মায়া নগরী মুম্বাই : দ্বিতীয় পর্ব

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : এক রহস্যময় মমত্ববোধ যে শহরকে ঘিরে রেখেছে



গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া, মুম্বাই।

গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া, মুম্বাই। ছবি : দীপন দাস


যে কোনো অসমাপ্ত কাজই আশাপূরণের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। তাই, মুম্বাই ঘুরে দেখার অসমাপ্ত গল্প শেষ করতে কথা মতোই আবার ফিরে আসা নতুন উদ্যমে। সিদ্ধি বিনায়ক, লক্ষ্মী টেম্পল, হাজী আলী শেষে বান্দ্রা ফোর্টের রহস্যের জাল ধরে জুহু চৌপট্টি আর ভার্সোভা বিচের সমুদ্র-গর্জন ছাপিয়ে এখনও 'ভালোবাসা বাকি' থেকে যায় এই শহরের আনাচে-কানাচে।

এলিফ্যান্টা কেভ

এবারের প্রথম গন্তব্য হয়ে ওঠে প্রাচীনতার মালভূমি, ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ 'এলিফ্যান্টা কেভ'। পর্তুগিজরা হাতির ছবি দেখে এর নাম দেয় 'এলিফ্যান্টে' যা থেকে পরবর্তীতে হয় 'এলিফ্যান্টা'। মুম্বাই শহরের দশ কিলোমিটার পূর্বের এই দ্বীপে পৌঁছনোটাও কোনও রোমাঞ্চের থেকে কিছু কম নয়। আরব সাগরের মধ্যে ঘন্টাখানেকের দুলুনিতে শুধু ভেসে চলার তাগিদটুকু থাকে। স্টিমার থেকে নেমে গুহাতে পৌঁছাতে পেরোতে হয় কয়েকশো সিঁড়ি। তখন ক্লান্ত হওয়া মানা।


ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ 'এলিফ্যান্টা কেভ'

ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ 'এলিফ্যান্টা কেভ'। ছবি : দীপন দাস


প্রায় দেড় হাজার বছর আগের তৈরী সেই নিদর্শন শুধু হাতছানি দিয়ে ডাকছে। এই হাতছানির বৈচিত্র্যে হিন্দু এবং বৌদ্ধ ধর্মের মিলিত সহাবস্থান প্রত্যক্ষ হলেও আসলে শেষ কথা বলে যায় স্থাপত্যকলার অমলীন জাদুগরী। সৃষ্টি-স্থিতি-বিনাশনং ত্রিমূর্তি সদাশিবের পর নটরাজ, যোগীশ্বর, বৌদ্ধ-স্তূপ মাথা তুলে জানান দিচ্ছে প্রস্তর-কীর্তির নীরবতা। এক লহমায় কেটে যায় কয়েকটা ঘন্টা। স্টিমারে আরও একবার 'নীল জল দিগন্ত ছুঁয়ে' এবারে শহরে ফেরার পালা।

গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া

ব্রিটিশ রাজাধিরাজ পঞ্চম জর্জ-এর ভারত আগমনের স্মৃতিতে নির্মিত 'গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া'র কোলজুড়ে তখন বিকেলের পড়ন্ত সূর্য কমলা আভায় জলছবি আঁকছে এক দগদগে আধিপত্যের। সেই আধিপত্যে স্টিমার নোঙর হওয়ার পর তাজ হোটেলের সৌন্দর্য চোখে নিয়ে এবার হাঁটতে থাকা নামী-বেনামী পথ ধরে। পথের বাঁকে চোখে পড়ে 'লিওপোল্ড ক্যাফে' যার শরীরে আজও জ্বলজ্যান্ত হয়ে আছে ২৬/১১-এর জঙ্গি হানার ক্ষত। সেই ক্ষতের চাদরে মুড়েই বেঁচে থাকা গানে-আড্ডায়-স্যান্ডুইচ আর কফিতে। কারণ এই শহরকে বেঁচে থাকতে হয়-এই শহর, 'যারা হটকে, যারা বাচকে, ইয়ে হ্যায় বম্বে মেরি জান'।


এলিফ্যান্টা কেভ, মুম্বাই।

এলিফ্যান্টা কেভ, মুম্বাই। ছবি : দীপন দাস



Queen's Necklace মেরিন ড্রাইভ

তাই, বাঁচতে চাওয়ার গল্পের শেষ পলকে থাকে Queen's Necklace মেরিন ড্রাইভ। কখনও দুপুরে, কখনও বিকেলে, কখনও রাত করে-বারবার ছুটে যেতে হয় এক অকারণ সুন্দরের জয়গানে সামিল হতে। প্রেম-আড্ডা-শরীরচর্চা-বিরহ-স্ট্রিটলাইট-ন্যাচারাল'স-এর আইসক্রিম- আর কয়েকটা এলোপাথাড়ি ঢেউ; মেঘ ছাড়া হঠাৎ করে বৃষ্টি নামায়-'গুঞ্জাসা হ্যায় কোই ইকতারা ইকতারা, গুঞ্জাসা হ্যায় কোই ইকতারা'। 'বাওয়ারা' মন নিয়েই এবারে বাড়ি ফিরতে হবে। ফিরতে হবে দুর্বার গতির সেই শহর থেকে যে গতির বাতুলতায় রয়েছে সফলতার সাতকাহন, আধিপত্যের আর্তি। তবে এই গতির অলক্ষ্য পলকে 'বেঁচে থাকা'র কাছে হারিয়ে যায় 'ভালো থাকা'র গল্পগুলো, হারিয়ে যায় মরশুমের প্রথম বর্ষার প্রেম, হারিয়ে যায় ট্রেনের জানলার ধারে বসার অনাবিল আনন্দগুলো।


ছবি : দীপন দাস

এলিফ্যান্টা কেভ, মুম্বাই। ছবি : দীপন দাস


তাই খালি পড়ে থাকা জানলার ধার উদাসীনতার হাওয়ায় পার্থক্য খোঁজে 'জীবন' নামের সারমর্মে। আর মায়ামাখা দিনের শেষে একলা থেকে যায় আমাদের শহর 'মুম্বাই' -- কারণ, 'মিলতা হ্যায় ইয়াহা সবকুছ, এক মিলতা নেহি দিল'।  

দীপন দাস   এস এম