উপকূলে শুঁটকির পরিচর্যায় ব্যস্ত এক নারী; ছবি : সংগৃহীত
ভোজন রসিকদের কাছে খুবই মজার ও আকর্ষণীয় এক খাবার শুঁটকি। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে জনপ্রিয় খাবার শুঁটকি। ভোজন রসিকদের কাছে খুবই মজার ও আকর্ষণীয় এক খাবার শুঁটকি। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে জনপ্রিয় খাবারটি। আগে দামে সস্তা থাকায় শুঁটকিকে গরীবের খাবার হিসেবে তাচ্ছিল্য করা হতো।
কিন্তু এখন শুঁটকির দামের বৃদ্ধির পাশাপাশি বদলেছে অবস্থানও।
এখন শুঁটকি দেশের বিভিন্ন নামিদামি রেস্টুরেন্টসহ বিলাসবহুল হোটেলেও শুঁটকির উপস্থিতি দেখা যায়। ফলে এক সময়ের গরীবের শুঁটকি এখন চড়া দামের কারণে মধ্যবিত্ত ও গরীবের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকলে তাজা মাছ সহজেই পচে যায়।
খাদ্য সংরক্ষণের এক প্রাচীন পদ্ধতি হল খাদ্য শুকানো। শুঁটকি বা মাছকে রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ তেমনই একটি পদ্ধতি যাতে মাছকে রোদে রাখা হয় পানি অপসারণের জন্য। কারণ পানির কারণেই বিভিন্ন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুজীব বেঁচে থাকে এবং মাছকে পঁচাতে সহায়তা করে।
খোলা জায়গায় বাতাস এবং রোদ ব্যবহার করে মাছকে শুকানোর প্রথা অনেক প্রাচীন কাল থেকেই চলে আসছে। সাধারণত পানিকে বাতাস, রোদ, ধোঁয়া ইত্যাদির সাহায্যে শুকানো হয় কিন্তু বরফ দ্বারা শুকানো পদ্ধতিতে খাদ্যকে প্রথমে বরফ করা হয় তারপর জল বের করা হয়। ব্যাকটেরিয়া, ইষ্ট এবং মোল্ড বেড়ে উঠার জন্য পানি প্রয়োজন এবং জলকে পরিপূর্ণ রূপে শুকানো হলে খাদ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব। মাছকে এভাবে সংরক্ষণ করার জন্য শুকানো, ধোঁয়ার ব্যবহার এবং লবণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
সবচেয়ে পুরনো এবং সহজ পদ্ধতি হল মাছকে বাতাস ও রোদে শুকানো। শুকনো মাছের আয়ুষ্কাল কয়েক বছর পর্যন্ত হতে পারে। এই পদ্ধতি সবচেয়ে সহজ, কমদামী এবং কার্যকর হয় অনুকূল আবহাওয়াতে। জেলে বা তার পরিবারের সদস্যরা এই কাজ সাধারণত করে থাকে এবং তা সহজেই বাজারজাত করতে পারা যায়।
লইট্টা মাছের শুঁটকি; ছবি : বেশিদেশী ডট কম
শুঁটকির উৎপাদন
বাংলাদেশে উৎপাদিত শুঁটকির একটি বড় অংশ উৎপাদন হয় কক্সবাজারে। আগে কক্সবাজারে বেশ কয়েকটি শুঁটকির গ্রাম ছিল। কিছু দরিদ্র মানুষ শুটকি তৈরি ও বিপণনের সঙ্গে জড়িত ছিল। এখন শুঁটকি উৎপাদন হয় বাণিজ্যিকভাবে, বিশাল কলেবরে।
