বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতি
ছবি : সত্যের সন্ধানে সারাক্ষণ
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়েছে খুব বেশি আগে নয়। কিন্তু এদেশের মানুষের এবং এর রাজনৈতিক ইতিহাস শুরু হয়েছে হাজার বছর পূর্বে। হাজার বছরের পূর্ব থেকেই এই দেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বংশের মানুষজন এসেছে এবং দেশ শাসন করেছে। এরই প্রভাবে এদেশে ধর্ম, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি থেকে শুরু করে রাজনৈতিক কার্যাবলির মাঝেও এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম ও চতুর্থ শতকে প্রাচীন মৌর্য ও গুপ্ত সাম্রাজ্যের আধিপত্য ছিল। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পর পাল বংশ বাংলাদেশে আসে। এই পাল বংশ বাংলাদেশের প্রথম দীর্ঘস্থায়ী রাজবংশ। পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা গোপাল এদেশের নৈরাজ্য ও হানাহানির অবসান ঘটান। পাল বংশের দীর্ঘ শাসনামলে বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, স্থাপত্য ও অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে উৎকর্ষ অর্জন হয়েছিল। দীর্ঘ ৪০০ বছরের পাল বংশের শাসনের পর মহিপালকে পরাজিত করে কৈবর্ত নামে জেলে সম্প্রদায় একটি সফল বিদ্রোহ করে সিংহাসনে বসেছিল। কিন্তু সেসময়কার রাজত্ব ছিল স্বল্পস্থায়ী। এরপরে আসে সেন রাজবংশ। সেনরা পালদের অধীনে সেনাবাহিনীতে চাকরি করার জন্য এই দেশে এসেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তারা নিজেরা শক্তি বাড়িয়ে ক্ষমতায় বসেন।
ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসন শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশে ব্যাপক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। ছবি : কালের কন্ঠ
বখতিয়ার খিলজি নদীয়া জয়ের পরে বাংলাদেশে মুসলিম শাসনের শুরু হয়েছিল। এরপর এই সমগ্র দেশে মুসলিম শাসন বিস্তার লাভ করে। তখন স্বাধীন বঙ্গ রাজ্যের যে গোড়াপত্তন হয়েছিল, এটি দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত চলেছিল। ত্রয়োদশ শতকে বঙ্গ রাজ্যের বাকি জায়গাগুলো দিল্লির মুসলমানদের আধিপত্যে চলে যায়। এই সময় ইসলাম ধর্ম সব থেকে বেশি প্রচারিত হয়েছিল। চতুদশ শতকে বাংলা শাসন করতো সুবেদাররা। সপ্তদশ শতকে ঢাকা হয়ে ওঠে প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের এক প্রধান জায়গা। অষ্টাদশ শতকে মোঘলরা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েন। এর মধ্যেই পারস্য ও আফগানরা বাংলাদেশের ঢুকেছিল। এই সুযোগে ব্রিটিশ উপনিবেশ দক্ষিণ এশিয়া দখল করে ফেলেন। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকার্য পরিচালনা করে। কিন্তু তখন কোনো সুখ-শান্তি বিরাজমান ছিল না। ব্রিটেনে সব কৃষিজ পণ্য এদেশ থেকে পাঁচার করা হত।
দুর্ভিক্ষ ও জরাজীর্ণতায় এদেশের মানুষের কষ্টের সীমা ছিল না। ব্রিটিশরা বঙ্গদেশে প্রায় ২০০ বছর ধরে শাসন করেছে। এই শাসনকাল ছিল বর্বরতা এবং অত্যাচারে পরিপূর্ণ। ২০০ বছর ধরে বাংলার মানুষ তাদের বর্বরতা সহ্য করে এসেছে। মুঘল যুগ থেকে ইউরোপের বণিকগোষ্ঠী এই উপমহাদেশে এসেছিল বাণিজ্য করতে। প্রথম ১০০ বছর শাসন করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একটি বণিক প্রতিষ্ঠান ছিল। পরের ১০০ বছর শাসন করে ইংল্যান্ডের রানী ভিক্টোরিয়ার পক্ষে ইংরেজ শাসকরা। ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আন্দোলন হয়েছিল।
বণিকগোষ্ঠী থেকে উথ্থাপিত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ছবি : দ্যা টাইমস
