বাল্ট্রা দ্বীপ : গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের রহস্যময় দ্বীপ

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের বাল্ট্রা দ্বীপ বা ইসলা বালত্রা



View of baltra island (বাল্ট্রা দ্বীপ)

গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের চির শুষ্ক, চির রুক্ষ বাল্ট্রা দ্বীপকে কখনোই বৃষ্টি ছুঁতে পারে না। ছবি : বুকমুন্ডি ডট কম


 দ্বীপ শুনলেই মাথায় আসে অপার সৌন্দর্য দিয়ে ঘেরা কোনও জায়গা। যেখানে পর্যটকরা যান দারুণ কিছু সময় কাটাতে। কিন্তু দ্বীপগুলোকে ঘিরে যদি রহস্য থাকে তাহলে তো পর্যটকদের আকর্ষণ দ্বিগুণ হয়ে যায়। অপার রহস্যের এমনই এক দ্বীপ হচ্ছে বাল্ট্রা দ্বীপ (Baltra Island)। যেখানে এক ফোঁটাও বৃষ্টির পানি পড়ে না। বিস্ময়কর আরও নানা ব্যাপারের কারণে এই দ্বীপ নিয়ে কৌতূহলের কোনও অন্ত নেই। তাহলে চলুন জেনে আসা যাক আজব এই দ্বীপ সম্পর্কে।

দ্বীপের অবস্থান

বাল্ট্রা দ্বীপটি গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের কেন্দ্রে অবস্থিত ছোট সমতল একটি দ্বীপ। এর অপর নাম ইসলা বালত্রা। এই দ্বীপটিকে আবার অনেকে দক্ষিণ সিমুর (লর্ড হিউ সিমুর)-এর নামেও ডাকে। দক্ষিণ আমেরিকার ইকুয়েডরের এর কাছে মোট ১৩টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত গালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ। আর এই দ্বীপগুলোর একটি হচ্ছে এই বাল্ট্রা দ্বীপ। তবে অন্যান্য দ্বীপ থেকে এটি একদমই আলাদা।

মানুষবিহিন দ্বীপ

বিভিন্ন রহস্যেঘেরা এই দ্বীপটি সম্পূর্ণ জনমানব শূন্য। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় হওয়ায় গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, এতো বৃষ্টিপাতের একটি ফোঁটাও বাল্ট্রা দ্বীপে পড়ে না। কোনও এক অজানা কারণে এই দ্বীপের অনেক ওপর দিয়ে মেঘের দল উড়ে যায় এবং অন্য কোন দ্বীপে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। এ যেন এখানকার আজব এক নিয়ম। বৃষ্টির তীব্রতা যতই হোক, বাল্ট্রাকে এক ফোঁটা বৃষ্টিও ছুঁতে পারেনা। এই দ্বীপ চির শুষ্ক, চির রুক্ষ।

আরও পড়ুন : জাস্ট রুম এনাফ দ্বীপ : নিউইয়র্ক


View of Baltra Island

বিরান এই দ্বীপেও শতবছর পূর্বে মানুষের বসবাস থাকলেও এক সময় অজানা রোগে মারা যেতে থাকায় বাকিরা দ্বীপ ছেড়ে পালিয়ে যায়। ছবি : সংগৃহীত



দ্বীপটি অভিশপ্ত

একদমই জনবসতি নেই বলে এই দ্বীপকে অনেকেই মৃত দ্বীপ বলে ডাকেন। তবে এই বিরান দ্বীপেও একসময় মানুষের বসতি ছিল। কিন্তু আনুমানিক কয়েকশ বছর আগে কোনও এক অজানা রোগে এখানকার মানুষজন মারা যেতে শুরু করে। যার ফলে ভয়ে এই দ্বীপ বাসিরা এখান থেকে পালিয়ে অন্যত্র বসতি গড়ে। এতে করে পুরো দ্বীপ জন মানবহীন হয়ে পড়ে। এই দ্বীপবাসীরা সবাইকে জানায় যে এই দ্বীপটি অভিশপ্ত। এখানে কেউই বেঁচে থাকতে পারবে না। আর এভাবেই এই দ্বীপটি অভিশপ্ত জায়গা হিসেবে পরিচিতি পায়।

