রহস্যেঘেরা পৃথিবীর যত ভয়ঙ্কর দ্বীপ

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : শরীরে কাঁপন ধরানো একেকটা দ্বীপ

মার্কিন পারমাণবিক বোমা পরীক্ষাগার ও হাঙ্গরের তাণ্ডবে আতঙ্কে পরিণত হওয়া এক দ্বীপ

মার্কিন পারমাণবিক বোমা পরীক্ষাগার ও হাঙ্গরের তাণ্ডবে আতঙ্কে পরিণত হওয়া এক দ্বীপ। ছবি : ক্রসরোড
দ্বীপ নামটি শুনলেই চোখে ভাসে নীলের মাঝে এক টুকরো সবুজের ছোঁয়া। চোখধাধানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং হিম শীতল পরিবেশ আপানকে মনকে উৎফুল্ল করার জন্য পর্যাপ্ত। নির্জনে ছুটি কাটানোর জন্য দ্বীপের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের তাই তুলনা মেলা ভার। কিন্তু সুন্দর হলেই যে নিরাপদ হবে তা কিন্তু নয়।

পৃথিবীতে এমন অনেক জায়গা রয়েছে যেখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আপনাকে মোহিত করলেও রয়েছে বিশেষ সতর্কবার্তা। তা স্বত্তেও মানুষ ভ্রমণ করতে চায়, রোমাঞ্চের স্বাদ গ্রহণ করতে চায়। আর সেটাই কারো কারো জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। কেউ হয়তো জীবনের মহামূল্যবান কিছু হারিয়ে আসে, আবার কেউ কেউ জীবনটাই হারিয়ে ফেলে। সেসব ভয়ঙ্কর দ্বীপগুলো নিয়েই কথা বলছি যেখানে ঘুরতে যাওয়ার আগে আপনাকে ভাবতে হবে হাজারবার।

১. ইলা দে কুইমাদা গ্রান্দে, ব্রাজিল :

সাপ দিয়ে পরিপূর্ণ দ্বীপ ইলাদা কুইমাদা, ব্রাজিল। ছবি :

সাপ দিয়ে পরিপূর্ণ দ্বীপ ইলা দে কুইমাদা গ্রান্দে, ব্রাজিল। ছবি : সাও পাওলো
ইলা দে কুইমাদা গ্রান্দে, ব্রাজিলের সাওপাওলো উপকূলে অবস্থিত এই দ্বীপটির আরেকনাম স্নেক আইল্যান্ড। ৪ লাখ ৩০ হাজার  বর্গমিটারজুড়ে বিস্তৃত এই দ্বীপে প্রায় ২০ লক্ষ সাপের বাস। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬৩৫ ফুট উপরে অবস্থিত এই দ্বীপটির প্রতি স্কয়ার মিটারে পাঁচটি সাপের দেখা পাবেন।

এই দ্বীপে কয়েক প্রজাতির সাপ বাস করে। গোল্ডেন ল্যান্সহেড ভাইপার্স, বিশ্বের অন্যতম বিষধর প্রজাতির সাপই যার মধ্যে বেশী পাওয়া যায়। স্নেক আইল্যান্ডের সাপগুলো অন্যান্য সাপের চেয়ে পাঁচগুণ বেশী বিষধর হয়ে থাকে। শুধুমাত্র ব্রাজিলিয়ান নেভিদেরই এই দ্বীপটিতে যাওয়ার অনুমতি আছে। কথিত আছে, বহুকাল আগে এই দ্বীপে একটি বাতিঘর বানানো হয়। যেখানে একজন ব্রাজিলিয়ান নেভি সপরিবারে থাকতেন। সাপের দংশনে পুরো পরিবারটি মারা যায়। তারপর থেকে জনসাধরাণের জন্য নিষিদ্ধ করা হয় দ্বীপটি।

মিয়াকে জিমা দ্বীপের সর্বদা গ্যাস মাস্ক পরিহিত বাসিন্দারা।  ছবি :

মিয়াকে জিমা দ্বীপের সর্বদা গ্যাস মাস্ক পরিহিত বাসিন্দারা। ছবি : আর্থলি মিশন
২. মিয়াকে জিমা, জাপান : মানুষ প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে চায় নির্মল বাতাস গ্রহণ করার জন্য। কেমন হবে আপনি যদি এমন জায়গায় ঘুরতে যান যেখানে সর্বক্ষণ মুখে একটি গ্যাস মাস্ক পরে থাকতে হবে? আপনি অবশ্যই ভাবছেন পৃথিবীর ভেতরে এমন কোনো জায়গা আছে নাকি। হ্যাঁ, পৃথিবীতে এমন জায়গাও রয়েছে।

জাপানের ইজু দ্বীপপুঞ্জগুলোতে অবস্থিত মিয়াকেজিমা দ্বীপটির বৈশিষ্ট্যটি হল সক্রিয় আগ্নেয়গিরি। মাউন্ট ওয়ামা নামের আগ্নেয়গিরিটি বিগত ৫০০ বছরে ১৩ বার বিস্ফোরিত হয়েছে। ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণের ফলস্বরূপ ১৭,৫০০ বার ভূমিকম্প হয়েছে দ্বীপটিতে। সর্বশেষ বিস্ফোরণের পরে, ২০০৫ সালে, আগ্নেয়গিরি থেকে ক্রমাগত বিষাক্ত গ্যাস বের হচ্ছে, যার ফলে বাসিন্দাদের সর্বদা গ্যাস মাস্ক ব্যবহার করতে হয়।

ছবি : সাবা ট্যুরিজম

ছবি : সাবা ট্যুরিজম
৩. সাবা, নেদারল্যান্ডস এন্টিলস : ঘূর্নিঝড়ের প্রিয় আবাসস্থল যেন নেদারল্যান্ডস এন্টিলসের এই দ্বীপটি। অবাক হলেন? ক্যারিবিয়ান হারিকেন নেটওয়ার্কের ওয়েবসাইট অনুসারে, সাবা নামের এই ছোট্ট দ্বীপটি গত ১৫০ বছরে এত বেশি বার তীব্র ঘূর্নিঝড়ের কবলে পড়েছে যা ঐ অঞ্চলের আর কোনও দ্বীপে ঘটেনি।

৪. বিকিনি এটোল, মার্শাল আইল্যান্ড : ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ মতে এই দ্বীপরি দুটি কারণে বিপজ্জনক: পারমাণবিক বিকিরণ এবং হাঙ্গর। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫৮ সালের মধ্যে ২০টিরও বেশি পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার স্থান ছিল এটি। ১৯৯৭ সালে এই দ্বীপকে 'নিরাপদ' হিসাবে ঘোষণা করা হলেও - আদি বাসিন্দাদের অনেকেই ফিরে আসতে অস্বীকার করেছিল। বিস্ফোরণের কারণে জায়গাটি এতটাই বিষাক্ত যে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য না খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সরকার।



ছবি : সংগৃহীত
সুতরাং গাছ থেকে পড়া হাজারো নারিকেল মাটিতে পচে দূষিত করছে দ্বীপটিকে। বিগত ৬৫ বছরে এই অঞ্চলে মাছের সংখ্যা উল্লেখ্যযোগ্য হারে কমেছে। যার একমাত্র কারন সমুদ্রের তলদেশে হাঙ্গর বৃদ্ধি। মৎস ভক্ষণের পাশাপাশি সমুদ্রে আসা বহু জাহাজের নাবিক নিহত হয়েছে এই হিংস্র হাঙরের কারণে।

৫. গ্রুইনার্ড আইল্যান্ড, স্কটল্যান্ড : স্কটল্যান্ডের উত্তরদিকে অবস্থিত এই ছোট দ্বীপটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহার করা হয়েছিলো ব্রিটিশ সরকারের জৈবিক যুদ্ধ পরীক্ষার জন্য। অ্যানথ্রাক্স ভাইরাসের প্রতিষেধক পরীক্ষণের জন্য দ্বীপটি ব্যবহার করা হয়। জনশূন্য দ্বীপে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর ফলে শত শত ভেড়া মারা গিয়েছিল।



ছবি : সংগৃহীত

পরবর্তীতে দ্বীপটিতে জনমানব প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। আশির দশকে এই দ্বীপটিকে পুনরুদ্ধার করা হয়। শত শত টন ফর্মালডিহাইড ব্যবহার করা হয়-যা দ্বীপটিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ তুলে।

৬. ফারাল্লন আইল্যান্ড, ইউএসএ : ১৯৪৬ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে স্যানফ্রান্সিসকো উপকূলে ফারালন দ্বীপপুঞ্জের চারপাশের সমুদ্রকে তেজস্ক্রিয় বর্জ্যে ফেলার জায়গা হিসাবে ব্যবহৃত হত। আনুমানিক ৪,৭৫,০০৫০ গ্যালন (প্রায় ২৮০ লিটার) ইস্পাত ড্রামগুলো এখানে ফেলে দেয়া হয়েছিল তবে তাদের সঠিক অবস্থান এবং তা পরিবেশের ঠিক কতটুকু ঝুঁকিপূর্ণ তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।



ফারাল্লন আইল্যান্ড, ইউএসএ। ছবি : উইকিপিডিয়া
বিজ্ঞানীদের ধারণা তেজস্ক্রিয় পদার্থ অপসারণের চেষ্টা করতে গেলে তা আরও ব্যাপক ক্ষতির কারণ হতে পারে। এখানে বিশাল সংখ্যক সিন্ধুঘটকের বাস, যা দ্বীপটির হিংস্র সাদা হাঙরকে উন্মত্ত করে রাখে। তাই দ্বীপটিতে যাওয়ার আগে ভেবে দেখুন, বেঁচে ফিরে আসতে পারবেন তো?

৭. রামরি আইল্যান্ড, মিয়ানমার : মায়ানমারের উপকূলে অবস্থিত এই দ্বীপটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ ঘটনার সাক্ষী হয়ে রয়েছে। ১৯৪৫ সালে, ব্রিটিশ এবং জাপানি সেনাদের মধ্যে লড়াইয়ের পরে, আনুমানিক ৪০০ জন জাপানী সৈন্যকে দ্বীপটির আশেপাশের জলাভূমিতে পালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছিলো। আর সেখানে ছিলো লবণাক্ত জলের কুমিরের বিশাল গোষ্ঠীর বাস। গিনেস বুক অফ রেকর্ডস অনুসারে, ঘটনাটি হল প্রাণী আঘাতে দ্বারা বিশ্বের ভয়ানক মৃত্যু।



গাঁ ছমছমে দৃশ্য রামরি আইল্যান্ড, মায়ানমার। ছবি : পিন্টারেস্ট
৮. ডেঞ্জার আইল্যান্ড, মালদ্বীপ : মালদ্বীপের ৮০০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত ড্যাঞ্জার দ্বীপটির নাম শুনলেই বুঝায় যায় এটি ভয়ঙ্কর কোনো জায়গা হবে। আসলে দ্বীপটি এতটাই ভয়ঙ্কর যে আপনি যে জাহাজ বা লঞ্চ করে যাবেন সেটি নোঙর ফেলার কোনো স্থান পাবেননা দ্বীপটিতে। যার ফলে দ্বীপটিতে আসতে তো পারবেন কিন্তু আদৌও ফিরতে পারবেন কিনা কি বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।