মৌসুনি দ্বীপ : কোলাহল থেকে দূরে নির্জন এক দ্বীপ

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : কলকাতা শহরতলী হতে কিছুটা দূরে মোহনীয় দ্বীপ মৌসুনি


মৌসুনি দ্বীপ mousuni island

কোলকাতা থেকে ১১০ কিলোমিটার দূরে চব্বিশ পরগণার একেবারে শেষপ্রান্তে চেনাই নদী আর বঙ্গপসাগরের মোহনায় অবস্থিত মৌসুনি দ্বীপ। ছবি : মিডিয়াম ডট কম


নির্জন দ্বীপে ধু-ধু বালি চরে আপন মনে হেঁটে চলা, সাথে সমুদের অনবরত গর্জন। নোঙ্গর করা একাকী নৌকোর ওপর বসে বটতলা নদীর ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে সময় পার করে দেয়া। যেখানে চোখের সামনে দিগন্ত বিস্তৃত নীল আকাশের গায়ে সাদা মেঘেদের খেলা চলে। বটতলা নদী এখানে সাগরে মেশার আগে যেন সমুদ্রের মতো বড় বড় অবিশ্রান্ত ঢেউ তুলে তার অস্তিত্ব জানান দেয়। এমনই অপরূপ একটি জায়গা হল মৌসুনি দ্বীপ (Mousuni Island)। কোলকাতা থেকে বেশ কাছেই নদী আর সাগরের মোহনায় চমৎকার একটি দ্বীপ এটি। নির্মল পরিবেশে ছুটি আস্বাদ করার জন্য এই দ্বীপটি হতে পারে দারুণ একটি জায়গা।

অবস্থান

কোলকাতা থেকে মাত্র ১১০ কিলোমিটার দূরে চব্বিশ পরগণার একেবারে শেষপ্রান্তে এই দ্বীপটি অবস্থিত। এর তিন দিকে চেনাই নদী ও আর একদিকে সাগরের মোহনা। শান্ত সমুদ্র আর নির্জনতায় ভরা এক দ্বীপ হল এটি। এক অচেনা বঙ্গোপসাগরের দেখা পাবেন এখানে। সাগরের নির্জন সৌন্দর্য দেখে উৎফুল্ল হয়ে যাবেন। একদম শান্ত ও নির্ঝঞ্ঝাট ঘোরার জায়গা হল এই মৌসুনি দ্বীপ। শহরতলী থেকে অনেকটা দূরে হওয়াতে পর্যটকদের তেমন ভিড় থাকে না এখানে।

আরও পড়ুন : মওরো মোরান্ডি ও ৩১ বছর যাবৎ নির্জন দ্বীপবাস



mousuni island মৌসুনি দ্বীপ

শহরতলী হতে কিছুটা দূরে হওয়ায় একেবারে নির্জনতার স্বাদ পাবেন এখানে। ছবি : মৌসুনি আইল্যান্ড ডট কম


[/caption] এই দ্বীপটিতে সমুদ্রের পুরো স্বাদই পাবেন। এখানে শুধু জোয়ারের সময় পানি থাকে আর ভাঁটায় পানি চলে যায় বহুদূরে। আর এখানে জোয়ারের পানিতেও সামান্য ঢেউ থাকে তাই এই পানিতে ইচ্ছেমত নেমে নিজেকে ভেজাতে পারবেন। নির্জনতার মাঝে সমুদ্র সৈকতের সম্পূর্ণ রূপ-রস উপভোগ করতে পারবেন। এই দ্বীপের কাছেই বালিয়াড়া বিচ। কোলাহল থেকে অনেক দূরে এখানে পাওয়া যায় ভিন্ন এক অনুভূতি। এই বালিয়াড়া থেকে পশ্চিমবঙ্গের একদম শেষ বিন্দু জম্মুদ্বীপকে দেখতে পাবেন। এই সমুদ্র তীর ধরে হাঁটতে হাঁটতে যতদূর ইচ্ছে যাওয়া যায়। নীরবতার মাঝে সাগরের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে মন চাইবে হারিয়ে যেতে। সৈকত ধরে বামদিকে প্রবেশ করলেই দেখতে পাবেন ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট । মনোরম ম্যানগ্রোভের হাতছানিতে পৌঁছে মনে হবে এই বুঝি হারিয়ে গেলেন অজানা দেশে। এখানে সমুদ্রের তীরে চোখে পড়বে লাল কাঁকড়ার দল। তাদের ছুটোছুটি আর খেলায় আপনার মন হয়ে উঠবে প্রফুল্ল। জানা-অজানা বিভিন্ন পাখির কোলাহলে পরিবেশটা এখানে দারুণ মুগ্ধকর। আরও পড়ুন : চর বঙ্গবন্ধু আইল্যান্ড, বাগেরহাট


