বৈশিষ্ট্যপূর্ণ জলবায়ুর বাংলাদেশে অনুকূল এবং প্রতিকূল দু-ধরনের জলবায়ু

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ুর বাংলাদেশে দেখা যায় সুস্পষ্ট বৈচিত্র্য অঞ্চলভেদে বাংলাদেশের জলবায়ু। ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশের জলবায়ুর বৈশিষ্ট্যগত বৈচিত্র্য বেশ লক্ষণীয়। জলবায়ু বলতে বোঝায় ভূ-পৃষ্ঠে কোনো স্থানের দীর্ঘ সময়ের দৈনন্দিন আবহাওয়ার সাধারণ অবস্থা। জলবায়ুর উপাদানের মধ্যে রয়েছে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, মেঘ, বায়ু, বৃষ্টিপাত, তুষারপাত ইত্যাদি। বাংলাদেশের জলবায়ু ক্রান্তীয় মৌসুমী জলবায়ু। এখানে সু-স্পষ্ট জলবায়ুর বৈচিত্র্য দেখতে পাওয়া যায়। মূলত দেশের সাধারণ জলবায়ুর পরিপ্রেক্ষিতে তিনটি প্রধান ঋতু রয়েছে : গ্রীষ্ম, বর্ষা এবং শীত। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত শীতকাল থাকে, মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত থাকে গ্রীষ্মকাল এবং জুন থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত বর্ষাকাল থাকে। এছাড়াও মার্চ মাসে ঋতুরাজ বসন্ত পরিলক্ষিত হয় ও মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য নভেম্বর পর্যন্ত হেমন্ত ঋতু থাকে। বাংলাদেশের জলবায়ু ও জলবায়ুর উপাদান। ছবি : সংগৃহীত

ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে দেশের পশ্চিম দিকের মধ্যভাগে শুষ্ক আবহাওয়ার আবির্ভাব ঘটে, যা প্রায় চার মাস পর্যন্ত অবস্থান নেয়। গ্রীষ্মকালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা থাকে প্রায় ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা থাকে প্রায় ১১ ডিগ্রী সেলসিয়াস। বাংলাদেশের সর্বনিম্ন বৃষ্টিপাত হয় রাজশাহীর লালপুরে এবং সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয় সিলেটের লালখানে। এদেশের বার্ষিক বৃষ্টিপাত ২০৩ সেন্টিমিটার।

গ্রীষ্মকাল : গ্রীষ্মকাল। ছবি : সংগৃহীত

মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত বাংলাদেশে গ্রীষ্মকাল বিরাজমান হয় যা দেশের সবথেকে উষ্ণতম সময়। উষ্ণ ও আর্দ্র দক্ষিণ-পশ্চিম বায়ু এবং পশ্চিম ও উত্তর পশ্চিম দিক থেকে আগত শুষ্ক ও শীতল বায়ু দেশে বিরাজমান হয়। এই দুই বায়ুর সংঘর্ষে অনেক সময় ঝড় হয়ে থাকে, যা পরিচিত কালবৈশাখী ঝড় নামে। এই কালবৈশাখী ঝড়ে দেশে প্রচুর ক্ষতিসাধন হয়। কিন্তু গ্রীষ্মের সময় প্রচুর পরিমাণে দেশীয় ফল খেতে পাওয়া যায় যা খুবই রসালো এবং সু-স্বাদু। এপ্রিল মাসকে বলা হয় উষ্ণতম মাস। এপ্রিল মাসে দেশের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে তাপমাত্রা ২৭° সেলসিয়াসে এবং পশ্চিম মধ্যভাগে তাপমাত্রা ৩১°সেলসিয়াসে পৌঁছায়। দেশের পশ্চিমাঞ্চলে গ্রীষ্মের তাপমাত্রা অনেক সময় ৪০°সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে থাকে।

বর্ষাকাল : বর্ষাকাল। ছবি : সংগৃহীত


বর্ষাকালে বাংলাদেশে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু প্রবাহিত হয়। দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে প্রায় প্রতিদিনই বৃষ্টি হয়। তবে পাহাড়ি অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ সবথেকে বেশি থাকে। বাংলাদেশের মোট বৃষ্টিপাতের পাঁচ ভাগের চার ভাগে বর্ষাকালে হয়ে থাকে। বর্ষাকালে সর্বনিম্ন বৃষ্টিপাত ১১৯ সেন্টিমিটার এবং সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত ৩৪০ সেন্টিমিটার। বঙ্গোপসাগর থেকে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করা ক্রান্তীয় নিম্নচাপের প্রভাবে এই মৌসুমে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়।

এপ্রিল মাসের পরে গ্রীষ্মের মাসগুলোতে তাপমাত্রা সামান্য হারে পর্যায়ক্রমে হ্রাস পেতে থাকে। দেশে এই সময়ে বর্ষা মৌসুমের আবির্ভাব ঘটে। বর্ষা মৌসুমের শেষ দিকে আকাশে মেঘ জমতে থাকে। তখন  তাপমাত্রার সঙ্গে আর্দ্রতার সংযোগ ঘটে যার কারণে এক ধরনের ভ্যাপসা আবহাওয়ার সৃষ্টি হয়। বর্ষাকালে অঞ্চলভেদে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম-বেশি হয়ে থাকে। পশ্চিম দিকের কেন্দ্রীয় অঞ্চলগুলোতে এর পরিমাণ প্রায় ২০০ মিলিমিটার এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিভিন্ন স্থানে তা ৮০০ মিলিমিটারের সামান্য বেশি হয়ে থাকে এই।

শীতকাল : ছবি : রেড্ডিট

নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত শীতকাল বিরাজমান থাকে। এসময় উত্তর-পূর্ব থেকে শুষ্ক বায়ু প্রবাহিত হয়। শীতকালে কোনো বৃষ্টিপাত হয় না বললেই চলে। এই সময়ে প্রচুর পরিমাণে ধান, পাট, আখ, চা উৎপাদিত হয়। এসময় উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু প্রবাহিত হয় যার কারণে সামান্য পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়। এর ফলে পেঁয়াজ, তেলবীজ, ডাল, রসুন, ধনে প্রভৃতি ফসল জন্মে। মূলত জানুয়ারি মাস শীতলতম মাস।

তবে এসময় ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল থেকে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে শীতকালীন শীতল বায়ুপ্রবাহ। এই বায়ুপ্রবাহ দেশের উত্তর-পশ্চিম কোণে পৌঁছতে শেষ পর্যন্ত এর তীব্রতা অনেকটা হারিয়ে ফেলে। ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকে এবং জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অংশে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা হিমাঙ্কের কাছাকাছি ৪° সেলসিয়াস থেকে ৭° সেলসিয়াসে নেমে আসে।

বাংলাদেশের জলবায়ু সমভাবাপন্ন, অনুকূল এবং প্রতিকূল দুই ধরনের জলবায়ু এখানে পরিলক্ষিত হয়। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে বাংলাদেশে ফসল বেশ ভাল জন্মে কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে এদেশে ঝড়, বৃষ্টিপাত, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা প্রভৃতি দূর্যোগ হয়ে থাকে।