১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা অর্জন
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : প্রিয় মাতৃভূমির রক্তক্ষয়ী মুক্তির কথা
ছবি : দা এশিয়ান এজ
প্রিয় মাতৃভূমিকে ভালোবাসেনা এরকম মানুষ খুব কমই পাওয়া যাবে। দেশের প্রতি ভালোবাসার অনুভূতি অন্যসব অনুভূতি থেকে আলাদা। এই অনুভূতি দেশের প্রতি তীব্র ভালোবাসা থেকেই তৈরি হয়। নিজের মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসার সাথে অন্য কোনো ভালোবাসার তুলনা দেয়া যায় না। এই মাতৃভূমির জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করতে বাংলার মানুষ সবসময়ই ঐক্যবদ্ধ ছিল। নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের স্বাধীনতা অর্জন করেছি। আমাদের মাতৃভূমির জন্য স্বাধীনতার ইতিহাস গভীর আত্মত্যাগের ইতিহাস। শুধুমাত্র ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ নয়, স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে ১৯৭১ সালের যুদ্ধ পূর্ববর্তী অনেক আন্দোলন, সংগ্রাম সাক্ষী রয়েছে। নিজের দেশকে জানতে হলে এর আসল ইতিহাস জানার কোন বিকল্প নেই। প্রথমেই বলা যাক ব্রিটিশ শাসনামলের কথা। ব্রিটিশরা বঙ্গদেশকে প্রায় ২০০ বছর ধরে শাসন করেছে।
এই শাসনকাল ছিল বর্বরতা এবং অত্যাচারে পরিপূর্ণ। ২০০ বছর ধরে বাংলার মানুষ তাদের বর্বরতা সহ্য করে এসেছে। ১৯৪০ সালে 'লাহোর প্রস্তাব' নামক একটি প্রস্তাবনা পাস হয়। যেখানে বলা হয়েছিল মুসলিম জনগোষ্ঠীর অঞ্চলগুলো নিয়ে দুটি দেশ তৈরি হবে এবং বাকি অংশগুলো নিয়ে হবে অন্য আরেকটি দেশ। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগ হয়। অদ্ভুত বিষয় হলো তখন পাকিস্তান নামের দুটি দেশের জন্ম হলো যার মাঝে দূরত্ব ছিল ২,০০০ কিলোমিটার। আর এই দু-দেশের মাঝে ছিল আরেক দেশ ভারত। বর্তমান বাংলাদেশের নাম তখন ছিল পূর্ব পাকিস্তান এবং বর্তমানের পাকিস্তান দেশের নাম ছিল পশ্চিম পাকিস্তান।
ষড়যন্ত্র এবং বৈষম্য :
ভাষা আন্দোলন । ছবি : সংগৃহীত[/caption]
শুধু মাত্র ২ হাজার কিলোমিটার দূরত্বে থাকাই দেশ দুটোর মধ্যে সবথেকে বড় পার্থক্য ছিল না। দুই দেশের মধ্যে খাবার, পোশাক সংস্কৃতি-ঐতিহ্য কোনো কিছুরই মিল ছিল না। শুধু একটি বিষয় মিল ছিল তা হল ধর্মের। তখন বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল দুই কোটি এবং পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল চার কোটি।
কিন্তু সকল ধরনের সুবিধা পশ্চিম পাকিস্তান ভোগ করতো। অথচ বাজেটের বেশিরভাগ রাজস্ব আয় আসতো পূর্ব পাকিস্তান থেকে। বাজেটের ৭৫ শতাংশ ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য এবং ২৫ শতাংশ ব্যয় হতো পূর্ব পাকিস্তানের জন্য। শুধু তাই নয় পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তান হতে ২৫ গুণ বেশি ছিল। প্রতিটি দিক থেকেই পূর্ব পাকিস্তানকে বঞ্চিত করা হতো।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন :
[caption id="attachment_28017" align="alignnone" width="846"]
ছবি : দৈনিক ইত্তেফাক
শুধুমাত্র অর্থনৈতিক দিক থেকে যে পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন চালাত তা নয়। পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা, সংষ্কৃতি আর ঐতিহ্যের ওপর বরাবরই তাদের বর্বর নির্যাতন চলত। ১৯৪৮ সালে একটি সম্মেলনে মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ ঢাকায় এসেছিলেন। সেখানে এসে তিনি বলেন, 'উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা'। এই কথা শোনার পর পর পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। সবকিছু কেড়ে নেয়ার পরে মাতৃভাষাকেও এভাবে কেড়ে নেয়াকে আর কেউ সহ্য করতে পারছিল না। বিক্ষোভের মাধ্যমে চারদিকে আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন হয়। সেই ভাষা আন্দোলনে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, সফিকসহ আরও অনেকে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। পৃথিবীর ইতিহাসে ভাষার জন্য এমন প্রাণ দেয়ার নজির নেই। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী তারপরও থেমে ছিলনা। অবশেষে বিক্ষোভের মুখে পরবর্তীতে ১৯৫৭ সালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাংলা ভাষার বিষয়টি স্বীকৃতি দেয়।