mousuni island মৌসুনি দ্বীপ

সূর্যাস্তে মোহনীয় এক রূপের ধারা বয়ে পড়ে এখানে। ছবি : উইকিমিডিয়া



এই দ্বীপের স্থানীয়রা মাছ ধরতে আসে জাল নিয়ে।এই সমুদ্রই তাদের জীবিকা। শুধু মাছ ধরাই নয়, তাদের সংগ্রামী জীবনের নানা চিত্র দেখতে পাবেন এখানে। এখানকার সৈকতে সন্ধ্যে নামার মুহূর্তটি দারুণ উপভোগ্য। রক্তিম সূর্যটা ধীরে ধীরে ডুবে যায় সাগরের বুকে। সমুদ্রের বুকে ছড়িয়ে দিয়ে যায় বিদায়ের লাল আভা। অসীম জলরাশিতে হারিয়ে যাওয়া সূর্যের গোধূলি মুহূর্তটাকে অপার নীরবতা যেনও আরও মোহনীয় করে তোলে। জ্যোৎস্না শোভিত রাতে এখানে সমুদের সৌন্দর্য আরও বেশি অপরূপ হয়ে উঠে। চাঁদের প্রতিফলন পড়ে সাগরের জলে। রূপালি আভায় সাগরের জল যেনও হয়ে উঠে রূপের আয়না। আবার চাঁদহীন রাতে আকাশ ভরে উঠে সহস্র তারায়। রাতের অন্ধকারে অসংখ্য নক্ষত্র খচিত আকাশে স্বপ্নের জাল বোনে সমুদের শীতল বাতাস। নির্জনতার মাঝে সমুদ্রে ঢেউয়ের গর্জন আপনাকে হারিয়ে নিয়ে যাবে এক অজানা জগতে। সমুদ্র-আকাশের মিতালিতে একটা রাত এখানে এভাবেই বসে কাটিয়ে দেয়া যায় অনায়াসে।

আরও পড়ুন : বাল্ট্রা দ্বীপ : গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের রহস্যময় দ্বীপ



mousuni island

পর্যটকদের জন্য এখানে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু ক্যাম্প যেখানে রয়েছে তাঁবু ও কটেজে থাকার ব্যবস্থা। ছবি : মৌসুনি আইল্যান্ড ডট কম



কোথায় থাকবেন

এই দ্বীপে থাকার ব্যবস্থা আছে। পর্যটকদের জন্য এখানে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু ক্যাম্প যেখানে রয়েছে তাঁবু ও কটেজে থাকার ব্যবস্থা। এখানে ক্যাম্প ফায়ারের গনগনে আগুনে নেমে আসে চমৎকার সন্ধ্যা। এখানে থাকার সকল আয়োজন স্থানীয়রাই করে থাকেন। তাই খাবার-দাবারের আয়োজন নিয়েও আপনাকে ভাবতে হবে না। খাবারের মেনুতে পাবেন স্থানীয় পুকুর থেকে ধরা টাটকা মাছের স্বাদ।আরও পাবেন নারিকেল গাছ থেকে পাড়া ফ্রেশ ডাবের পানি। ঘরোয়া ভাবে করা এই রান্নায় তৃপ্তি সহকারে খাবারের স্বাদ নিতে পারবেন। এতে খরচ হবে মাথাপিছু ১,০০০ টাকা থেকে ১,৫০০ টাকার মধ্যে।

যেভাবে যাবেন :

কোলকাতার শিয়ালদহ স্টেশন থেকে লোকাল ট্রেন ধরে নামবেন নামখানা স্টেশনে। সেখান থেকে মটর ভ্যান করে ঘাট পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। হাতানিয়া দুয়ানিয়া নদী পাড় করে এরপর হেঁটে বাস স্ট্যান্ডে আসতে হবে। তারপর ম্যাজিক গাড়িতে চড়ে আসবেন বাগডাঙ্গা ঘাট। সেখান থেকে নৌকায় চড়ে চেনাই নদী পার করতে হবে। বাগডাঙ্গা থেকে মৌসুনী দ্বীপে আসতে হবে টোটো বা অটোতে চড়ে।  

রুবাইদা আক্তার   এস এম