দ্বীপের ইতিহাস

তবে, এই দ্বীপের আজব সব ব্যাপার বিশ্ববাসীর সামনে আসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন। যুদ্ধের কৌশলগত কারণে এই গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের কয়েকটি দ্বীপে বিমানঘাঁটি স্থাপন করে মার্কিন সরকার। ফ্রেন্সিস ওয়ানার ছিলেন এখানকারই একজন দায়িত্বরত অফিসার। এই দ্বীপপুঞ্জে থাকাকালীন সময়ে তিনি আজব সব ঘটনার সম্মুখীন হন। এরপর থেকেই পৃথিবীজুড়ে সবাই এই দ্বীপ সম্পর্কে জানতে পারে। এই দ্বীপের রহস্যের কোনও শেষ নেই। হরহামেশাই এখানে অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটে। এটাতো সবারই জানা কথা যে স্বাভাবিক অবস্থায় কম্পাসের কাটা সবসময় দিক নির্দেশ করে। কিন্তু আজব এই দ্বীপে নাবিকদের কম্পাসও কাজ করে না। এখানে কম্পাসগুলো সব অস্বাভাবিক আচরণ করা শুরু করে। কখনও কম্পাসের কাটা স্থির হয়ে থাকে আবার কখনওবা ইচ্ছামত ঘুরতে থাকে অথবা উল্টাপাল্টা দিক নির্দেশ করে।

আরও পড়ুন : মঙ্গলশিকদার : দ্বীপ জেলা ভোলার অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য



Air Base of US Army in Second World War on Baltra Island

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে বাল্ট্রা দ্বীপে ইউএস আর্মির বিমান ঘাটি। ছবি : উইকি ট্রাভেল


এছাড়া, এই দ্বীপের ওপর দিয়ে বিমান চলাকালে তার কম্পাসও ভুলভাল দিক নির্দেশনা দিতে শুরু করে। আবার এই দ্বীপ পেরুলেই সব স্বাভাবিক হয়ে যায়।

অনেকেরই স্বাভাবিক মানসিক স্থিতি হারিয়ে যায়

এই দ্বীপের রহস্যময়তা এখানেই শেষ নয়। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হল এখানে এলে অনেকেরই স্বাভাবিক মানসিক স্থিতি হারিয়ে যায়। মাথার ভেতরটা বেশ হালকা হয়ে যায়। অনেকের এমনও ঘটেছে যে স্মৃতিশক্তি লোপ পেয়েছে। আবার অনেকে অস্বাভাবিক আচরণ করে। কেউ কেউ আবার অন্যরকম এক ভালোলাগার জগতে হারিয়ে যায়। কোনও এক সম্মোহনী শক্তি এখানে আগতদের বশ করে। এখানে এলে আর যেতে ইচ্ছে করে না। এক অদ্ভুত ভালো লাগায় থেকে যেতে ইচ্ছে হয় চিরকাল। এই দ্বীপ থেকে চলে আসার পরও বেশ কিছুদিন এই সম্মোহনের অনুভূতি থেকে যায়। অদ্ভুত এই দ্বীপটি খুব শুষ্ক এবং কিছুটা শক্ত ঝোপঝাড়পূর্ণ । গ্যালাপাগোসের প্রতিটি দ্বীপেই আছে সিলমাছ, ইগুয়ানা, দানবীয় কচ্ছপ, গিরগিটিসহ বিরল প্রজাতির কিছু পাখি।

কিন্তু এই আজব দ্বীপে কোনও গাছ, প্রাণী বা কীটপতঙ্গের নাম নিশানাও নেই। শুধুমাত্র এক প্রকারের ফণীমনসা এবং পালো সান্টো গাছ দেখা যায়।কোন রকম পশুপাখিই এ দ্বীপে বসবাস করতে চায় না। এই দ্বীপকে এড়িয়ে পাশের দ্বীপগুলোতে চলে যায় প্রাণীরা । আরও অদ্ভুত ব্যাপার হল উড়ন্ত পাখির দল বাল্ট্রার কাছে এসেই ফিরে যায়। যেনও কোনও অদৃশ্য দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে পাখিগুলো ফিরে যায় এখান থেকে। এখানকার অবিশ্বাস্য ব্যাপারগুলো বিস্ময়ে হতবাক করে যে কাউকেই। যার কোনও যৌক্তিক কারণ বা ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায় না। যেনও কোনও ভিন্ন ধরনের শক্তি কাজ করে এখানে। ১৯৬০ সাল থেকে এই দ্বীপটি পর্যটকদের নজরে আসলেও ১৯৯০ সালের পর থেকে এটি আকর্ষণীয় ভ্রমণ গন্তব্যে পরিণত হয়।

প্রতি বছর এই দ্বীপে প্রায় দুই লাখ পর্যটক ঘুরতে আসে। পর্যটকদের জন্য এই দ্বীপে সিমুর নামে একটি বিমান বন্দর রয়েছে। এই বিমানবন্দরে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা পর্যটকদের জন্য সেবার ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া এই দ্বীপে দুটি ফেরিঘাটও আছে।  

রুবাইদা আক্তার   এস এম