১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন :
১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলন। ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশে তখন আইয়ুব খানের শাসন আমল চলছিল। আইয়ুব খান মূলত একজন সামরিক শাসক ছিলেন। অত্যাচারের মাত্রা যেন তখন আরো কয়েকগুণ বেড়ে চলেছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এখন পর্যন্ত এমন কোনো রাষ্ট্র পাওয়া যায়নি যেখানে সামরিক শাসনের মাধ্যমে সেই দেশ ভালো অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছে। কিংবা সেই দেশের মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে পেরেছে। পূর্ব পাকিস্তানের জন্যও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নানা বঞ্চনার শিকার হয়ে ধুকে ধুকে এদেশের মানুষ জীবন পরিচালনা করছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের জন্য স্বায়ত্তশাসনের দাবি করেন। ছয় দফা দাবি ছিল বাঙালি জাতির জন্য মুক্তির দাবি। ১৯৬৬ সালের ৬ দফা দাবির জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ আওয়ামী লীগের সকল নেতাকর্মীকে জেলে প্রেরণ করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমানকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামি করা হয়। এই ধরনের অবস্থায় পূর্ব পাকিস্তান আন্দোলনে আরও ফেটে পড়ে। তারা কিছুতেই এই বিষয়টি মেনে নিতে পারল না। সেই মুহূর্তে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিল ছাত্ররা। তারা ১১ দফা দাবি নিয়ে মাঠে নামে। সেসময়ে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী জেলের বাইরে ছিলেন। তিনি ছাত্রদের সহযোগিতা করার জন্য এগিয়ে এলেন। এই আন্দোলন এতটাই প্রকট ছিল যে আন্দোলন থামানোর জন্য কোনও ধরনের শক্তি কাজে লাগছিল না। মানুষ মারা যাচ্ছিল, আহত হয়েছিল কিন্তু আন্দোলন থেমে ছিলনা।
পরবর্তীতে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হয় কিশোর মতিউর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আসাদ। পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালের ২৫ শে মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দেয়া হয়।
সাধারণ নির্বাচন : আইয়ুব খানের পরে ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় আসেন। ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় এসে প্রথম সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা করে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে ১২ই নভেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের এক প্রলয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। সে ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ মারা যায়। এত বড় আঘাত এর পরও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কোন ধরনের কোনো সাহায্য আসলো না। ১০ লক্ষ মানুষ মারা যাওয়ার পরেও যে মানুষগুলো বেঁচে ছিল তারা খাদ্যের অভাবে, সাহায্যের অভাবে অনেকেই মৃত্যুবরণ করল। পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি বিদ্বেষ যেন এই বিষয়গুলো আরও বেশি বাড়িয়ে দিয়েছিল। মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এক বিক্ষোভে স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান দাবি করেন একটি সভায়। মানুষের বিক্ষোভের মুখে পরে পরবর্তীতে সাধারণ নির্বাচন হল।
