পিরামিডের বাহিরেও খাবার নিয়েও বিশ্বের কাছে মিশরের রয়েছে আলাদা খ্যাতি
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : মৃতদের জন্য উৎসর্গ করা খাবার ছিল মিশরের প্রচলিত রীতি
মিশরীয়দের খাবারের মধ্যে শস্যদানা থেকে প্রস্তুতকৃত খাবার বেশি থাকত। ছবি : এনসাইন্ট অরিজিন
নীলনদের অববাহিকায় অবস্থিত বলে প্রাচীনকাল থেকেই মিশর খাদ্যদ্রব্য উৎপাদনে বেশ কিছু সুযোগ-সুবিধা পেয়ে আসছে। নদী অববাহিকার পলি মাটির উপস্থিতির কারণে শস্যের ক্ষেত্রে দেশ বেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল বলে বিজ্ঞানীরা ধারনা করেন। এছাড়া প্রাচীন মিশরীয়রা পশুপালনেও বেশ পারদর্শী ছিলেন, তাছাড়া নীলনদকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন দেশের সাথে বাণিজ্য সম্পর্কও গড়ে তুলেছিল মিশরীয়রা। পিরামিডের গায়ে আঁকা বিভিন্ন চিত্র এবং প্যাপিরাস থেকে উদ্ধার করা তথ্য থেকে জানা যায় তৎকালীন মিশরে জনগণের সম্পদ এবং প্রতিপত্তির অবস্থা বিবেচনায় তাদের খাবারদাবারের ধরন নির্ধারিত হত। সমাজের উচ্চশ্রেণীর জন্য বিভিন্ন উপযুক্ত খাবারের ব্যবস্থা থাকলেও আপামর জনসাধারণের জন্য কেবল রুটি, বিয়ার, নোনতা মাছ কিংবা খেজুরেই তা সীমাবদ্ধ ছিল। তবে উচ্চশ্রেণীর আয়োজনে সমাজে প্রায়শই বিভিন্ন ধর্মীয় কিংবা অন্য যেকোন উপলক্ষে অনুষ্ঠানের আয়োজন হত যেখানে গরীব এবং সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য ভাল খাবারের ব্যবস্থা থাকত।
শস্য : নীলনদের তীরে জমা হওয়া পলি মাটি এবং নদের পানিকে চাষাবাদের প্রক্রিয়ায় কাজে লাগানোর কারণে মিশরে প্রচুর শস্য ফলত। যব এবং গমের বিভিন্ন চিত্রও প্রাচীন মিশরের বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া যায়। গমের রুটির পাশাপাশি যব গাঁজন প্রক্রিয়ায় বিয়ার বানানো হত।
ওয়াইন : নীলনদের প্রভাবে মিশরীয় ব্যবসা বাণিজ্য বেশ প্রসার লাভ করে। ভূ-মধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে মিশরীয়রা আঙুর সংগ্রহ করে নিজেরা উৎপাদন শুরু করে। এই আঙুর দিয়ে তারা নিজস্ব পদ্ধতিতে ওয়াইন তৈরি করত যা তখন খুব জনপ্রিয় ছিল অভিজাত শ্রেনীর মধ্যে। লাল রঙের এই ওয়াইন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হত।
ফলমূল :
খাবারের ব্যাপারে মিশরীয়রা বরাবরই ছিল আলাদা যত্নশীল। ছবি : শর্ট হিস্টোরি ওয়েবসাইট
উর্বর মাটির কারণে তরমুজ, খেজুর, ডালিম, আপেল ইত্যাদি ফলমূলের চাষ হত প্রাচীন মিশরে। পাশাপাশি পেয়াজ, লেটুস, ছোলা এবং বিভিন্ন রকমের ডাল এবং সবজিও ফলত প্রচুর।
মাংস : গরু, ভেড়া, ছাগল ইত্যাদি প্রাণীকে গৃহপালিত হিসেবে বিবেচনা করা হত যার থেকে মুলত দুধ আহরণ করা হত। অভিজাত শ্রেণীদের মধ্যে শিকারে যাবার প্রবণতা থাকলেও মাংস খাবার হিসেবে খুব জনপ্রিয় ছিল না তখন। তবে এর মধ্যে রাজ পরিবারগুলোতে গরুর মাংস খাওয়ার প্রচলন ছিল।
মাছ : নীলনদ থেকে মাছ ধরা যেত বলে আপামর জনসাধারণের নিকট মাছ গুরুত্বপূর্ন আমিষের উৎস ছিল। অন্যদিকে মাংসের প্রচলন বেশি থাকায় মাছের কদর কম ছিল অভিজাতদের নিকট।
পাখি : প্রাচীন মিশরে হাঁস, কোয়েল, কবুতর আর পেলিকানস ইত্যাদির ডিম এবং মাংস প্রচলিত ছিল। জানা যায় খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ কিংবা পঞ্চম শতাব্দীর আগে মিশরে মুরগীর তেমন উপস্থিতি ছিল না।
মসলা এবং মিষ্টি : মসলা হিসেবে মিশরীয়দের মধ্যে জুনিপার, মৌরি, ধনিয়া, জিরা, মেথি আর পোস্ত ইত্যাদি ব্যবহারের প্রচলন ছিল। এছাড়া রান্নায় ভিনেগারও ব্যবহৃত হত। খাবার মিষ্টি করার ক্ষেত্রে ধনীরা মধু ব্যবহার করত যা ছিল খুবই দামী অন্যদিকে সাধারণ জনগন ব্যবহার করত বিভিন্নরকমের ফল। আর লবণ পাওয়া যেত সিওয়া ওয়াসিস থেকে। প্রচলিত এক কিংবদন্তীর কারণে মিশরীয়রা সামুদ্রিক লবপণ ব্যবহার করতেন না। মিশরের উর্বর মাটিতে উৎপাদিত মসলা লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে বাণিজ্যের উপকরণ হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। এছাড়া প্রাচীন মিশরে 'উপত্যকার খাদ্যোৎসব' নামে একটি উৎসবের আয়জন করা হত। এই উৎসবে মশাল জ্বেলে তারা খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করত এবং বিশ্বাস করত এই ভোজ উৎসবে মৃতদের সাথে জীবিতদের পুনরায় সাক্ষাত হয়। মিশরীয়রা পিরামিডে স্থাপিত মমির সাথে পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবার ও পানীয় সরবারহ করতেন, তারা বিশ্বাস করতেন পুনরায় জীবিত হয়ে মমিরা সেসব খাবার গ্রহণ করবেন।
তথ্যসূত্র : http://khaidai.co https://bn.eferrit.co https://www.ancient-origins.net