তাকদা : মেঘপাহাড় ও ব্রিটিশ স্থাপত্যের অনবদ্য এক চায়ের দেশ

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : তাকদা, মেঘের দেশ দার্জিলিং এর মাঝে এক টুকরো স্বর্গ



Takdah দার্জিলিং

মেঘের দেশ তাকদা হতে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাবেন না, তবুও এখানকার অপার সৌন্দর্য সে অভাব ঘুচিয়ে দেবে। ছবি : বঙ্গোদর্শন ডট কম


 সৌন্দর্যের অনন্য উপাখ্যান দার্জিলিং এর রূপ সম্পর্কে কমবেশি সবাই জানেন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই শৈল শহরটি সবসময়ই পর্যটকদের বিমোহিত করে। অপরূপ পাহাড়ি অঞ্চল, চা বাগান, পুঞ্জীভূত মেঘের কণা ভেদ করে আঁকাবাঁকা পথ- সব মিলিয়ে দার্জিলিং হল সৌন্দর্যের রানী। পাহাড়ের গায়ে গায়ে গড়ে উঠা জনপদ আর চারপাশের অপার মাধুর্য এই পাহাড়ি কন্যাকে করেছে অনন্য।

তাকদা (Takdah)

হিমালয়ের কোলে অসাধারণ সৌন্দর্যের মেঘের এই দেশ ভ্রমণপ্রেমীদের ভীষণ পছন্দের জায়গা। দার্জিলিং অপার সৌন্দর্যের মাঝে এক টুকরো স্বর্গ হল তাকদা (Takdah)। দার্জিলিংয়ের মূল শহর থেকে প্রায় ৩০ কিমি দূরে তাকদার অবস্থান। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে তাকদার দূরত্ব ৬০ কিলোমিটার। স্থানীয় ভাষায় তাকদাকে বলা হয় ‘তুকদা’ যার অর্থ হল মেঘে ঢাকা। আবার লেপচা ভাষায় ‘তাকদা’ মানে কুয়াশা। পাহাড়ি ঢালে মেঘের কোলে সবুজে মোড়া এই গ্রামটি গ্রামীণ পর্যটনের সেরা জায়গাগুলোর মধ্যে অন্যতম। অপরূপ নিসর্গের জন্য এই জায়গাটি পর্যটকদের মনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। যদিও এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাবেন না, তবুও এখানকার অপার সৌন্দর্য সে অভাব ঘুচিয়ে দেবে।

আরও পড়ুন : মেঘালয়ের অত্যাশ্চার্য লিভিং রুট ব্রিজ: শিকড় দিয়ে সৃষ্টি হওয়া ব্রিজ





তাকদা, দার্জিলিং। ছবি : সংগৃহীত


দিগন্ত বিস্তৃত ঘন সবুজের সমারোহ , বিখ্যাত সব কোম্পানির সুদৃশ্য চা বাগান আর ব্রিটিশ বাংলোগুলো তাকদাকে করেছে অনন্য সৌন্দর্যের রানী।

চা বাগান

সবুজ পাহাড়ের কোলে অবস্থিত এই গ্রামে দার্জিলিং এর সবচেয়ে সুন্দর, পাহাড়ি ঢালে সুবিন্যস্ত চা বাগান রংলি-রংলিয়ট চা বাগান দেখতে পাবেন। এছাড়াও গিলে নামরিং, তিস্তা ভ্যালি চা বাগানও এখানে দেখতে পাবেন। চা বাগানের এই নৈসর্গের মাঝে নানা পাখির কলরবে ও শোভায় আপনার ছুটির দিনগুলো পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে অপার মুগ্ধতায়। সৌন্দর্যের এই লীলাভূমিটির জনপদ বেশ প্রাচীন।তৎকালীন বিহারের সোনপুরের মহারাজা ছুটি কাটানোর জন্য সুন্দর একটি বাংলো নির্মাণ করেছিলেন তাকদায়। কলোনিয়াল স্থাপত্যরীতিতে এই বাংলোটি গড়ে তোলা হয়েছিল। এরপর উনিশ শতকের গোড়ায় ব্রিটিশ কলোনির অন্যতম এক ঠিকানা হয়ে উঠেছিল এই তাকদা।

আরও পড়ুন : মেঘ, পাহাড় ও পাথরের মনোহর বিছানাকান্দি : সুমন্ত গুপ্ত


তাকদা Takdah দার্জিলিং

সবুজ পাহাড়ের কোলে অবস্থিত এই গ্রামে দার্জিলিং এর সবচেয়ে সুন্দর, পাহাড়ি ঢালে সুবিন্যস্ত চা বাগান রংলি-রংলিয়ট চা বাগান দেখতে পাবেন। ছবি : ডেইস হলিডে