শুঁটকি বিক্রির জন্য একসময় কক্সবাজারের টেকপাড়া, রুমালিরছড়া, কানাইয়ার বাজার ও বিমানবন্দর সড়কের মুখে ফুটপাতে বেশকিছু দোকান ছিল। এখন এর পাশাপাশি বিক্রিতে এসেছে আভিজাত্য। পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ বার্মিজ মার্কেটের অভিজাত দোকান, হোটেল-মোটেল জোন, লাবণী বিচ মার্কেট, কলাতলীসহ বিভিন্ন পয়েন্টে দেখা যায় সু-দৃশ্য শুঁটকির দোকান।
দেশি-বিদেশি পর্যটকরা এসব দোকান থেকে শুঁটকি সংগ্রহ করেন।
কক্সবাজার জেলার উপকূলীয় এলাকা মহেশখালীর সোনাদিয়া, গোরকঘাটা, তাজিয়াকাটা, কুতুবজোম, কুতুবদিয়া উপজেলার বড়ঘোপ, খুদিয়ারটেক, আলী আকবর ডেইল, অংজাখালী, পশ্চিম ধুরুং, টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ, সেন্টমার্টিন, জালিয়াপাড়া, সদর উপজেলার নাজিবারটেক, খুরুশকুল, সমিতিপাড়া, চৌফলদণ্ডিসহ বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় বিপুল পরিমাণ শুটকি তৈরি হয়।
এসব শুঁটকির মধ্যে সামুদ্রিক রূপচাঁদা, ছুরি লাক্কা, কোরাল, সুরমা, লইট্যা, চিংড়ি এবং মিঠাপানির মাছের মধ্যে শোল, কাচকি, কুচো চিংড়ি, মলা, গইন্যা, বাইলা, ফাইস্যাসহ প্রায় ২০ প্রজাতির মাছের শুঁটকি হয়। কক্সবাজারে শুঁটকি শুকানোর সবচেয়ে বড় মহাল কক্সবাজার শহর সংলগ্ন পশ্চিম সাগরের তীরে নাজিরারটেক। এটি নতুন চর এলাকা। বছরজুড়ে এখানে চলে শুঁটকি মাছের উৎপাদন। প্রায় শত একরের বিশাল এলাকাজুড়ে শত শত বাঁশের মাচায় নানা জাতের মাছ শুকানো হয়।
নাজিরাটেক ঘুরে দেখা গেছে, কেজি প্রতি লাক্ক্যা শুঁটকি বিক্রি হচ্ছে ১২শ' টাকায়। এক একেকটি লাক্ক্যা শুঁটকির ওজন হয় ৫/৬ কেজি।
এছাড়া রূপচাঁদা বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১,২৫০ টাকা, কালাে চান্দা ৬০০ টাকা কেজি দরে। লইট্যা শুটকি প্রতি কেজি ২৫০-৩০০, ছুরি মাছের শুঁটকি ৪০০ টাকা কেজি, কোরাল কেজি প্রতি ৮০০ টাকা, পোয়া ২০০ টাকা কেজি, শােল ৭০০ টাকা কেজি, সুরমার কেজি ৪৫০ টাকা, গইন্যা শুঁটকি ৩০০ টাকা।
এছাড়া, ইলিশ শুঁটকি ৩০০, কামিলা ২৮০ টাকা, ইছা (চিংড়ি) ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা, ফাইস্যা শুঁটকি ১৫০, অলুয়া শুঁটকি ১২০ টাকা, মইল্যা শুঁটকি ১৪০ টাকা, কাঁচকি শুঁটকি ২২০- ২৫০ টাকা ও পাঁচমিশালী ১০০-১৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপে জানা গেল, শুঁটকি রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে বাংলাদেশ।
স্বাধীনতার পর ৭২-৭৩ সালে শুঁটকি রপ্তানি থেকে যেখানে সরকারের আয় হতো ১৭ হাজার ৯০০ টাকা, সেখানে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে শুঁটকি রপ্তানি করে আয় হয়েছে ৩০ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। তবে, বর্তমানে এর পরিমাণ অর্ধশত কোটি টাকারও বেশি। আমরা যারা ভ্রমণপিপাসু কক্সবাজারে যাই, একটু কষ্ট হলেও ওই শুঁটকি পল্লী দেখে আসা উচিত।