১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের সরকার সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল দেখে হতবাক হয়ে পরলেন। তাদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পরল। ১৬২ আসনের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জয়লাভ করেন ১৬০টি আসনে। পাকিস্তানের মোট ৩১৩টি আসনে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে ১৬৭টি আসনে। পশ্চিম পাকিস্তানের জুলফিকার আলি ভুট্টোর দল পিপলস পার্টি জয় পান ৮৮টি আসনে এবং অন্যান্য দলগুলো পায় ৫৮টি আসন। অর্থাৎ ফলাফল থেকে এই দাঁড়ায় পূর্ব-পাকিস্তান পরবর্তীতে শাসন করবে। এই বিষয়টি পশ্চিম পাকিস্তান সরকার কখনোই গ্রহণ করতে পারেনি। তারা সিদ্ধান্ত নিতে থাকলো যেভাবেই হোক পূর্ব পাকিস্তানকে শাসনের ভার দেয়া যাবে না।
ষড়যন্ত্রের নীলনকশা : পূর্ব পাকিস্তানকে কীভাবে ধ্বংস করে দেওয়া যায় তা নিয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনা শুরু হতে থাকে। পশ্চিম পাকিস্তানের পিপলস পার্টির সভাপতি জুলফিকার আলি ভুট্টোকে ইয়াহিয়া খান লারকানায় 'পাখি শিকার' করার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। আসলে বিষয়টি পাখি শিকার করার কোনও অনুষ্ঠান ছিল না। পাকিস্তানের বাঘা বাঘা জেনারেল সেই অনুষ্ঠানে যোগদান করলেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের আগে পহেলা মার্চ ইয়াহিয়া খান সবকিছু স্থগিত করলেন। পূর্ব পাকিস্তান মানুষের মধ্যে তখন ক্ষোভের পাহাড় আরও জাগ্রত হয়ে গেল। সারাদেশে বিক্ষোভে ফেটে পরলো।
উত্তাল মার্চের শুরু :
২৫ শে মার্চ কালো রাতের ভয়াবহ চিত্র। ছবি : সংগৃহীত
জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের স্থগিতের বিষয়ে তখন রেডিওতে প্রকাশ করা হয়। সেসময়ে ঢাকা স্টেডিয়ামে কমনওয়েলথ একাদশের খেলা চলছিল। নিমিষে সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়। চারদিকে এক যুদ্ধক্ষেত্র পরিবেশে তৈরি হয়। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, দোকানপাট বন্ধ করে দেয়া হয়। মানুষের মধ্যে বিক্ষোভের যে পাহাড় জমা ছিল তারই ফলস্বরূপ এই ধরনের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। পুরো ঢাকা মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়েছিল। তখন স্বাধীনতার স্লোগানে চারদিক ফেটে পরে ছিল। 'বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর'-এই স্লোগানে মুখর হয়ে উঠছিল চারিদিক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অনির্দিষ্টকালের জন্য অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন। পূর্ব পাকিস্তান অচল করে দেয়া হলো। সকল ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করা হলো। পূর্ব পাকিস্তানের আন্দোলন বন্ধ করতে কারফিউ জারি করা হলো। কিন্তু সেই কারফিউ উপেক্ষা করে মানুষ আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকলো। অসংখ্য মানুষ যখন মারা যাচ্ছিল কিন্তু আন্দোলন থেকে কেউ এক পা পিছু হাঁটছিলো না।
২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় মানচিত্রখচিত বাংলাদেশের পতাকা প্রথম উত্তোলন করা হয়। ৩ মার্চ জনসভায় বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে, 'আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি'-কে নির্বাচন করা হয়। ৭ই মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সবার উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, 'তোমাদের যা কিছু আছে তা নিয়ে যুদ্ধে নেমে পড়ো, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।'
ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের সেই মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু। ছবি : মুজিব বর্ষ ফটো আর্কাইভ
পৃথিবীর ইতিহাসে ৭ই মার্চের মত এরকম ভাষণের নজির পাওয়া দুষ্কর। ৭ ই মার্চের গণজমায়েতে মানুষজন যেন তাদের মনের কথাই শেখ মুজিবুর রহমানের মুখ থেকে শুনতে পারছিলেন। এর মধ্যেই ইয়াহিয়া খান গণহত্যার পরিকল্পনা করছিলেন। আর পশ্চিম পাকিস্তান থেকে প্রতিদিনই বিমানে করে বাংলাদেশের তাদের সেনাদের নিয়ে আসা হতো। সে বিমানে করে বিভিন্ন যুদ্ধের অস্ত্র নিয়ে আসা হত। হাস্যকর বিষয় হল ২৩শে মার্চ পাকিস্তান দিবসের পূর্ব পাকিস্তানের কোথাও পাকিস্তানের পতাকা আর উত্তোলন করা হলো না।
২৫ শে মার্চের গণহত্যা : ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ইয়াহিয়া খানের পরিকল্পনা অনুযায়ী ভয়াবহ গণহত্যা করা হয়েছিল। এদেশের বুকে শহরের প্রতিটি রাস্তায় ব্যারিকেড দেয়া হয়েছিল যেন কেউ বের হতে না পারে। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রত্যেকটি সেনা রাত সাড়ে এগারোটায় নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিল। সেই ভয়াল রাত্রে যাকে যেখানে পাওয়া হয়েছিল নির্মমভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছিল। সেই কালো রাতে ঢাকা শহর এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। লাশের মিছিলে চারদিকে ছড়িয়ে ছিল। এই খবর যাতে দেশের বাইরে প্রচারিত না হয় সেজন্য বন্দুকের মুখে সকল বিদেশী সাংবাদিককে ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল আটকে রাখা হয় এবং পরে তাদের করাচি পাঠিয়ে দেয়া হয়। ব্রিটেনের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকার ২৬ বছর বয়সী সাইমন ড্রিং পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর চোখ এড়িয়ে থেকে যেতে সক্ষম হন। বাংলাদেশের বন্ধু এই দুঃসাহসী সাংবাদিক ঢাকা শহরের এই ভয়াবহ চিত্র, ভিডিও ধারণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান থেকে ব্যাংককে গিয়ে যে প্রতিবেদন পাঠান সেটি ১৯৭১ সালের ৩০শে মার্চ ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ছাপা হয়। যার মাধ্যমে সেই চিত্র বিশ্ববাসী জানতে সক্ষম হয়েছিলেন।
যাদের আত্মত্যাগে আজকের বাংলাদেশ পেয়েছি আমরা। ছবি : মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর
পরিকল্পনা অনুযায়ী বাংলাদেশের সব মিলিটারি অফিসারদের আগে হত্যা করা হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের একজন ছাত্রও তখন নির্মম হত্যা থেকে বাদ যায়নি। ঘুমন্ত ছাত্রদের মৃত্যুর আগে তাদের দিয়ে একটি গর্ত করা হয়েছিল। তাদেরকে হত্যা করার পর সেই গর্তে ছাত্রদের ফেলে দেয়া হয়েছিল। বুয়েটের প্রফেসর নূর উল্লাহ এই ভিডিওটি গোপনে করতে পেরেছিলেন তাঁর বাসা থেকে। বর্তমানে বাংলাদেশের আর্কাইভে সেই ভিডিওটি সংরক্ষিত আছে। সবথেকে বড় যে পরিকল্পনা ছিল বাংলাদেশের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা সেটিও করতে পেরেছিল পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী। শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে জেলে প্রেরণ করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করার আগেই তিনি বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। ঘোষণাটি ইপিআর ট্রান্সমিটার এর মাধ্যমে সারাদেশে প্রচার করা হয়। বঙ্গবন্ধুর পক্ষ হতে পরবর্তীতে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান আবারও স্বাধীনতার ঘোষণা চট্টগ্রাম থেকে রেডিওর মাধ্যমে পুরো দেশের প্রচার করেছিলেন। তখন যখন পূর্ব পাকিস্তান নামে আর কোন দেশ রইল না। তাই ২৬শে মার্চ কে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস বলা হয়। কিন্তু এই স্বাধীন দেশে পাকিস্তানের বর্বর সেনারা তখনো রয়ে গিয়েছে।
