বাঙালির ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্প শীতলপাটি

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : মহারানী ভিক্টোরিয়ার রাজসভায় জায়গা করে নিয়েছিল বাংলাদেশের শীতলপাটি

শত বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্প শীতলপাটি। ছবি : ডেইলি মোশন


শিল্পীর হাতের নিপুন ছোঁয়ায় তৈরিকৃত শীতলপাটি সারা বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। আমাদের দেশের ঢাকাই মসলিনের নামডাক যেমন পৃথিবীখ্যাত তেমনই শীতলপাটির নাম সারা বিশ্বে ছড়িয়ে রয়েছে। শীতলপাটির নাম-ডাক শত বছরের পুরনো। এটি লালন করে আছে আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে। শুধুমাত্র পাটি বিছিয়ে খাবার-দাবার খাওয়ার জন্যই নয়, শীতল পাটিতে গা এলিয়ে দিয়ে বিশ্রাম করলে এক প্রকার শান্ত ও স্নিগ্ধ অনুভূতিতে শরীর ছেঁয়ে যায় যার কারণেই এর নাম হয়েছে শীতলপাটি। শীতলপাটি মূলত সিলেটেই বেশি তৈরি করা হয়ে থাকে। বহু বছর পূর্বে সিলেটের তেঘরিয়া গ্রামের শীতলপাটি মহারানী ভিক্টোরিয়ার রাজসভায় জায়গা করে নিয়েছিল। মুঘল দরবারে শীতলপাটির সচরাচর ব্যবহার ছিল। মুর্শিদকুলি খাঁ মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবকে বেতের বাহারি কারুকাজ করা শীতলপাটি উপহার দিয়েছিলেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন সিলেটে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন তিনি শীতলপাটিতে মুগ্ধ হয়েছিলেন। এমনকি যাবার সময় কোলকাতাতেও কিছু শীতলপাটি নিয়ে গিয়েছিলেন। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, কালের পরিক্রমায় শীতলপাটি বর্তমানে নিভু নিভু আলো নিয়ে জ্বলছে। কিন্তু তা কখনোই কাম্য নয়।

সরকারি ব্যবস্থাপনায় ছাড়াও নিজ উদ্যোগে এই শিল্পকে সংরক্ষণ করা একান্তই কাম্য। প্লাস্টিকের যত্রতত্র ব্যবহারের ফলে এবং কম দামের কারণে বেশিরভাগ মানুষই প্লাস্টিক ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু প্লাস্টিক শুধুমাত্র সুলভ মূল্যে পাওয়া যায় বলেই এর ব্যবহার ভালো এমনটি কিন্তু নয়, এতে করে আমাদের পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। অথচ শীতলপাটি আমাদের পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয়। আর প্লাস্টিক পরিবেশের জন্য হুমকি স্বরূপ যা শীতলপাটি নয়। তবে আনন্দের বিষয় হলো ২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ইউনেস্কো শীতল পাটি বুননকে 'ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ' (Intangible Cultural Heritage)-এর তালিকা সিলেটের শীতলপাটিকে স্থান দিয়েছেন। এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়।

গীতেশ চন্দ্র দাস এবং হরেন্দ্র কুমার দাশ কর্তৃক প্রদর্শিত শীতলপাটি। ছবি : সংগৃহীত

মাটির ঘরে মেঝেতে শীতল পাটি সাধারণত ব্যবহার করা হয়ে থাকে। গ্রামাঞ্চলে শীতলপাটি বেশি ব্যবহৃত হয়। তবে শহরাঞ্চলেও এর ব্যবহার লক্ষ্যনীয়। সাধারণ পাটি এবং শীতলপাটির মূল তফাৎ হচ্ছে সাধারন পাটিতে নানা ধরনের নকশা করা যায়না কিন্তু শীতলপাটিতে খুব সুন্দরভাবে নিখুঁত নকশা করা যায়। গরমের দিনে শীতলপাটি বিছিয়ে আরাম করলে শীতল অনুভূতিতে শরীর জুড়িয়ে যায়। শীতলপাটি মূলত তৈরি হয় মুর্তা বা পাটিবেত থেকে। এর অন্য নাম মোস্তাক।  সিলেটে প্রাকৃতিকভাবেই মুর্তা গাছ তৈরি হয়। মুর্তা বন থেকে এই গাছ সংগ্রহ করা হয়। পরবর্তীতে এর ছাল থেকে শীতলপাটি তৈরি করা হয়। এছাড়াও মুর্তা গাছ ঢাকা, কুমিল্লা এবং চট্টগ্রামের নিম্নাঞ্চলে জন্মে থাকে। তবে, সেই সকল অঞ্চলে দক্ষ পাটিয়াল নেই বলে সিলেটে শীতলপাটি বুনন বেশি হয়ে থাকে। পাটি বুননের কাজে নিয়োজিত মানুষকেই পাটিয়াল বলা হয়। সিলেটের বিভিন্ন পরিবার তাদের বংশপরম্পরায় এই কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। সিলেটের ১০০ গ্রামের প্রায় চার হাজার পরিবার শীতলপাটি বুননের কাজ করে থাকেন।

কীভাবে তৈরি হয় শীতলপাটি :

মুর্তা গাছ সংগ্রহ করা। ছবি : সংগৃহীত

প্রথমত মুর্তা গাছ সংগ্রহ করে এর ডালপালা ছেটে পরিস্কার করে পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। পানিতে ভেজানোর পর এর ছাল থেকে পাটিবেত তৈরি করা হয়। পাটিবেত যত সুক্ষ্ম এবং পাতলা হবে শীতলপাটি ততো মসৃণ এবং সুন্দর হবে। পাটিবেত থেকে পরবর্তীতে আঁটি বাধা হয়। আঁটি খুব সুন্দর ভাবে বেঁধে তা পানিতে সাথে ভাতের মাড় দিয়ে চুবিয়ে রাখা হয়। পানি এবং ভাতের মাড়ের সংমিশ্রণে জারুল, আমড়া, তেঁতুল গাছের পাতাসহ বিভিন্ন গাছের পাতা সিদ্ধ করা হয়ে থাকে। গাছের পাতা দিয়ে সিদ্ধ করার ফলে শীতল পাটির সহন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। সেই সাথে অনেক উজ্জ্বল এবং চকচকে হয়ে ওঠে। এরপর বিভিন্ন রং পানিতে মেশানো হয়। তারপর দক্ষ হাতের ছোঁয়ায় বেতির পর বেতি দিয়ে সংযুক্ত করে তৈরি হয় শীতলপাটি। শীতলপাটির দৈর্ঘ্য ৭ ফুট এবং প্রস্থ ৫ ফুট হয়ে থাকে।

শীতলপাটি বুনন। ছবি : সংগৃহীত

শীতলপাটির বিভিন্ন নাম রয়েছে যেমন : সিকি, আধুলি, টাকা, নয়নতারা, আসমান তারা প্রভৃতি।

সিকি পাটি : এই পাটির নাম সিকি রাখা হয়েছে মূলত এর চমৎকার মসৃণতার জন্য। বলা হয়ে থাকে এটি এতটাই মসৃণ যে সাপ ও এর ওপর দিয়ে চলাচল করতে পারে না। সিকি পাটি তৈরি করতেও বেশ সময় লাগে প্রায় চার থেকে ছয় মাস।

আধুলি পাটি : আধুলি পাটের চাহিদা অন্যান্য পাটির তুলনায় বেশি। এর চমৎকার কারুকাজের জন্য এই পাটি বেশ সমাদৃত। আধুলি পাটি তৈরি করতে সময় লাগে প্রায় তিন থেকে চার মাস।

টাকা পাটি : এটি দেখতে বেশ বড় এবং শক্ত পোক্ত। এই তৈরি করতে সময় লাগে ছয় মাসের বেশি। এটি এতটাই মজবুত যে ২০ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত অনায়াসে ব্যবহার করা যায়।

সাধারণ নকঁশী পাটি :

ছবি : সংগৃহীত

আমরা বর্তমানে সচরাচর যে নকঁশা পাটি ব্যবহার করে থাকি, দক্ষ পাটিয়ালরা এক থেকে দুই দিনের মধ্যেই এটি তৈরি করতে পারেন। নকঁশী পাটির দাম ২ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। বর্তমানে শিল্পায়নের যুগে শীতলপাটির কারিগররা অনেকটাই পিছু হটেছেন। প্লাস্টিক পণ্য বাজারজাতকরণ অনেকটাই সহজলভ্য এবং কম মূল্যে পাওয়া যায়। প্লাস্টিকের সাথে প্রতিযোগিতা করে অনেক পাটের কারিগররাই তাই তাদের পেশা পরিবর্তন করে ফেলেছেন। স্থানীয় বাজারে এর চাহিদা কমে যাওয়ায় শীতলপাটি তৈরির ব্যবসা অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে।

ছবি : সংগৃহীত

পূর্বের তুলনায় জনসংখ্যার অতিরিক্ত বৃদ্ধির ফলে মানুষ ঝোঁপঝাড় দখল করে ঘরবাড়ি বানিয়ে বসবাস করছে। এতে করে বনাঞ্চল কেটে ফেলার কারণে মুর্তা গাছ আর আগের মত পাওয়া যায় না। তবে আশার বিষয় এই যে সিলেটের বিখ্যাত দুই জন পাটিয়াল গীতেশ চন্দ্র দাস এবং হরেন্দ্র কুমার দাস পুরো বিশ্ব দরবারে আমাদের ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটিকে তুলে ধরেছেন। যার কারণে ইউনেস্কোর নজরে এসেছে শত বছরের পূর্বের ঐতিহ্য শীতলপাটি। শীতলপাটির যথাযথ সংরক্ষণ না করা হলে একদিন কালের গর্ভে সম্পূর্ণই হারিয়ে যাবে। হয়তোবা তখন এর দেখা মিলবে জাদুঘরে কিংবা দুই-একটা সংগ্রহশালায়। তাই প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে শীতলপাটির ব্যবহার আরও বৃদ্ধি করা উচিত।