বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : বাংলার মাটি ও মানুষের সাথে জড়িয়ে আছে যে নাম
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
মুক্তির দিশারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছবি : ফাইন ভেক্টর আর্ট
বাংলাদেশের স্বাধীনতার থেকে শুরু করে আমাদের মুক্তির ইতিহাসে যে মানুষটার নাম না থাকলে বাংলাদেশের সম্পূর্ণ ইতিহাস পরিপূর্ণ হবে না তিনি হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বলা হয় শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মহানায়ক। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের মানুষের জন্য মুক্তির দিশারী। ১৭ই মার্চ ১৯২০ সালে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় শেখ মুজিবুর রহমান জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম শেখ লুৎফর রহমান এবং মায়ের নাম সায়রা বেগম। ছয় ভাই ও বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তিন নম্বর। ১৯৩৮ সালে ১৮ বছর বয়সে তিনি বেগম ফজিলাতুন্নেসার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের ঘরে দুই কন্যা সন্তান এবং তিন পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। ছোটবেলা থেকেই তিনি বাংলার মাটি ও মানুষের প্রতি অসম্ভব ভালবাসা তৈরি করতে পেরেছিলেন। যেকোনো সময়ই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেন এবং বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের অনন্য সংগ্রামের প্রতীক। বাংলাদেশ পূর্বে পরাধীন এক জাতি ছিল। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠী এই দেশ শাসন করেছে। বর্বর এবং অসহনীয় নির্যাতন মানুষ সব সময় সহ্য করে এসেছে। সেই মানুষের পাশে দাড়িয়ে ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। পরাধীন জাতিকে স্বাধীনতার সুখের মুখ দেখাতে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা ছিল অপরিসীম।
মায়ের সাথে মুজিব। ছবি : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন বহু বছর আগে থেকেই। প্রায় ২০০ বছর ব্রিটিশদের শাসনের পর ভারতবর্ষের দুটি ভাগ হলো। একটি পাকিস্তান এবং অন্যটি ভারত। সেসময়ে শেখ মুজিবের বয়স ছিল ২৭ বছর। ১৯৪০ সালে ভারত মুসলিম ফেডারেশনে যুক্ত হন। সেখানেই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে পরিচয় লাভ করেন। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সব অংশে তিনি রেখেছেন অসামান্য কৃতিত্বের পরিচয়। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক। মূলত পঞ্চাশের দশকে রাজনীতিতে তিনি বেশি দৃষ্টিপাত করেছিলেন, পরবর্তীতে ধীরে ধীরে তিনি একজন দক্ষ রাজনৈতিক নেতা হয়ে উঠলেন। ১৯৬৬ সালে বাংলাদেশে সামরিক শাসক আইয়ুব খানের শাসনে চলছিল। তখন অত্যাচারের মাত্রা যেন আরও কয়েকগুণ বেড়ে চলেছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এখন পর্যন্ত এমন কোনও রাষ্ট্র পাওয়া যায়নি যেখানে সামরিক শাসনের মাধ্যমে সেই দেশ ভালো অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছে কিংবা সেই দেশের মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে পেরেছে। পূর্ব পাকিস্তানের জন্যও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নানা বঞ্চনার শিকার হয়ে ধুকে ধুকে এদেশের মানুষ জীবন পরিচালনা করছিল।
১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের জন্য স্বায়ত্তশাসনের দাবি করেন। ছয় দফা দাবি ছিল বাঙালি জাতির মুক্তির দাবি। ১৯৬৬ সালের ৬ দফা দাবির জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ আওয়ামী লীগের সকল নেতাকর্মীদের জেলে প্রেরণ করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমানকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামি করা হয়। এমন অবস্থায় পূর্ব পাকিস্তান আন্দোলনে আরও ফেটে পরে। তারা কিছুতেই এই বিষয়টি মেনে নিতে পারল না। সেই মুহূর্তে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিল ছাত্ররা। তারা ১১ দফা দাবি নিয়ে মাঠে নামে। সেসময়ে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী জেলের বাইরে ছিলেন। তিনি ছাত্রদের সহযোগিতা করার জন্য এগিয়ে এলেন। এই আন্দোলন এতটাই প্রকট ছিল যে আন্দোলন থামানোর জন্য কোনো ধরনের শক্তি কাজে লাগছিল না। মানুষ মারা যাচ্ছিল, আহত হয়েছিল কিন্তু আন্দোলন থেমে ছিলনা। পরবর্তীতে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হয় কিশোর মতিউর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আসাদ। পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালের ২৫ শে মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দেয়া হয়।
শেখ হাসিনার সাথে বঙ্গবন্ধু। ছবি : মুজিব
আইয়ুব খানের পরে ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় আসেন। ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় এসে প্রথম সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা করে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে ১২ ই নভেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের এক প্রলয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। সে ঘূর্ণিঝড়ে এই দেশে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ মারা যায়। এত বড় আঘাতের পরও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কোন ধরনের কোনো সাহায্য আসলো না। ১০ লক্ষ মানুষ মারা যাওয়ার পরেও যে মানুষগুলো বেঁচে ছিল তারা খাদ্যের অভাবে, সাহায্যের অভাবে অনেকেই মৃত্যুবরণ করল। পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি বিদ্বেষ যেন এই বিষয়গুলো আরও বেশি বাড়িয়ে দিয়েছিল। মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এক বিক্ষোভে স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান দাবি করেন একটি সভায়। মানুষের বিক্ষোভের মুখে পরে পরবর্তীতে সাধারণ নির্বাচন হল। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের সরকার সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল দেখে হতবাক হয়ে পরলেন।
তাদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পরল। ১৬২ আসনের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জয়লাভ করেন ১৬০টি আসনে। পাকিস্তানের মোট ৩১৩টি আসনে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে ১৬৭টি আসনে। পশ্চিম পাকিস্তানের জুলফিকার আলী ভুট্টোর দল পিপলস পার্টি জয় লাভ করে ৮৮ টি আসনে এবং অন্যান্য দলগুলো জয়লাভ করে ৫৮ টি আসনে। অর্থাৎ ফলাফল থেকে এই দাঁড়ায় পূর্ব-পাকিস্তান পরবর্তীতে শাসন করবে। এই বিষয়টি পশ্চিম পাকিস্তান সরকার কখনোই গ্রহণ করতে পারেনি। তারা সিদ্ধান্ত নিতে থাকলো যেভাবেই হোক পূর্ব পাকিস্তানকে শাসনের ভার দেওয়া যাবে না।
ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণকালে জাতির পিতা। ছবি : দা ডেইলি স্টার
১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে বিশাল জনসভায় উদ্দেশ্যে ঘোষণা করেন, 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম'। মহান নেতার ঐতিহাসিক ভাষণে সমগ্র বাংলার মানুষ আরো জাগ্রত হয়ে উঠে, পুরো দেশ উত্তাল হয়ে ওঠে। শেখ মুজিবুরের নেতৃত্বে বাঙালি জাতির জাগরণ সর্বত্র ছড়িয়ে পরে। পৃথিবীর ইতিহাসে ৭ই মার্চের মত ভাষণের নজির পাওয়া দুষ্কর। ৭ ই মার্চের গণজমায়েতে মানুষজন যেন তাদের মনের কথাই শেখ মুজিবুর রহমানের মুখ থেকে শুনতে পারছিলেন। এর মধ্যেই ইয়াহিয়া খান গনহত্যার প্লেন করছিলেন।
১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চের কাল রাতে নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালির ওপর পাকিস্তানি সেনারা ঝাঁপিয়ে পরেছিল। ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড পাকিস্তানি সেনারা পরিচালনা করেছিল। শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত কেউই তাদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। এরই মধ্যে ধানমন্ডির বাসভবন থেকে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে জেলে প্রেরণ করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করার আগেই তিনি বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। ঘোষণাটি ইপিআর ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে সারাদেশে প্রচার করা হয়। বঙ্গবন্ধুর পক্ষ হতে পরবর্তীতে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান আবারও স্বাধীনতার ঘোষণা চট্টগ্রাম থেকে রেডিওর মাধ্যমে পুরো দেশের প্রচার করেছিলেন। তখন যখন পূর্ব পাকিস্তান নামে আর কোনো দেশ রইল না। তাই ২৬শে মার্চ'কে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস বলা হয়। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর অবশেষে আমরা বিজয় অর্জন করি। এই মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ বাঙালি প্রাণ দেয় এবং ২ লাখ মা,বোন তাদের সম্ভ্রম হারায়। ১৬ই ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ-ভারত মিত্র বাহিনীর কাছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পন করে। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু তার স্বদেশে ফিরে আসেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে একযোগে কাজ শুরু করেন। ১৯৭২ সালের ১২ই জানুয়ারি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। যেখানে তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ পুনর্গঠনে কাজ করে যাচ্ছিলেন, এরই মধ্যে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র সক্রিয় হয় ওঠে। বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারেন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দেশের উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। তাই তিনি ১৯৭৪ সালে সকল রাজনৈতিক দলকে একসাথে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল)।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কলঙ্কময় দিনে লুটিয়ে আছেন জাতির পিতা। ছবি : এশিয়ান এজ
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তারা নির্মমভাবে হত্যা করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবারের সকল সদস্যকে। কেবলমাত্র তাঁর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সেসময়ে দেশের বাহিরে ছিলেন। সদ্য স্বাধীন হওয়া বাঙালি জাতির জীবনে এই দুর্বিষহ আঘাত এক অপূরণীয় ক্ষতি করে। বঙ্গবন্ধুকে হারিয়ে বাঙালি জাতি হয়ে যায় পুরোপুরি নিঃস্ব। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জীবনে একটি কলঙ্কময় দিন। এই দিনটি জাতীয় শোক দিবস হিসেবে বাঙালি জাতি পালন করে আসছে। তিনি আজীবন বাঙালির কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সত্যিকারের সোনার বাংলা তৈরি করতে চেয়েছিলেন। আমাদের সেই প্রয়াসে সামনে এগিয়ে চলা উচিত যেন বঙ্গবন্ধুর লালিত স্বপ্ন সোনার বাংলা তৈরি করতে পারি।