সময়ের আবর্তনে নকশার ক্ষেত্রেও ভিন্নতা লক্ষণীয়
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : একদা আদালতের কাজ করতো ঐতিহাসিক মসজিদগুলোতেই
টাঙ্গাইলের ২০১ গম্বুজ মসজিদ। ছবি : ঢাকা অর্থনীতি
বাংলায় মুসলিম সাম্রাজ্যের শাসনামল ছিল ঐশ্বর্যে পরিপূর্ণ। সেসময়ে নানা সমৃদ্ধ অবকাঠামো নির্মিত হয়েছিল। মুসলমান শাসকরা তাদের শাসনামলে অনেক রাজপ্রাসাদ, স্মৃতিস্তম্ভ, টাওয়ার, দরবার শরীফ, মসজিদ, রাস্তা এবং ব্রিজ নির্মাণ করেছিলেন সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে। অতীত সময়ের এই সকল নির্মাণ কাজের মধ্যে অত্যন্ত চমৎকার মসজিদগুলো বেশ উল্লেখযোগ্য।
ছোট সোনা মসজিদ :
ছবি : উইকিমিডিয়া কমনস্
পনেরো শতকের দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ছোট সোনা মসজিদ নির্মিত হয়েছিল। সুলতান হোসাইন শাহের শাসনামলে মসজিদটি তৈরি করা হয়েছিল। মসজিদের উপর ১৫টি সোনালী রংয়ের গম্বুজ রয়েছে। এখানে প্রধান আকর্ষণ হলো এর চমৎকার অলংকরণ। দেয়ালের ওপর ভাসা ভাসা খোদাইকৃত অলংকরণগুলো মসজিদের সৌন্দর্যের মাত্রা অনেকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। পাথরের ওপর ডিজাইনগুলো দেখে অনুধাবন করা যায় নির্মাণ কাজে নিয়োজিত কারিগর কত নিখুঁতভাবে শিল্পকর্মগুলো করেছিলেন। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী টেরাকোটা অর্থাৎ পোড়ামাটির শিল্পের এক অনন্য নিদর্শন সোনা মসজিদ। এখানে মেঝে রয়েছে ফুলের অঙ্কন, পূর্বদিকে রয়েছে খোদাইকৃত বিভিন্ন ডিজাইন।
বাঘা মসজিদ :
বাঘা মসজিদ। ছবি : অফরোড
হোসাইন শাহী-এর সময়কালে রাজশাহীতে ১৫২৩ সালে সুলতান নুসরাত শাহ নির্মাণ করেছিলেন এই মসজিদ। কাপের মত আকৃতির ১০টি গম্বুজ রয়েছে বাঘা মসজিদে। এই মসজিদে খুব সুন্দর ভাবে পোড়ামাটির ফলক এর শিল্পকর্মগুলো ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। পোড়ামাটির শিল্পকর্মগুলোতে সমৃদ্ধশালী কিছু নকশা যেমন : ফুল, গোলাপ প্রভৃতি কারুকাজ দেখতে পাওয়া যায়। পশ্চিম দিকের ভেতরকার দেয়ালে সু-সজ্জিত বিভিন্ন ডিজাইন রয়েছে। এখানের মেহরাবের শিল্পকর্মগুলো দেখতে অসাধারণ।
কুসুম্বা মসজিদ :
ছবি : সংগৃহীত
রাজশাহী অঞ্চলের আরও একটি ঐতিহাসিক মসজিদের নাম কুসুম্বা মসজিদ। সুলতানি শাসন আমলের পরবর্তী সময়ে ১৫৫৮ সালে এটি নির্মাণ হয়েছিল। এটি নির্মাণ করেছেন সুলতান গিয়াসউদ্দিন বাহাদুর শাহ। মসজিদ দেখতে সমকোণী ত্রিভুজ আঁকার এবং উপরে রয়েছে ছয়টি গোলার্ধ গম্বুজ। মসজিদের জন্য ব্যবহৃত পাথরগুলো কালো রংয়ের যেগুলো বিহারের রাজমহল পাহাড় থেকে পানি পথে সেসময় নিয়ে আসা হয়েছিল। দক্ষিণ-পশ্চিমে খুব সুন্দর করে নকশা করা গ্যালারির রয়েছে।
বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ :
বাগেরহাটের ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান ষাট গম্বুজ মসজিদ। ছবি : উইকিপিডিয়া
এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে যতগুলো ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ আছে বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ তার মধ্যে অন্যতম। এখানে রয়েছে ৭৭টি গম্বুজ। ১৪৪২ সালে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল যা শেষ হয় ১৪৫৯ সালে। বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে এবং ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে এটি ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানদের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ঐতিহাসিক নিদর্শন। এখানে নামাজের জায়গা ১৬০ ইঞ্চি × ১৯০ ইঞ্চি জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। এখানে একসাথে প্রায় ২ হাজার মানুষ নামাজ পরতে পারে। পশ্চিম দিক থেকে রয়েছে এগারোটি গমনপথ এবং উত্তর দক্ষিণ দিকে রয়েছে সাতটি বিশেষায়িত জায়গা বাতাস চলাচলের ব্যবস্থার জন্য।
সূরা মসজিদ :
ছবি : দ্যা ঢাকা টাইমস্
দিনাজপুরের বিখ্যাত মসজিদ সূরা মসজিদ। সূরা মসজিদ সুলতানি শাসন আমলে তৈরি করা হয়েছিল। এখানে বর্গাকৃতির নামাজের ঘরের পূর্বদিকে রয়েছে বারান্দা এবং উচ্চ চূড়া বিশেষ। এর কার্নিশ খুব সুন্দর ভাবে পশ্চিম দিকের দেয়ালের দিকে খোদাই করা হয়েছে। যেখানে আরও রয়েছে তিনটি মেহেরাব যা কিনা অসাধারণ টেরাকোটা শিল্পকে তুলে ধরে। নামাজের জন্য কেন্দ্রীয় জায়গার উপরে একটি বড় গম্বুজ রয়েছে আর এর পাশে বারান্দার উপর বরাবর তিনটি গম্বুজ রয়েছে।