মওরো মোরান্ডি ও ৩১ বছর যাবৎ নির্জন দ্বীপবাস

ট্রাভেল বাংলাদেশ: চোখ বন্ধ করে অনুভব করতে হয় প্রকৃতির সৌন্দর্য : মোরান্ডি

মওরো মোরান্ডি। বুদেল্লি দ্বীপ

মওরো মোরান্ডি। ছবি : মিশেল আর্দু


 বিশ্বজুড়ে কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাসের প্রভাবে স্থবির হয়ে পড়ছে প্রায় ২০০টিরও অধিক দেশ। কয়েক মিলিয়ন মানুষকে বাধ্যতামূলকভাবে কাঁটাতে হচ্ছে আইসোলেশনে বা কোয়ারেন্টাইনে। মহামারী মোকাবেলায় মানুষের এই নির্বাসিত জীবন দু-দিনেই অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে যেখানে, একবার ভাবুন তো সেখানে একটা লোক একটানা গত ৩১ বছর যাবত স্বেচ্ছা নির্বাসনে রয়েছে! বিচিত্র এই মানুষটার নাম মওরো মোরান্ডি (Mauro Murandi)। চলুন জেনে আসা যাক মওরো মোরান্ডির নির্জন দ্বীপ বাসের চমকপ্রদ ঘটনাটি নিয়ে। ঘটনার শুরু ১৯৮৯ সালে। সাগরে বেড়াতে এসে মোরান্ডির ক্যাটামারানের ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেলে ভাসতে ভাসতে তিনি এসে পৌঁছন বুদেল্লি দ্বীপে। ভূ-মধ্যসাগর অঞ্চলের ইতালির সারদিনিয়া ও করসিকা দ্বীপের মাঝে অবস্থিত এই বুদেল্লি দ্বীপ (Budelli Island)। ভূ-মধ্যসাগরের অধীনে মাদ্দালিন দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে ৭টি দ্বীপ রয়েছে। পিংক আইল্যান্ড (Pink Island) বা গোলাপি দ্বীপ খ্যাত বুদেল্লি দ্বীপ এই দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে অনন্য এবং পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ ছিলও তখন। নিজের সৌন্দর্য ও রূপ মাধুর্যে বুদেল্লি মওরো মোরান্ডির মন জয় করে নেয় মুহূর্তেই। দ্বীপের নির্জনতা আর বিশাল সমুদ্রের নীল জলরাশির গর্জন মোরান্ডিকে প্ররোচনা দিতে থাকে। কপাল ও ভালো বলা যায়। মোরান্ডি এখানে পৌঁছেই জানতে পারেন দ্বীপের একমাত্র কেয়ারটেকার অবসরে যাচ্ছেন তবে তখন পর্যন্ত নতুন কেয়ারটেকার নির্বাচন করা হয় নি। আর এই সুযোগই লুফে নেনে মোরান্ডি। নিয়ে নেন কেয়ারটেকারের চাকরী। নিজের নৌকা বিক্রি করে এখানেই থাকতে শুরু করেন। এক দুই করে আজ এতোগুলো বছর তিনি এখানে কাটিয়ে দেন একাকী, নির্জনতায় এবং মাঝেমধ্যে পর্যটকদের সংস্পর্শে।