১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় একমাত্র রাজনৈতিক দল ছিল মুসলিম লীগ। একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে নিখিল ভারত জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠার পর এই ধরনের কোনো সংগঠন গড়ে ওঠেনি৷ তখনকার মুসলিম নেতৃবৃন্দের প্রবণতা ছিল ব্রিটিশ শাসনের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করা। বঙ্গভঙ্গের পরে ১৯০৬ সালে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ গঠন করা হয়। উক্ত সময়ে ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ মুসলিম লীগ গঠনের উদ্যোগ নেন। তখন জাতীয় কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ ছাড়াও কিছু গোষ্ঠী বিশ শতকের দিক থেকে তাদের কাজ শুরু করে। এদের মধ্যে প্রধান দুটো সংগঠনের নাম ছিল অনুশীলন সমিতি এবং যুগান্তর দল। ১৯৪০ সালে 'লাহোর প্রস্তাব' নামক একটি প্রস্তাবনা পাস হয়। যেখানে বলা হয়েছিল মুসলিম জনগোষ্ঠীর অঞ্চলগুলো নিয়ে দুটি দেশ তৈরি হবে এবং বাকি অংশগুলো নিয়ে হবে অন্য আরেকটি দেশ। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগ হয়। অদ্ভুত বিষয় হলো তখন পাকিস্তান নামের দুটি দেশের জন্ম হলো যার মাঝে দূরত্ব ছিল প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার। আর এই দু-দেশের মাঝে ছিল ভিন্ন একটি দেশ ভারত। বর্তমান বাংলাদেশের নাম তখন ছিল পূর্ব পাকিস্তান এবং বর্তমানের পাকিস্তান দেশের নাম ছিল পশ্চিম পাকিস্তান। বিশ শতকের দিকে নির্বাচনী রাজনীতি শুরু হওয়ার সঙ্গে তখন সূত্রপাত হয় কৃষক রাজনীতির। তখন কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত কৃষক দল ছিল বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষক সভা এবং কোলকাতা ভিত্তিক মুসলিম নেতৃবৃন্দ কর্তৃক গঠিত হয় নিখিল বঙ্গ প্রজা পার্টি ও প্রজাপার্টি নামক দুটি কৃষক রাজনীতি ।
১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় পাকিস্তান মুসলিম লীগ। ১৯৪৮ সাল থেকে মুসলিম লীগের অতি দ্রুত অবক্ষয় হয়। এই অবক্ষয় ও সহিংসতার জন্য মুসলিম লীগের সাথে ভিন্নমত পোষণকারী ব্যক্তিবর্গ আওয়ামী মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম, খিলাফত-ই-রববানী পার্টি, কৃষক শ্রমিক পার্টি ইত্যাদির মতো সংগঠন গড়ে ওঠে। ১৯৫৪ সালের অনুষ্ঠিত পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদ নির্বাচনে মুসলিম লীগের লজ্জাকর ভরাডুবি হয়েছিল। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট একচেটিয়া বিজয় অর্জন করে।
আওয়ামী মুসলিম লীগ। ছবি : আওয়ামী মুসলিম লীগ ওয়ার্ডপ্রেস
১৯৫০ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯৫৫ সালের অক্টোবর মাসে দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়া হয়। শুরু থেকেই এ দলটির ভেতর দুটি মতধারার অনুসারীদের উপদল ছিল। এর মধ্যে একটি ছিল হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মার্কিনপন্থী ধারা এবং অপরটি ছিল মওলানা ভাসানীর গণমুখী বামপন্থী ধারা। এই মতপার্থক্যগত বিরোধ ১৯৫৭ সালের জুলাই মাসে দলটিতে আরও একটি ভাঙন হয়। তখন মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠন করেন। ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় এসে প্রথম সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা করে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে ১২ই নভেম্বর পূর্ব-পাকিস্তানের এক প্রলয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। সে ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ১০ লাখ মানুষ মারা যায়। এত বড় আঘাত এর পরও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কোনো ধরনের সাহায্য আসলো না।
১০ লাখ মানুষ মারা যাওয়ার পরেও যে মানুষগুলো বেঁচে ছিল তারা খাদ্যের অভাবে, সাহায্যের অভাবে অনেকেই মৃত্যুবরণ করল। পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি বিদ্বেষ যেন এই বিষয়গুলো আরও বেশি বাড়িয়ে দিয়েছিল। মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এক বিক্ষোভে স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান দাবি করেন একটি সভায়। মানুষের বিক্ষোভের মুখে পরে পরবর্তীতে সাধারণ নির্বাচন হল। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের সরকার সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল দেখে হতবাক হয়ে পরলেন। তাদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পরল। ১৬২ আসনের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জয়লাভ করেন ১৬০টি আসনে। পাকিস্তানের মোট ৩১৩টি আসনে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে ১৬৭টি আসনে। পশ্চিম পাকিস্তানের জুলফিকার আলী ভুট্টোর দল পিপলস পার্টি জয় লাভ করে ৮৮টি আসনে এবং অন্যান্য দলগুলো জয়লাভ করে ৫৮টি আসনে। অর্থাৎ ফলাফল থেকে এই দাঁড়ায় পূর্ব-পাকিস্তান পরবর্তীতে শাসন করবে। এই বিষয়টি পশ্চিম পাকিস্তান সরকার কখনোই গ্রহণ করতে পারেনি।
বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বিজয়ের সংবাদ। ছবি : প্রথম আলো
মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর নতুন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করা হয়। ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বিপুল বিজয় অর্জন করে। দেশের ক্রমাবনতিশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জন্য আওয়ামী লীগ ১৯৭৫ সালে দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার পদ্ধতি এবং বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) নামের এক দল গঠনের মাধ্যমে একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তন কতরা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সংঘটিত এক সেনা অভ্যুত্থানে শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবারের দুই সদস্য ব্যতীত সকল সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সাথে সাথে আওয়ামী লীগের এই অধ্যায়টির অবসান ঘটে। সত্তরের দশকের শেষদিকে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭৯ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই দল অধিক আসনে জয় লাভ করে।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে বেশ কিছুসংখ্যক নেতা এই দলে যোগ দেন। তখন দলটি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ৮৮টি আসনে জয় লাভ করে এবং এর বিপরীতে বিএনপি দল ১৪০টি আসন লাভ করে। ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি ১১৬টি আসনে বিপুল ভোটে জয় লাভ করেছিল। এরপর ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি'র নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সংসদের দুই তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। ১৯৮৬ সালের পহেলা জানুয়ারি লে. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে চেয়ারম্যান করে গঠিত হয় একটি মধ্যপন্থী দল জাতীয় পার্টি। ১৯৮৬ সালের মে মাসে এবং এরপর ১৯৮৮ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে এই জাতীয় পার্টির দল বিজয় অর্জন করে। যদিও বলা হয় যে, দুটি নির্বাচনেই ভোট কারচুপি হয়েছিল যার কারণে তারা জয়জ হয়েছিল। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহের এবং ছাত্রদের দ্বারা পরিচালিত আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
ছবি : ডি ডাব্লিউ
১৯৭১ সালের অস্থায়ী সরকার গঠনের পর পাঁচবার সরকার পদ্ধতি পরিবর্তিত হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমানে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার চলে। জনগণের ভোটে সরকার নির্বাচিত হয়। বাংলাদেশে যদিও সামরিক শাসনের কোনো সুযোগ নেই, তবে বিভিন্ন সময়ে সামরিক শাসনের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। এছাড়াও জঙ্গিবাদী শক্তি অনেক সময় রাজনীতিকে এবং দেশের অবস্থাকে বিপাকে ফেলেছে। বহু রাজনৈতিক দলের মধ্যে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি প্রধান এবং তৃতীয় দল হিসেবে আছে জাতীয় পার্টি।
ছবি : দিনবাংলা ডট কম
বাংলাদেশের স্বাধীনতা থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত ছাত্র রাজনীতি বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। দেশের অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে শুধু একটি কথা বলা কাম্য, একটি সুস্থ ও সুন্দর রাজনীতি, সেই সাথে সকল মানুষের কল্যানে কাজ করবে এমন রাজনৈতিক অবস্থা একটি দেশের জন্য অপরিহার্য। শুধুমাত্র দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যই নয়, সামাজিক উন্নয়ন এবং নিজেদেরকে অনন্য জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করতে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম।