ক্ষীরের অমৃত নামে পরিচিত পাটিসাপটা পিঠা
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : আবহমান বাংলার সাথে জড়িয়ে আছে সুস্বাদু এই পিঠা
পুরে ভরা পাটিসাপটা পিঠা। ছবি : কুকপ্যাড ডট কম
বাংলা, বাঙালি, আবহমান বাংলার সংষ্কৃতি এই ত্রয়ীর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে সুস্বাদু হরেক রকম পিঠা-পুলির ইতিহাস। 'পিঠা' শব্দটি সংস্কৃত 'পিষ্টক' শব্দ থেকে এসেছে৷ আবার পিষ্টক শব্দটির উৎপত্তি 'পিষ্' ক্রিয়ামূলে তৈরি হওয়া শব্দ 'পিষ্ট' থেকে৷ পিষ্ট অর্থ চূর্ণিত, মর্দিত, দলিত৷ হরিচরণ বন্দোপাধ্যায় 'বঙ্গীয় শব্দকোষ' বইয়ে লিখেছেন, পিঠা হলো চাল গুঁড়া, ডাল বাটা, গুড়, নারিকেল ইত্যাদির মিশ্রণে তৈরি মিষ্টান্নবিশেষ৷ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ এই বাংলার প্রায় সকল ঘরোয়া জাঁকজমকপূর্ণ উৎসবে আয়োজন করা হয় নানা পদের পিঠা। তার মধ্যে অন্যতম হল ক্ষীরের এই পাটিসাপটা পিঠা। পাটিসাপটা পিঠা ছাড়াও নকশী পিঠা, শীতের সকালে ভাপা পিঠা, নারিকেল-গুঁড়ের মিশ্রনে তৈরি ভাপ পুলি পিঠা, নারকেলের ভাজা পুলি, সেমাই পিঠা, বিবিয়ানা পিঠা, কুলশি, মালপোয়া, ঝালপোয়া পিঠা, সন্দেশ পিঠা, সূর্যমুখী পিঠা, ঝুরি পিঠা, মেরা পিঠা, ঝাল পিঠা, জামাই পিঠা, মাংস পিঠা, চুই পিঠা, দুধ চিতই, ঝাল চিতই আরও অসংখ্যা রকমের পিঠা রয়েছে, যা বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে যুগের পর যুগ ধরে তৈরি হইয়ে আসছে।
ছবি : যুগান্তর
প্রতিটি পিঠা স্বাদে, গুণে অনন্য ও অসাধারন। তবে প্রতিটি পিঠার রন্ধনপ্রনালীতে এলাকার ভিন্নতার দরুন বেশ কিছু পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। ফলে, স্বাদেও আসে কিছুটা নতুনত্ব। পরিবারের নারী সদস্যরাই আদিকাল থেকে এসব রন্ধনপ্রনালী পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শিখে রপ্ত করে এসেছে আর এভাবেই পিঠা-পুলি তৈরির সংস্কৃতি বংশপরম্পরায় অক্ষুন্ন রয়েছে। রন্ধনশিল্পের বিভিন্ন অংশে পুরুষের প্রবেশাধিকার থাকলেও পিঠা তৈরির এই ক্ষেত্রটিতে নারীদের রাজত্বই চলছে সুদীর্ঘ কালধরে । সাহিত্য জগতে নজর দিলে আমরা বাংলার লোকজ ও নান্দনিক সংস্কৃতির কিছু বহি:প্রকাশ দেখতে পাই, যেখানে পিঠা-পুলির কথা উল্লেখ রয়েছে। 'পল্লী মায়ের কোল'- কবিতায় কবি বেগম সুফিয়া কামাল লিখেছেন,
'পৌষ পার্বণে পিঠা খেতে বসি খুশীতে বিষম খেয়ে
আরও উল্লাস বাড়িয়াছে মনে মায়ের বকুনি পেয়ে।'
ময়মনসিংহ গীতিকার 'কাজল রেখা' আখ্যানের সূত্র ধরে আনুমানিক গত পাঁচশ' বছর সময়কালে বাঙালি ভোজনসংস্কৃতিতে পিঠার জনপ্রিয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে৷ ষোল শতকের শেষের দিকে কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী রচিত 'চন্ডিকাব্যে' এই পাটিসাপটা পিঠার উল্লেখ পাওয়া যায়। জনপ্রিয় ভারতীয় বাঙালি কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্প 'পুঁই মাচা'তে পাটিসাপটা পিঠার উল্লেখ আছে। গ্রামাঞ্চলের সংস্কৃতিতে সাধারণত নতুন ধান তোলার পর থেকেই পিঠা তৈরির প্রচলন রয়েছে,যা নবান্ন উৎসব নামেও পরিচিত।উপকরণ : ২ বাটি চালের গুড়ো (মাঝারি আকারে), ১/২ বাটি ময়দা, ২০০ গ্রাম খেজুরের গুড়, ১ কাপ চিনি, দেড় লিটার দুধ।
রন্ধনপ্রণালী :
শীতকাল মানেই পিঠা-পুলির নানা আয়োজন, পাটিসাপটা পিঠা। ছবি : রান্নাঘর
একটি পরিষ্কার পাত্রে দুধ ঢেলে আস্তে আস্তে জ্বাল দিয়ে শুকিয়ে আসলে ২ চামচ চিনি, ২/৩টি ছোট এলাচি গুড়ো যুক্ত করে নাড়াচাড়া করে ক্ষীর তৈরি করে নিতে হবে।একটি বাটিতে চালের গুড়া,খেজুরের গুড়,অল্প চিনি,ময়দা নিয়ে পরিমানমত পানি দিয়ে গুলিয়ে নিতে হবে। একটি চুলায় ফ্রাইপ্যান বসিয়ে তাতে অল্প তেল দিয়ে মুছে নিতে হবে। একটা গোল হাতা দিয়ে অল্প পরিমানে মিশ্রনটি নিয়ে ফ্রাইপ্যানে ঢেলে দিতে হবে। তারপর সেটাকে আস্তে আস্তে ঘুড়িয়ে গোল আকারের করে নিতে হবে। ২ টেবিল চামচ ক্ষীর ভেতরে দিয়ে আস্তে আস্তে পাটির মত মুড়ে নামিয়ে পরিবেশন করুন ক্ষীরের পাটিসাপটা।
তথ্যসূত্র : https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%AA%E0%A6%BF%E0%A6%A0%E0%A6%BE হরিচরণ বন্দোপাধ্যায়, বঙ্গীয় শব্দকোষ, কলকাতা, ১৩৪১ ববঙ্গাব্দ৷ দক্ষিণারঞ্জন মিত্রমজুমদার, ঠাকুরমার ঝুলি, আর্টস ই বুক, বিডিনিউজ২৪.কম, ২০১১ https://www.dw.com