মহান মুক্তিযুদ্ধ :
১৯৭১ সালের ভয়াবহ অবস্থা। ছবি : সংগৃহীত
২৫ শে মার্চের ভয়াল রাতের পর সবাই যার যার গ্রামে ফিরে যাচ্ছিল। জেনারেল টিক্কা খান তখন ভাবলো ঢাকার মতো পুরো বাংলাদেশকেই তারা দখলে নিয়ে আসতে পারবে। কিন্তু তাদের এই ধারণা ভুল ছিল। দীর্ঘ নয় মাসব্যাপী এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম শুরু হয়। যুদ্ধের প্রথম দিকে বাংলাদেশ পরিকল্পনার অনেক অভাব ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ধাপে ধাপে পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশকে-১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছিলো। নৌ-বাহিনীর অধীনে ছিল-১০ নং সেক্টর, ১০ নং সেক্টরে কোনো সেক্টর কমান্ডার ছিল না, চট্টগ্রাম-১নং সেক্টর, ঢাকা-২ নং সেক্টর, রাজশাহী-৭ নং সেক্টর, মুজিব নগর-৮ নং সেক্টর, সুন্দরবন-৯ নং সেক্টর করা হয়। দেশকে শত্রুমুক্ত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সশস্ত্র যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত করার এই যুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কিছু রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, সামরিক বেসামরিক কর্মকর্তা, ছাত্র ও যুব সংগঠনের নেতৃবৃন্দ যুক্ত হয়। পাকিস্তান মুক্তিকামী মানুষের ওপর জঘন্য এবং পৈশাচিক অত্যাচার, হত্যাকাণ্ড চালায়। এই নির্মম ও নিষ্ঠুর অত্যাচারে শহীদ হয় ৩০ লাখ নিরীহ মানুষ, সম্ভ্রম হারায় প্রায় ২ লক্ষাধিক বাংলার নারী।
দেশকে স্বাধীন করতে এমন বয়সেই বীরেরা কাঁধে তুলে নিয়েছিল অস্ত্র। ছবি : মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর
১৯৭১ সালের নভেম্বরের শেষদিকে মুক্তিযুদ্ধ পূর্বের তুলনায় আরও তীব্রতর হয়ে ওঠে। সেই সময়ে ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করে। এরপর ৪ ডিসেম্বর থেকে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনী যৌথভাবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে বিপর্যস্ত করে তােলে। এরমধ্যে ৬ ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমণে ১৩ ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল শত্রুমুক্ত হয়ে যায়। পশ্চিম পাকিস্তানের বর্বর সেনারা যখন বুঝে ফেলল তাদের পরাজয় নিশ্চিত সেসময়ে তারা আরেকটি নিকৃষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করল। বাংলাদেশের মানুষদের চিরতরে পঙ্গু করে দেয়ার জন্য সকল জ্ঞানী ব্যক্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারসহ দেশের মেধাবী গুণীদের ১৪ ডিসেম্বর হত্যা করা হলো। যুদ্ধক্ষেত্রে এমন নির্মমতার পরিচয় ইতিহাসকে আরও জঘন্য করেছে।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়। ছবি : সংগৃহীত
পরবর্তীতে ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে রেসকোর্স ময়দানে বাংলাদেশে অবস্থিত পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজি হাজার হাজার উৎফুল্ল জনতার সামনে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন। তখন প্রায় ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য আত্মসমর্পণ করে। এটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্ববৃহৎ আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান। এরপর আমরা স্বাধীন বাংলাদেশে অর্জন করি।
আজ এতো বছর পরেও যুদ্ধের আসল তাৎপর্য আমরা লালন করতে শিখতে পারিনি। তারপরও আমাদের স্বপ্ন সকল ব্যর্থতা ও গ্লানি মুছে ফেলে সুখী-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে আমরা পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারবো। বাংলার মানুষ স্বপ্ন দেখছে নতুন জাগরণের। সকল অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে আমরাই জেগে উঠবো।