মওরো মোরান্ডি। বুদেল্লি দ্বীপ

মওরো মোরান্ডি। ছবি : মিশেল আর্দু


মোরান্ডির একাকী এই বসবাস তাঁকে দিয়েছে প্রকৃতির প্রতি উদার এই দৃষ্টিভঙ্গি এবং জীবনের ভিন্ন অর্থ। এই দ্বীপে বসবাস সম্পর্কে মোরান্ডী যেমন বলেন,
'I’m sort of in prison here, But it's a prison that I chose for myself.'
একাকী এই বাসে পর্যটকদের প্রকৃতি এবং এর রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে সচেতন করে থাকেন মোরান্ডি। পাশাপাশি প্রচুর বই পড়েন তিনি। আর সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে তার নির্জনতার মধ্য দিয়ে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকেন তিনি। এভাবেই সময় কেটে যায় তার। প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করা নিয়ে তিনি বলেন,
'I would like people to understand that we must try not to look at beauty, but feel beauty with our eyes closed.'
প্রকৃতির নির্জনতা ও এর সৌন্দর্যের মাঝে জীবনের নতুন এক রূপ উন্মোচন করেন মোরান্ডি। সময় বয়ে চলে তার এভাবেই। এক বন্ধুর সহায়তায় দু-সপ্তাহ পরপর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আনিয়ে নেন শহর থেকে। এখানে এসে নিজের উপার্জনের নতুন উপায় ও খুঁজে নিয়েছেন মোরান্ডি। জুনিপার গাছের কুঁড়ি দিয়ে তিনি বিভিন্ন ভাস্কর্য নির্মাণ করেন এবং এগুলো বিক্রি করেন পর্যটকদের নিকট। একাকী নির্জন দ্বীপে বাস করেন বলেই যে পুরো পৃথিবী থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেছেন তা একেবারেই নয়। প্রযুক্তির কল্যাণে বুদেল্লিতে যখন ওয়াইফাই আসে মোরান্ডি তাঁকে বরণ করে নেনে সহজেই। যুক্ত থাকেন পুরো বিশ্বের সাথেই। নিজের উপার্জিত অর্থ দান করেন আফ্রিকা থেকে তিব্বতের বিভিন্ন এনজিওতে। এছাড়াও সময় ও ঋতুর কল্যাণে এই অপরূপ দ্বীপের যে রূপের পরিবর্তন ঘটে তা ফটোগ্রাফির মধ্য দিয়ে বিশ্বের মানুষদের নিকট তুলে ধরেন তিনি।



মওরো মোরান্ডি : মিশেল আর্দু


ঝামেলাহীন মোরান্ডির এই নির্জনবাসে ২০১৬ সালে হুট করেই ঝামেলার মুখোমুখি হতে হয়। দ্বীপটির মালিকানা নিয়ে নিউজিল্যান্ডের এক ব্যবসায়ী ও ইতালির সরকারের মধ্যে চলমান দ্বন্ধের অবসান ঘটে আদালতের রায়ে। দ্বীপের মালিকানা ইতালি সরকার বলেই আদালত রায় দেয়। তবে, সমস্যা হয় মানুষের বসবাস নিষিদ্ধ এই দ্বীপে মোরান্ডির থাকা না থাকার অনুমতি নিয়ে। মোরান্ডি কি আসলেই এখানে থাকতে পারবেন কিনা সে নিয়ে প্রশ্ন উঠে। এগিয়ে আসে স্থানীয় জনগণ। তবে, প্রায় ১৮ হাজার মানুষের স্বাক্ষরিত পিটিশনে মোরান্ডির দ্বীপবাস স্থায়ী হয়। এই দ্বীপের মুগ্ধতা তাঁকে এমনভাবেই প্রভাবিত করে যে ৮১ বছর বয়স্ক মোরান্ডি বলেন,
'I will never leave. I hope to die here and be cremated and have my ashes scattered in the wind'
মওরো মোরান্ডি। বুদেল্লি দ্বীপ

মওরো মোরান্ডি। ছবি : মিশেল আর্দু


প্রকৃতির মাঝেই নিজের শরীরকে বিলিয়ে দিতে চান তিনি। কেননা আমরা প্রত্যেকেই একই শক্তির উৎস এবং প্রকৃতির অংশ বলে তিনি বিশ্বাস করেন। আর এই বিশ্বাসকে চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেন তিনি ঠিক এভাবে…
'Love is an absolute consequence of beauty, and vice versa. When you love a person deeply you see him or her as beautiful, but not because you see them as physically beautiful … you empathize with them, you’ve become a part of her and she’s become a part of you. It’s the same thing with nature.'

  সাখাওয়াত হোসেন   এস এম