনৈতিক অবকাঠামোর মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

পরিশেষে বলতে হয়,  আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে তুলনা করলে সেদিন থেকে আমরা অনেকটাই এগিয়ে। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন, শিল্পনির্ভর এ অর্থনীতির ওপর ভর করেই বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে পারবে। উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ।