অবাক করা হাজার বছর আগের প্রাচীন প্রকৌশল চিহ্ন : সিগিরিয়া

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : শতাব্দীর যাত্রারম্ভে নির্মিত কীর্তিস্তম্ভ শ্রীলংকার এই স্থান

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩৭০ মিটার উঁচুতে শ্রীলংকার সিগিরিয়া। ছবি : এক্সোটিক ভয়েজ 

ধরুন, আপনি এমন কিছু চিত্রকর্ম, নিখুঁত কারুকাজ কিংবা বিশেষ প্রকৌশলবিদ্যায় তৈরি পানির ফোয়ারা, চমৎকার নালা দেখলেন। স্বভাবতই মনে হবে হয়তো আধুনিক সময়কালের কথা। মনে হবে সাম্প্রতিক যুগের শুরুতে কিংবা সাম্প্রতিক সময়ে হয়তো পারদর্শী প্রকৌশলীরা এটি তৈরি করেছিলেন। কিন্তু যদি বলা হয়, এটি কোনো সাম্প্রতিক সময়ের কাজকর্ম নয়। এটি হাজার বছরের পুরনো সভ্যতার নিদর্শন। অবাক না হয়ে থাকা অসম্ভব। তেমনই একটি জায়গা সিগিরিয়া। বলা হয়, পৃথিবীর প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক ও প্রকৌশলের নৈপুণ্যে পরিপূর্ণ জায়গা শ্রীলংকার সিগিরিয়া।

অতি বৃহৎ ও চমৎকার এই নিদর্শন শ্রীলংকার ডাম্বুরা ও হাবারোনী শহরের মধ্য বরাবর একটি দ্বীপে অবস্থিত। এটিকে দেখা যায় একটি বৃহৎ পাথরের মালভূমির ওপর যা কিনা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩৭০ মিটার উঁচুতে। প্রাচীন প্রাসাদের প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব ও আকর্ষণের কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক এখানে আসেন। সম্ভবত শ্রীলংকার বিভিন্ন পর্যটন স্থানের মধ্যে সবথেকে বেশি পর্যটক সিগিরিয়াতে ভ্রমণ করে থাকে। হাজার বছরের পুরনো সভ্যতার নিদর্শন, সিগিরিয়া। ছবি : এটরাকশন ইন শ্রীলঙ্কা[/caption] সিগিরিয়া পাথর মালভূমির উৎপত্তি হয়েছে মৃত আগ্নেয়গিরি থেকে যেটি আশেপাশের জঙ্গল থেকে ২০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। এটির  চমৎকার অবয়ব পর্যটকদের আকর্ষণ করে। প্রকৃতি এবং মানুষের অভিবাসন মধ্যকার যে সম্পর্ক তা আকর্ষিত হওয়ার মতোই। এখানে রয়েছে জটিল প্রকৃতিতে তৈরি ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি রাজ্যের অবশিষ্টাংশ। এটি পরিবেষ্টিত হয়েছে পারস্পরিক সংযুক্ত দূর্গ, বিস্তৃত বাগান, পুকুর, খাল, উদ্যান পথ এবং পানির ফোয়ারা দিয়ে। সিগিরিয়ার আশেপাশের স্থানিক জায়গাগুলো হাজার বছর ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। তৃতীয় শতাব্দিতে পাথরের এই মালভূমি সন্ন্যাসীদের আশ্রম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। পঞ্চম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে কাশিয়াপা নামক রাজা এখানে একটি রাজকীয় আবাসন তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন। তার মৃত্যুর পর ১৪তম শতাব্দি পর্যন্ত সিগিরিয়া পুনরায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের আশ্রম স্থান হয়ে পরে। [caption id="attachment_27441" align="alignnone" width="1280"] সিংহের গঠনে সিগিরিয়ার প্রবেশদ্বার, শ্রীলংকাছবি : ইসকেপ

সিগিরিয়া শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে 'সিহাগড়ি' থেকে যার অর্থ সিংহের শিলা। সিগিরিয়ার প্রধান প্রবেশদ্বারটি পাথরের উত্তর দিকে অবস্থিত। এটি ডিজাইন করা হয়েছে পাথরের ওপর সিংহের গঠনে। এর নিম্নাংশ এখনো টিকে আছে। কিন্তু উপরের অংশ এবং মাঝখানের দেহের অংশ ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। সিংহদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এই জায়গাটির নাম দেয়া হয়েছিল সিগিরিয়া। নগ্ন মহিলাদের চিত্রকর্ম। ছবি : সংগৃহীত

পশ্চিমাংশের প্রাচীরটি সম্পূর্ণ ঢাকা দেয়ালচিত্র দিয়ে যেটি রাজা কাশিয়াপার শাসন আমলে তৈরি হয়েছিল। এখন পর্যন্ত ১৮টি দেয়াল চিত্র টিকে আছে। প্রাচীরের চিত্রগুলো নগ্ন মহিলাদের উপস্থাপন করে। ধারণা করে নেয়া হয় চিত্রকর্মগুলো রাজা কাশিয়াপার পত্নী এবং উপপত্নীদের অথবা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নিয়োজিত ধর্মযাজিকাদের। নারীদের পরিচয় অজানা থাকা সত্বেও অনন্য প্রাচীন এই চিত্রকর্মগুলো নারীদের সৌন্দর্য্য উপস্থাপন করে এবং এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য অপরিসীম। সিগিরিয়ার আকর্ষণীয় আয়না দেয়াল। ছবি : সংগৃহীত 

সিগিরিয়ার এত আকর্ষণীয় বিষয়ের মাঝে সবথেকে লক্ষণীয় আকর্ষণ এর আয়না দেয়ালের (Mirror Wall) অবয়ব । এই দেয়ালটি অঙ্কিত করা হয়েছে আগতদের বিভিন্ন খোদাই করা লিপি এবং চমৎকার কবিতা দিয়ে। আশ্চর্যের বিষয় হলো এখানে সবচেয়ে পুরনো লিপির সময়কাল প্রায় অষ্টম শতাব্দীতে। অর্থাৎ খোদাইকৃত লিপিগুলো প্রমাণ করে সিগিরিয়া হাজার বছর পূর্বেও পর্যটন স্থান হিসেবে ছিল। কিন্তু বর্তমানে দেয়ালে অঙ্কন করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

সিগিরিয়ার ইমারত এবং বাগানগুলো প্রদর্শন করে যে অবিশ্বাস্য প্রত্নতাত্ত্বিক কীর্তি স্তম্ভের উদ্ভাবক অত্যন্ত সৃষ্টিশীলতা ও উদ্ভাবনী কৌশল প্রয়োগ করেছিলেন। পৃষ্ঠ থেকে ২০০ মিটার উঁচু বিস্তৃত পাথরের ওপর এই ধরনের কীর্তিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য প্রয়োজন আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক এবং প্রকৌশল বিদ্যায় দক্ষতা। সিগিরিয়ার বাগান। ছবি : পিন্টারেস্ট

পৃথিবীর মধ্যে সবথেকে পুরনো ভূদৃশ্য সিগিরিয়ার বাগান। সিগিরিয়াতে রয়েছে জলের বাগান, গুহা, পাথরের বাগান এবং সিঁড়ি বাগান। এগুলো সবই পশ্চিম দিকে অবস্থিত। আর সাথে রয়েছে জটিল প্রকৃতির জল প্রবাহের পদ্ধতি, হ্রদ, বাঁধ, ব্রিজ, পানির ফোয়ারা। সেই সাথে দেখা মিলবে ভূতল ও ভূগর্ভস্থ পানির পাম্প।

এখানে বর্ষাকালে পানির নালাগুলো পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। আর এই পানি সম্পূর্ণ সিগিরিয়ার পরিভ্রমণ করে। সিগিরিয়ার ফোয়ারাগুলো পঞ্চম শতাব্দীতে তৈরি হয়েছিল। ধারণা করা হয়, পৃথিবীর মধ্যে সবথেকে প্রাচীন ফোয়ারা এগুলো। পৃথিবীর মধ্যে সবথেকে প্রাচীন ফোয়ারা, সিগিরিয়া। ছবি : শ্রীলংকা  ট্যুর হাব 

অত্যাধুনিক নগর সভ্যতা পরিকল্পনার সবথেকে জোরালোতম উদাহরণ সিগিরিয়ার রাজপ্রাসাদ এবং এখানকার জটিল আকৃতির দূর্গ। সিগিরিয়ার অতুলনীয় ঐতিহাসিক নিদর্শনস্বরূপের জন্য ইউনেস্কো ১৯৮২ সালে এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের জায়গা হিসেবে ঘোষণা করেছে। নগর সভ্যতা পরিকল্পনা, পানির ফোয়ারা, প্রকৌশলবিদ্যা, উদ্যানবিদ্যা এবং চিত্রকর্মের জন্য সিগিরিয়া প্রতিদ্বন্দ্বীহীন নিদর্শন।

কীভাবে যাবেন : বাংলাদেশ থেকে শ্রীলংকা এয়ারলাইন্সে ১২ ঘন্টা ৩৫ মিনিটে শ্রীলংকার বিমানবন্দরে পৌঁছতে পারবেন। এক্ষেত্রে আপনার খরচ পড়বে ৭,৮০০ টাকা থেকে ৪২,০০০ টাকা পর্যন্ত। এরপর সরাসরি ট্যাক্সিতে করে ১ ঘন্টা ৩৪ সিগিরিয়ায় পৌঁছতে পারবেন। ট্যাক্সিতে আপনার খরচ পরবে ১,৫০০ টাকা থেকে ২,০০০ টাকা পর্যন্ত।

কোথায় থাকবেন : সিগিরিয়ার নিকটে অসংখ্য হোটেল রয়েছে থাকার জন্য। খরচ হবে প্রতি রাতের জন্য প্রায় ১,২০০ টাকা থেকে শুরু করে ৪,০০০ টাকা পর্যন্ত।

কোথায় খাবেন : সিগিরিয়াতে খাবারের রেস্টুরেন্টে সু-স্বাদু শ্রীলংকান খাবার পরিবেশন করা হয়। সব খাবারই একদম টাটকা এবং লোভনীয়। খাবারের মূল্যও বেশ কম।

লক্ষনীয় বিষয় :

  • সিগিরিয়া আরোহন করা কিছুটা শ্রমসাধ্য হবে কিন্তু কঠিন নয়। আপনাকে প্রায় ১২০০ ধাপ অতিক্রম করে পৌঁছতে হবে।
  • ভ্রমণ করার জন্য হালকা সুতির পোশাক পরিধান করার চেষ্টা করুন।
  • সিগিরিয়া ঘোরার জন্য সর্বোত্তম সময় সকাল ৭টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত।
  • যদি গ্রীষ্মকালে ঘুরতে যান সে ক্ষেত্রে আরও সকালে ভ্রমণ করতে যাওয়াই শ্রেয়। কেননা পরবর্তীতে অধিক সূর্যের তাপে আপনার অসহ্যবোধ সৃষ্টি হতে পারে।