গ্লাডিয়েটরদের বীরত্ব, নিরোর ইতিহাস ও রোমান সাম্রাজ্যের টিকে থাকার প্রতীক 

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : রোমানদের সহস্র বছরের বীরত্বগাঁথা এই স্থাপত্যের নির্মাতা সম্রাট ভেসপাসিয়ান

colosseum
ছবি : প্ল্যানেট ওয়ার
 

কলোসিয়ামের অবস্থান ইতালির রোম শহরে। ফ্ল্যাভিয়ান এম্ফিথিয়েটার নামে এটি পরিচিত ছিল। তবে, লোকমুখে এটি বেশি পরিচিতি ছিল কলোসিয়াম নামেই। এটি ছিল রোমান শাসন আমলে নির্মিত সবচেয়ে বড় থিয়েটার। যার ধারণ ক্ষমতা ছিল ৫০ হাজার দর্শক। প্রদর্শিত হত গ্ল্যাডিয়েটরদের প্রতিযোগিতা। অসহায় যুদ্ধবন্দি দাসদের ক্ষুধার্ত বাঘ ও সিংহের সাথে লড়াই করার জন্য ছেড়ে দেয়া হত এম্ফিথিয়েটারে। এভাবে প্রাণহানি হত হাজারো দাসের। কলোসিয়ামের নির্মাণকালকে দু-ভাগে ভাগ করা যায়। নির্মাণ শুরুর কাল এবং নির্মাণ শেষ কাল।  ধারণা করা হয়, ৭০ থেকে ৭২ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে কলোসিয়াম নির্মাণকাজ শুরু হয় সম্রাট ভেসপাসিয়ানের শাসন আমলে। নির্মাণকাজ শেষ হয় সম্রাট তিতুসের হাত ধরে ৮০ খ্রিষ্টাব্দে। বর্তমানে আমরা কলোসিয়ামের বহির্তোরণের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ দেখতে পাই। সম্রাট তিতুসের পরবর্তী শাসকদের অবহেলা এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পরিণতির শিকার হয় এম্ফিথিয়েটারটি। এছাড়াও বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিপর্যয় যেমন-অগ্নিকাণ্ড এবং ভূমিকম্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কলোসিয়ামের বাকি অংশ। রোমান সাম্রাজ্যের এই অঞ্চলটি খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় অব্দ থেকেই বেশ ঘনবসতিপূর্ণ ছিল। বসবাস ছিল হাজারো মানুষের। কিন্তু হঠাৎ এক অগ্নিকাণ্ড পুরো এলাকাকে পুড়িয়ে ছাই করে ফেলে।

ভস্মীভূত হয়ে যায় সম্পূর্ণ এলাকা। প্রাণহানি হয় হাজারো মানুষের। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হয় বিপুল। ধারণা করা হয়, অগ্নিকাণ্ডটি ষষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের দিকে ঘটেছিল। সেসময় আগমন ঘটে সম্রাট নিরোর। কলোসিয়ামের ইতিহাস রটনা তাঁর হাত ধরেই। তাই তো কলোসিয়ামের ইতিহাস ঘাটতে গেলে প্রথমেই চলে আসে সম্রাট নিরোর নাম। সমগ্র এলাকা নিজের অধীনে নিয়ে নেন তিনি। সমগ্র উপত্যকা সাজাতে থাকে নিজের মন মত। সাহায্য করা শুরু করেন অগ্নিকাণ্ডে বিপন্ন হওয়া মানুষদের। বানানো হয় একটি প্রাসাদ। নাম দেয়া হয় 'ডোমাস ওরিয়া'। যার অর্থ স্বর্নালী প্রাসাদ। প্রাসাদের চারদিকে করা হয় বাগান, কৃত্রিম লেক এবং বসার স্থান। করা হয় প্যাভিলিয়নের ব্যবস্থা। প্রাসাদের সামনে প্রতিস্থাপন করা হয় নিরোর বিশালাকার ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটির নামকরণ করা হয় 'কলোসাস অব নিরো' নামে। পরবর্তীতে এই কলোসাস থেকেই কলোসিয়াম নামটির উৎপত্তি হয় বলে অনেকেই ধারণা করেন। নিরোর পরবর্তী শাসকেরা তাদের নিজস্ব শাসনামলে ভাস্কর্য থেকে নিরোর মাথা সরিয়ে নিজেদের মাথা সংযোজন করেন। মধ্যযুগে এই ভাস্কর্যয়ের ধ্বংস প্রাপ্তির কথা ধারণা করা হয়। অনেকে আরও ধারণা করেন, ভাস্কর্যটি ব্রোঞ্জের তৈরি হওয়ায় সহজে একে গলিয়ে ফেলা হয়েছিল।

Interior-Colosseum-Rome
একটা সময় শাসকসহ হাজার মানুষের ভীড় হতো এইখানে। ছবি : ব্রিটান্নিকা
 

নিরোর শাসনকালের পর পরবর্তী শাসকদের কাউকে ডোমাস ওরিয়া নামক প্রাসাদটি ব্যবহার করতে দেখা যায়নি। যুগের পর যুগ অব্যবহৃত পড়ে থাকে প্রাসাদটি। ধীরে ধীরে ভঙ্গুর হয়ে পরতে থাকে এর দেয়াল। রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে সেই স্বচ্ছ পানির লেক ভরাট হয়ে যায় আবর্জনায়। বিলীন হয়ে যায় সেই বাগান। চুরি হয়ে যায় ডোমাস ওরিয়ার গায়ের দামি মার্বেল এবং অলঙ্কারসমূহ। নিরোর অবসানের অনেকপর আসেন সম্রাট ভেস্পিসিয়ান। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমান একজন শাসক। সিংহাসনে বসেই তিনি প্রথমে বেশ কিছু অঞ্চল যা নিরোর দখলে ছিল, তা জনগনের জন্য উম্মুক্ত করে দেন। নিরোর প্রাসাদকে গড়ে তোলেন গ্লাডিয়েটরিয়াল ফাইটের দুর্গ হিসেবে। গ্লাডিয়েটরদের জন্য সেখানে গড়ে তোলেন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। ব্যবস্থা করা হত হিংস্র জীব-জন্তুর সাথে গ্লাডিয়েটরদের লড়াই। দর্শকদের বসার জন্য করা হয় গ্যালারীর ব্যবস্থা।

