শান্তিপ্রিয় থান্ডার ড্রাগনের দেশ ভুটান। তাকে 'এশিয়ার সুইজারল্যান্ড' হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে প্রায়শই। পাহাড়ি অঞ্চল, বৈচিত্র্যপূর্ণ জলবায়ু, সবুজ ঘাসে ঢাকা উপত্যকা, হাজার হাজার ফুট উঁচুতে রাস্তাগুলো যেন পাথর কেটে তৈরি।
পাহাড়ের ঢালে ধাপে ধাপে নানা সু-শোভিত দৃষ্টিনন্দন জুমখেত, কাঠ-পাথর-টিনে তৈরি ভুটানি ঐতিহ্যবাহী ছোট ছোট বাড়িঘর, পাহাড়ি সবুজ পানির নদী, শীতের তুষারপাত আর কাছেই মাথা উঁচু করে সগর্বে দাঁড়ানো হিমালয়—এসব কিছু নিয়েই প্রকৃতির নিজের হাতে সাজানো ভুটান অনিন্দ্য সৌন্দর্যের অধিকারী। অপার মহিমায় উদ্ভাসিত ভুটান কে প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড বলায় একটা সার্থকতা আছে।
অনেকে এই স্থানকে সুইজারল্যান্ডের বলে থাকেন। ছবি : ফাইন্ড ভুটান ডট কম
ভুটানিরা ভালোবাসে। এটি যে থান্ডার ড্রাগনের দেশ, তা ওখানে গেলে বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারা যায়। প্রায় সব জায়গায় এমনকি সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বিভিন্ন হোটেল, রিসোর্ট, পার্ক, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, খাবারের দোকান, কেনাকাটার জায়গা প্রায় সবখানেই এই ড্রাগনের ছবি দিয়ে সাজানো। জমলহারি ঘুরতে আসা সবারই ভ্রমণকাহিনীর শুরু হয় রাজধানী শহর থিম্পু থেকে।
প্রায় ৭ হাজার ৩৭৫ ফুট থেকে ৮ হাজার ৬৮৮ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই শহরটি।
এখানে দেখার মতো অনেক জায়গার মধ্যে জমলহারি অন্যতম। জমলহারির অপরূপ সৌন্দর্য দেখার জন্য থিম্পু থেকেও যাত্রা করা যায়। চেলেলা পাসে একদম কাছে গিয়েই দেখা যায় জমলহারির বরফাচ্ছাদিত শৃঙ্গ। ভুটানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বত এটি। এর উচ্চতা ৭,৩২৬ মিটার অথবা ২৪,০৩৫ ফিট, জমলহারিকে কাঞ্চনজঙ্থার বউ ও বলা হয়ে থাকে। এই পাহাড় থেকেই তৈরি হয়েছে পারো নদী।
জমলহারি, ভুটান। ছবি : সংগৃহীত
তিব্বতি বৌদ্ধরা এই পাহাড়কে অনেক পবিত্র মনে করে। তারা মনে করে, এই পবিত্র পাহাড়ে পাঁচ 'শারিংমা বোন'-এর একজনের বাসস্থান ছিল। শারিংমাদের কাহিনী নিয়ে অনেক বড় ইতিহাস রয়েছে। কথিত রয়েছে এই পাঁচ বোন 'গুরু পদ্মসম্ভভা'-এর কাছে শপথ করে বৌদ্ধদের সংস্কৃতি ও স্থানীয় জনগণদের রক্ষা করার। বৌদ্ধরা এমনকি ধারণা করত যে, এই পাহাড় পবিত্র যেহেতু তাই কেউ এর চুড়ায় যেতে পারবে না। যেতে চাইলে তাকে ফেলে দেয়া হবে।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বত জমলহারি এখান থেকেই পরিষ্কার দেখা যায়। চেলেলা পাস সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩ হাজার ৯৮৮ মিটার উঁচু এবং এটি হচ্ছে ডান্তাক রোডের সবচেয়ে উঁচু স্থান। এখানে যাওয়ার জন্য প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে পাহাড়ের পাশ ঘেঁষে এঁকে-বেঁকে উঠতে হবে।
একেবারে সমতল ভূমি থেকে এতো উপরে উঠায় পর্যটকেরা বায়ুর চাপের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে না পারায় মাথাব্যথা আর বমি বমি হয়। কিন্তু আশপাশের সৌন্দর্যের উপভোগের কাছে এসব যেন কোনো ব্যাপারই না। সেখানে দৃষ্টিগোচর হওয়ার মতো আরেকটি ব্যাপার হলো এখানে রাস্তার পাশে সিমেন্টের ফলকে ড্রাইভারদের জন্য নানা সতর্কবাণী লিখা রয়েছে।
জমলহারি ট্রেক, ভুটান। ছবি : সংগৃহীত
শীতকাল কিংবা একটু ঠান্ডা পরলে এখানে তুষারপাত হয়। চেলেলা পাস ঘুরে ফিরতে প্রায় চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। সব পর্যটকেরাই চেষ্টা করেন ফেরার পথে এয়ারপোর্ট ভিউ পয়েন্টে একটু ছবি তুলে একটু স্মৃতি জমাতে। শহরে ফিরে লাঞ্চ সেরে নিয়ে অন্যান্য জায়গাগুলো ঘুরে দেখেন ভ্রমণপিয়াসুরা। তাশি চো জং বা ন্যাশনাল মিউজিয়াম। এর পাশের পারো রিনপুং জং বা পারো জং কিংবা হাতে সময় থাকলে একদিন সময় রাখেন টাইগার মোনাস্ট্রি ট্রেকিং এর জন্যে।
ভুটান হচ্ছে পৃথিবীর একমাত্র দেশ যে দেশটার কার্বন নেগেটিভ। মানে তারা যত পরিমাণ কার্বন উৎপন্ন করে তারচেয়ে বেশি শোষণ করে। পরিবেশ সচেতন এই দেশের প্রকৃতির কোনো ক্ষতি হবে এমন কিছু করবেন না এমন পর্যটকেরই প্রত্যাশা। সুখী হোক প্রতিটি ভ্রমণ।
হালিমা খানমএস এমতথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া, ইউটিউব ভিডিও ব্লগ