সবুজ ঘাস, ফুলের সমারোহ এবং সারি সারি গাছে ঘেরা ফোবজিখা উপত্যকা

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : ভুটানের উজ্জ্বল শ্যামলিমায় স্বর্গীয় অঞ্চল ফোবজিখা উপত্যকা

পর্যটকদের প্রবলভাবে আকর্ষণ করে ফোবজিখা উপত্যকা। ছবি : ট্রাভেল ট্রায়াঙ্গাল

ভুটানকে বলা হয় পৃথিবীর অন্যতম সুখী রাষ্ট্র। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, হিমালয়, তুষারঘেরা পর্বত এক স্বর্গীয় দেশে পরিণত করেছে ভুটানকে। ভুটানের মানুষদের ধর্মের প্রতি আনুগত্য ও নিজেদের ঐতিহ্যকে ধরে রাখার প্রয়াস নিজেদেরকে আরও সমৃদ্ধশালী করেছে। বিভিন্ন পাহাড়, পর্বতমালা, উপত্যকার মধ্যে ফোবজিখা উপত্যকা অন্যতম।

ভুটানের বেশ অল্পসংখ্যক উপত্যকা আছে যেগুলো বরফে আচ্ছাদিত এবং পুরোপুরি আদিম সময়কার জীবনযাপনকে ধরে রেখেছে। ফোবজিখা উপত্যকা সেক্ষেত্রে আলাদা। এখানে সৌন্দর্য ধরে রাখার দিক এবং আদিম সমাজব্যবস্থা জীবনযাপন নির্বাহের জন্য পর্যটকদের প্রবলভাবে আকর্ষণ করে। এই উপত্যকা গাঙ্গতেই নামেও পরিচিত।

নামটি এসেছে গাঙ্গতেই আশ্রমের নামানুসারে। গাঙ্গতেই আশ্রমটি ফোবজিখা উপত্যকার ঢিবিতে অবস্থিত। সন্ন্যাসীদের জন্য নির্মিত এই আশ্রম ভূটানের পশ্চিম দিকের সর্ববৃহৎ আশ্রম। এখানে প্রাকৃতিক পরিবেশের উপাদানের বিস্তীর্ণ প্রসারতায় আপনাকে ভুটান সরকারের বাস্তুসংস্থান বিষয়ক চিন্তাভাবনার ও এর যথাযথ প্রয়োগের সুস্পষ্ট ধারণা দিবে।

ফোবজিখা উপত্যকার ভ্রমণ আপনাকে এক চরম অভিজ্ঞতার সাথে সাক্ষী করবে। এখানে আসার পর যে বিষয়গুলো একদমই মিস করা উচিত না সেগুলো উল্লেখ করা হলো :

নাটকীয় দৃশ্যপট : গ্রীষ্মকালে প্রাকৃতিক পরিবেশ ফোবাজিখা উপত্যকা।  ছবি : গ্রিন ম্যান্ডেলা ট্যুর

এখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের যে অপরুপ সৃষ্টি তা আপনি একদমই অস্বীকার করতে পারবেন না। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে যখন উপত্যকায় আসবেন এর শ্রেষ্ঠ রুপ দেখতে পাবেন। জলাপূর্ণ ভূমি, প্রাকৃতিক পরিবেশ অপার রূপে সজ্জিত হয়। প্রকৃতি প্রেমীদের মনোরঞ্জন করতে বাধ্য হয় ফোবজিখা উপত্যকার অপরূপ লাবণ্য।

স্বল্পমূল্যে থাকার ব্যবস্থা বিলাসবহুল হোটেল এবং রিসোর্ট : ছবি : ট্রিপ এডভাইজর 

ভুটানে আগত সবথেকে বেশি ভ্রমণরত পর্যটকরা এখানে এসে থাকেন। তাই উপত্যকার হোটেল ও রিসোর্টগুলোতে খুব কম খরচে থাকা যায়। তার মানে এই নয় যে হোটেলগুলো নিম্ন মানের। হোটেলগুলো বেশ বিলাসবহুল ও জাঁকজমকপূর্ণ। তবে গ্রীষ্মকালে স্বল্পমূল্যে থাকার ব্যবস্থা বেশি থাকে। কিন্তু বসন্তকালের দিকে আসলে হোটেল ও রিসোর্ট খরচ বেশি হয়।

হাইকিং এবং  ট্রেকিং : ফোবাজিখা উপত্যকা একটি আদর্শ জায়গা হাইকিং এবং ট্রেকিং । ছবি : স্টেপস ট্রাভেল 

হাইকিং এবং ট্রেকিং এর জন্য ভ্রমণরত মানুষদের কাছে ফোবাজিখা উপত্যকা একটি আদর্শ জায়গা। গ্রীষ্মকালে উপত্যকার আশপাশের মাতাল করা দৃশ্য দেখার জন্য সর্বোত্তম সময়। সবুজ ঘাস, ফুলের সমারোহ এবং সারি সারি গাছ প্রাকৃতিক রূপকে আরো অন্য স্থানে নিয়ে যায়। এখানে কয়েকটি চমৎকার গমনপথ রয়েছে হাইকিং এবং ট্রেকিং এর জন্য।

গ্রামীণ মানুষের সহজ সরল জীবনযাপন :

আপনি যদি স্থানীয়দের সাথে মিশতে পারেন তবে সেক্ষেত্রে আপনার ভ্রমণ অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে আরও আনন্দদায়ক। স্থানীয় মানুষরা অনেকটাই যাযাবর রাখাল সম্প্রদায়ভুক্ত এবং সেই অনুযায়ী জীবনযাপন করে। শীতকালে স্থানীয়রা নিম্নভূমিতে চলে আসে এবং তাদের সাথে গরু ও গৃহপালিত অন্যান্য পশু প্রাণীদেরও নিয়ে আসে।

আবার গ্রীষ্মকালে যখন সবকিছু সহজ হয়ে যায় তখন যে যার যার নিজ গ্রামে ফিরে আসে। তাদের দেখলে মনে হয় জীবনের তেমন বিশেষ কোনো চাহিদা কিংবা তাৎপর্যপূর্ণ ভাবগাম্ভীর্য নেই। খুবই সহজ-সরলভাবে পরিচালনা করে যাচ্ছে নিজেদের জীবনযাপন ও চাহিদা।

ক্যাম্পিং : শুধু ট্রেকিং ও হাইকিং-এর জন্যই দূর-দূরান্ত থেকে এখানে মানুষ আসে না। ফোবজিখা উপত্যকা আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ক্যাম্পিংয়ের জন্য। এখানে আপনি ছুটির দিনে আকাশ ভরা তারার নিচে থাকতে পারবেন। আর সকালে উঠে মনে হবে যেন আদিম যুগে চলে এসেছেন। তবে সেক্ষেত্রেও গ্রীষ্মকাল সবচেয়ে উপযুক্ত সময় বলে বিবেচিত হয়।

ফটোগ্রাফি : এমন জায়গায় হারিয়ে যেতে কার না মন চায়। ছবি : ন্যাভিজারস

যারা ছবি তুলতে ভালোবাসেন তাদের জন্য এখানকার প্রতিটি স্থানকে বলা যায় আদর্শ জায়গা। আশ্রম থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক সবকিছু উপাদান বিভিন্ন ভঙ্গিমা আপনার ক্যামেরায় বন্দি করতে পারবেন। যেন মনে হবে ছবির মত অঙ্কিত আশেপাশের সব কিছু।

কীভাবে যাবেন :

বাংলাদেশ থেকে যেতে হলে প্রথমত আপনাকে বিমানবন্দর থেকে ভুটানের পারো বিমানবন্দরে যেতে হবে। এক্ষেত্রে আপনার সময় লাগবে প্রায় ১ ঘণ্টা ১০ মিনিট এবং খরচ পরবে প্রায় ২০ হাজার টাকা। পারো বিমানবন্দর থেকে ট্যাক্সিতে করে ২ ঘন্টা ৩০ মিনিট সময়ে আপনি ফোবজিখা উপত্যকায় পৌঁছতে পারবেন।

কোথায় থাকবেন : এখানে কয়েকটি নামকরা হোটেলের নাম হল : ফুনটসো চলিঙ লজ, ডেয়াচেন হোটেল, ইউই লকি গেস্ট হোটেল।

বিশেষ কিছু টিপস :

  • হাইকিং এর পথে আপনি তৃষ্ণার্ত হতে পারেন। কিন্তু আশেপাশে পানির কোনো সু-ব্যবস্থা নেই, তাই অবশ্যই পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি নিয়ে যাত্রা শুরু করুন।
  • ভুটানে দরকষাকষির কোনো নীতি নেই। তবে আপনি হাইকিং-এর গমনপথের দোকানগুলোতে এবং স্থানীয় হ্যান্ডিক্রাফটের দোকানগুলোতে দামাদামি করে জিনিসপত্র কিনতে পারেন।
  • ভুটানের নিরাপত্তার বিষয়টি খুবই দায়িত্ব সহকারে দেখা হয়। তাই সেক্ষেত্রে তেমন কোনো চিন্তার বিষয় নেই। তবে বিপজ্জনক কিছু না থাকলেও আক্রমনাত্মক কুকুর, উঁচু জায়গা, ঢিবি-এর বিষয়ে সতর্ক থাকা ভালো।
  • যেকোনো সময় যেকোনো কিছু বিশেষ প্রয়োজন হতে পারে, তাই সবসময় ট্রাভেল ইন্সুরেন্স কাছে রাখুন।
  • আর অবশ্যই এই অঞ্চলের একটি ম্যাপ নিয়ে যাত্রা শুরু করুন।


জান্নাতুল ফেরদৌস  


এস এম