দর্শকদের মনোরঞ্জনের স্বার্থে প্রদর্শিত হত স্থল-নৌযুদ্ধ, পশু শিকার সম্পর্কীয় নাটক। কলোসিয়ামকে ব্যবহার করা হতে থাকে প্রশিক্ষন কেন্দ্র, সৈন্যদের অস্থায়ী ব্যারাক, তীর্থযাত্রীদের আবাসন এবং বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে। এম্ফিথিয়েটারটি উপর থেকে দেখতে ইতালিয়ান পাঁচ পয়সার মত। আকৃতিতে উপবৃত্তাকার। যার উচ্চতা ৪৮ মিটার, দৈর্ঘ্য ১৮৮ মিটার এবং চওড়ায় ১৫৬ মিটার। প্রত্যেক তলায় ৮০টি করে তিনটি লেভেলে মোট ২৪০টি আর্চ রয়েছে। এম্ফিথিয়েটারে বসার স্থানটি কয়েকটি লেভেলে বিভক্ত ছিল। সম্রাট এবং সেকালের সিনেটাররা বসতেন প্রথম লেভেলে। রোমান অভিজাতরা বসতেন দ্বিতীয় লেভেলে। জনসাধারণের জন্য তৃতীয় লেভেলকে আবার তিন ভাগে ভাগ করা ছিল। ধনীরা বসতেন নিচের সারিতে। মাঝের সারিটি ছিল মধ্যবিত্তদের জন্য। আর দরিদ্র শ্রেণীর মানুষদের জন্য ব্যবস্থা করা হত উপরের সারিতে। তবে তাদের কোনো বসার সুবিধা থাকতো না। তারা দাঁড়িয়েই খেলা দেখতেন। এটি বহু আগের নির্মাণশৈলী হলেও আজও প্রকৌশলিরা স্টেডিয়াম নির্মাণে কলোসিয়ামের কাঠামো থেকে ধারণা নিয়ে থাকেন।

এম্ফিথিয়েটারটিতে সম্রাট ভেস্পসিয়ানের ছোট ছেলে তৈরি করেন ভূগর্ভস্থ হাইপোজিয়াম। মাটির নিচে খাঁচা তৈরি করে রাখা হতো বন্যপশু এবং অসহায় গ্ল্যডিয়েটদের। সেখানে রয়েছিল বিশাল বিশাল সুড়ঙ্গ। বর্তমানে কলোসিয়ামে ঘুরতে গেলে সেই খাঁচা এবং সুড়ঙ্গগুলো দেখে আসতে পারেন। কলোসিয়ামে 'ভেলারিয়াম' নামক শীততাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছিল। যার সাহায্যে দর্শকদের ঠাণ্ডা বাতাস সরবরাহ করা হত। এম্ফিথিয়েটারটিতে বাতাসের ব্যবস্থা রাখার জন্যই এই সৃজনশীলতার সৃষ্টি। দড়ি দিয়ে তৈরি করা হয় ভেলারিয়াম নামক ক্যানভাসের একটি আচ্ছাদন। আচ্ছাদনের মাঝে থাকত অসংখ্য ছিদ্র। বাতাস ধরে রাখার জন্য একটু ঢালু রাখা হত আচ্ছাদনটি। আচ্ছাদনটি দ্বারা কলোসিয়ামের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ঢেকে যেত। দাসরা প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে সেই দড়ি নিয়ন্ত্রণ করত। ঠাণ্ডা বাতাস খেতে খেতে গ্ল্যাডিয়েটরদের নিষ্ঠুর খেলা উপভোগ করত কলোসিয়াম ভর্তি জনগণ। কলোসিয়ামের কাঠামোর মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে ৪৪২ এবং ৫০৮ খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত দুটো ভূমিকম্প। এরপরও মধ্যযুগের কিছু ভূমিকম্প এবং অগ্নিকাণ্ডের ফলে ধসে পড়ে কলোসিয়ামের দেয়াল। ১৯ শতকের শুরুর দিকে দেয়াল ধস থেকে এম্ফিথিয়েটারটিকে রক্ষা করার জন্য প্রত্যেক কোনায় কিছু ত্রিকোনাকৃতির ইটের অংশ সংযোজন করা হয়েছে।

Colosseum-Rome-Italy
ছবি : ব্রিটান্নিকা[
 

গ্ল্যাডিয়েটর মুভি কে না দেখেছে, তাদের বর্বরতায় অবাকও হয়েছি। বেড়েছে আমাদের রোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাস জানার আগ্রহ। এই রোমান কলোসিয়ামের দর্শন ব্যতীত রোমে কোনও সফর সম্পূর্ণ হয় না। প্রাচীন সাম্রাজ্যের রোমের প্রতীক হিসাবে দাঁড়িয়ে আছে এটি। তাই সময় সুযোগ পেলে ঘুরে আসুন রোমান সাম্রাজ্যের এই আদি নিদর্শনটি।  


তথ্যসূত্র : https://www.history.com/topics/ancient-history/colosseum https://wanderwisdom.com/travel-destinations/The-Roman-Colosseum