সোনপুরের মহারাজের বাংলো

সোনপুরের মহারাজের বানানো বাংলো বাড়িটি তাদের প্রথম ঠিকানা হয়ে উঠে অবকাশ যাপনের জন্য। তারপর একে একে এই বাংলোটির আদলে এখানে আরও ছোটবড় প্রায় ১২টি বাংলো গড়ে তোলা হয়। এই সবগুলো বাংলোই কলোনিয়াল কায়দায় নির্মাণ করা হয়েছে। বাংলোগুলোর সৌন্দর্য যে কাউকেই মুগ্ধ করবে। এগুলোর স্থাপত্যশৈলী থেকে শুরু করে আসবাবপত্র, ভেতরের পরিবেশ সবকিছুতেই রয়েছে নান্দনিকতার ছাপ। এই বাংলোগুলির কোন কোনটির নিচে বিশ্বযুদ্ধের সময়কার লুকনো বাঙ্কারও পাওয়া গেছে। ১৯১৫ সালের দিকে সারা বিশ্বে তাকদা 'ব্রিটিশ ক্যান্টনমেন্ট এরিয়া' হিসেবে পরিচিতি পায়। মজার ব্যাপার হল তাকদায় পর্যটকদের থাকার জায়গাগুলো পাহাড়ের উপর দিকে করা হয়েছে। আর চা বাগান কর্মীদের থাকার স্থান পাহাড়ের নিচের দিকে। যা চা বাগানেরর খুব কাছেই। এখানকার অপূর্ব শোভা যেকাউকেই মুগ্ধ করবে। শান্ত-নীরব পরিবেশে এই গ্রাম এক অনন্য পাহাড়ি কন্যা।

আরও পড়ুন : উটি : তামিলনাড়ুর অপূর্ব এক শৈল শহর


Takdah দার্জিলিং

তাকদার তিস্তা ভ্যালি ভিউ পয়েন্ট থেকে তিস্তার ভিউ। ছবি : তমাল'স ব্লগ


 উঁচু উঁচু পা‌ইন গাছের জঙ্গল যেনও আকাশ ছোঁয়। আর তারা যখন ঢেকে যায় কুয়াশার চাদরে তখন সে সৌন্দর্য আরও বেশি নজরকাড়া হয়ে উঠে। এই গাছের সারির ভিতর দিয়ে আঁকাবাঁকা পথ চলে গেছে। উঁচু নিচু পাহাড়ের ঢালে চমৎকার সব সবুজ চা বাগানের সারি। এছাড়া রাস্তার দুই পাশ সাদা, গোলাপি এবং হলুদ রঙের ধুতরো ফুলের শোভায় ভরে থাকে সকলের নজর কাড়তে।

অর্কিড সেন্টার

তাকদা রয়েছে অর্কিড সেন্টার। তাকদা বাজার থেকে ৬ মাইল গেলেই এই অর্কিড সেন্টার পেয়ে যাবেন। যারা ফুল ভালোবাসেন তারা রং বেরংয়ের অর্কিড দেখে নিমিষেই মনটা প্রফুল্ল করে তুলতে পারবেন। এটি এশিয়ার সর্ববৃহৎ অর্কিড সেন্টার। এছাড়া রংলি- রংলিয়ট চা বাগান থেকে একটু নিচের দিকে ২ কিমি নামলেই ভনজং বাজার ক্রসিং ভিউ পয়েন্ট পেয়ে যাবেন। এই পয়েন্ট থেকে আপনি কালিম্পং, দুরপীন, টাইগার হিল, রাম্বি খোলা প্রভৃতি জায়গার চমৎকার ভিউ দেখতে পাবেন। যা আপনাকে মুগ্ধ করবেই। এছাড়া তাকদাতে ছোট একটি মনাস্ট্রিও আছে। এই মনাস্ট্রির শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশ আপনাকে দিবে প্রশান্তির অনুভূতি।

আরও পড়ুন : প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করি; তাই ভ্রমণ ভালো লাগে: শামীর মোন্তাজিদ


তাকদা Takdah দার্জিলিং

তাকদায় সূর্যোদয়, মোহময় এক রঙ্গিন সকাল অপেক্ষা করছে আপনার জন্য। ছবি : তমাল'স ব্লগ


 তাকদার আশেপাশেই দেখার মতো আরও অনেক জায়গা রয়েছে। তার মধ্যে দারুণ এক ভ্রমণ স্থান হল তিনচুলে। তাকদা থেকে ৩ কিলোমিটার দূরেই তিনচুলের অবস্থান। এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে দেখতে পাবেন। এছাড়া তিনচুলে থেকে তিস্তা ও রংগিত নদীর সংগম স্থলের অপরূপ দৃশ্যের দেখা পাবেন। তাকদা থেকে সকালের দিকে বেরিয়ে গেলে তিনচুলেতে নিরিবিলিতে সারাদিনটা উপভোগ করতে পারবেন। এছাড়াও তাকদা থেকে লামাহাট্টা, দুর্পিন, পেশক, মংপু, ছোট মাংগাওয়া দিনে দিনে গিয়েই ঘুরে আসতে পারবেন।

যেভাবে যাবেন :

দার্জিলিং থেকে গাড়িতে তাকদা মাত্র ১ ঘণ্টার পথ। এছাড়া নিউ জলপাইগুড়ি থেকে তাকদার দূরত্ব ৬০ কিলোমিটার। সেখান গাড়ি ভাড়া করে সহজেই তাকদা আসতে পারেন।

যেখানে থাকবেন :

তাকদায় আপনি ব্রিটিশ বাংলোগুলোতে থাকতে পারেন। এগুলোকে পর্যটকদের জন্য নতুন রূপে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। এছাড়া, এখানে পর্যটকদের জন্য একাধিক হোম-স্টে গড়ে তোলা হয়েছে। এগুলোতে থাকতে জনপ্রতি ১,৫০০-৫,০০০ টাকার মতো খরচ পড়বে।  

রুবাইদা আক্তার   এস এম