অষ্টাদশ শতাব্দীর কারুকার্য খচিত হেমনগর জমিদার বাড়ি : টাঙ্গাইল
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : জমিদার হেমচন্দ্র চৌধুরী ও হেমনগর জমিদার বাড়ি, টাঙ্গাইল

হেমনগর জমিদার বাড়ি ইতিহাস
টাঙ্গাইলের জমিদার বাড়িগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি আকর্ষণীয় জমিদার বাড়ি হল হেমনগর জমিদার বাড়ি। প্রাচীন এই জমিদার বাড়িটি স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও দৃষ্টিনন্দন। আপনার টাঙ্গাইল ভ্রমণে দেখতে ভুলবেন না এই হেমনগর জমিদার বাড়ি (Hemnagar Zamidar Bari)। টাঙ্গাইলের গোপালপুরের হেমনগরে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে হেমনগর জমিদার বাড়ি। গোপালপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরত্বে হেমনগর। ঐতিহাসিক এই জমিদার বাড়িটি স্থানীয়দের কাছে পরীর দালান হিসেবে পরিচিত। ১৮৯০ সালে টাঙ্গাইলের প্রভাবশালী জমিদার হেমচন্দ্র চৌধুরী সৌন্দর্যমন্ডিত এই বাড়িটি নির্মাণ করেন। প্রায় ১২৪ বছর পুরনো এই জমিদার বাড়িটি অষ্টাদশ শতাব্দীর কারুকাজ শোভিত দারুণ স্থাপত্যশৈলীতে নির্মাণ করা হয়েছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, হেমনগরের জমিদার হেমচন্দ্র চৌধুরীর পিতা কালিবাবু চৌধুরী ছিলেন ব্যবসায়ী।কালিবাবু চৌধুরী সূর্যাস্ত আইনের আওতায় শিমুলিয়া পরগণার জমিদারি কিনে নেন। কালিবাবু চৌধুরীর চার ছেলে ও চার মেয়ের মধ্যে হেমচন্দ্র চৌধুরী ছিল বড়। তিনি জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব পাওয়ার পর ময়মনসিংহ জেলার মধুপুর উপজেলার অন্তর্গত আম্বারিয়া এস্টেটে জমিদার বাড়ি বানান এবং জমিদারি পরিচালনা শুরু করেন। কিন্তু আম্বারিয়া থেকে যমুনার পূর্বপাড় এবং সেখান থেকে মধুপুর গড় পর্যন্ত বিশাল এলাকার জমিদারি তার পক্ষে পরিচালনা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। তাই তিনি গোপালপুর উপজেলার সুবর্ণখালী নামক গ্রামে দ্বিতীয় জমিদার বাড়ি নির্মাণ করেন। এরপর নদী ভাঙনে সুবর্ণখালী বিলীন হতে থাকলে তিনি শিমলাপাড়া গ্রামে এই জমিদার বাড়িটি নির্মাণ করেন এবং নিজ নামে এই এলাকার নামকরণ করেন হেমনগর।
হেমনগর জমিদার বাড়ি চিত্রণ
এই দ্বিতল ভবনটি আজও সেই পুরনো ঐতিহ্য নিয়ে সদর্পে দাঁড়িয়ে আছে। বাড়িটির সামনের দিকে ছাদের ওপর দু’টি পরীর মূর্তি আছে, যার কারণে এটিকে পরীর দালান বলা হয়। একশ’ কক্ষবিশিষ্ট এ বাড়িটি প্রায় ৩০ একর জমির ওপর নির্মাণ করা হয়েছে।পুরো রাজবাড়িটি তিন ভাগে বিভক্ত। প্রথম অংশে দ্বিতলা দরবার হল। আর তার পেছনে অন্দর মহল। অন্দর মহলের দুটো অংশ, যার দুটোই এক তলা।জমিদার বাড়িটির সামনের অংশ :
জমিদার বাড়ির সামনে রয়েছে বিরাট মাঠ। এই মাঠ পেরিয়ে সামনের ভবনটি ছিলও জমিদার হেমচন্দ্রের দরবার ঘর। দু-পাশে সারি-সারি ঘরগুলো নিয়ে গড়ে উঠেছে চতুর্ভুজাকার জমিদার বাড়ি। তিন ফুট প্রশস্ত দেয়াল দিয়ে জমিদার বাড়িটি ঘেরা এবং বাড়ির পেছনে রয়েছে বড় দুটি পুকুর। এই পুকুরগুলোর রয়েছে চমৎকার শান বাঁধানো ঘাট। জমিদার বাড়িটির সামনের অংশটা সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয়। এই অংশে ইসলামিক আর্চ আর গ্রিক কোরানথিয়ান পিলালের চমৎকার মিশ্রণ দেখা যায়। চিনি টিকরী অলংকরণে এর সৌন্দর্য বেড়েছে বহুগুণ। চিনি টিকরী অলংকরণ হলো অনেকটা মোজাইকের মতো।এই পদ্ধতিতে স্থাপত্যের গায়ে চিনামাটির বাসন কোসনের ছোট ভগ্নাংশ ও কাঁচের টুকরা ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরণের নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়। ভবনটিতে প্রধানত রঙিন কাঁচের টুকরো বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। সামনের দিকের পিলার থেকে শুরু করে, দেয়াল, দরজা জানালার প্যানেল, প্রতিটা জায়গায় এই অলংকরণ ছিল। নকশার গুলো মূলত ফুল, তারা, গাছের আর জ্যামিতিক ডিজাইনের। এই নকশাগুলো জমিদার বাড়িটির সৌন্দর্যকে নিয়ে গেছে অনন্য উচ্চতায়। জমিদার বাড়িটির আশেপাশে আরও ৭টি সুরম্য ভবন আছে যেগুলো হেমচন্দ্র চৌধুরী তার তিন বোন ও চার ছেলেমেয়ের জন্য নির্মাণ করেছিলেন। দেশ ভাগের পর এই জমিদার বাড়ির সকলেই কলকাতায় পাড়ি জমান । বর্তমানে এই জমিদার বাড়িটিতে একটি ডিগ্রি কলেজ রয়েছে। যা হেমনগর ডিগ্রি কলেজ হিসেবে পরিচিত।
যেভাবে যাবেন :
ঢাকা থেকে টাঙ্গাইলগামী বিভিন্ন পরিবহনের বাস রয়েছে। তার মধ্যে আছে নিরালা পরিবহন, ধলেশ্বরী সিটিং সার্ভিস, আল-রাফি পরিবহন, সকাল-সন্ধ্যা, সোনিয়া পরিবহন ইত্যাদি। টাঙ্গাইল শহর থেকে প্রায় ২০০ টাকা ভাড়ায় আপনি সিএনজি বা অটোরিকশায় করে হেমনগরে পৌঁছাতে পারেন। এছাড়া ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে সরাসরি বাসে আপনি গোপালপুর অথবা ভুয়াপুর থানায় পৌছাতে পারবেন। সেখান থেকে সিএনজি বা অটোরিকশায় করে হেমনগরে পৌঁছাতে পারেন।যেখানে থাকবেন :
টাঙ্গাইলে থাকার জন্য বেশকিছু হোটেল ও গেস্ট হাউজ রয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল পলাশ হাউজ/ নাইট গন্ধা রেসিডেনসিয়াল হোটেল; মসজিদ রোড, টাঙ্গাইল, আল ফয়সাল হোটেল রেসিডেনসিয়াল; মসজিদ রোড, টাঙ্গাইল, হোটেল সাগর রেসিডেনসিয়াল, আফরিন হোটেল;মসজিদ রোড, টাঙ্গাইল, এস এস রেস্ট হাউজ; আকুরাটাকুর পাড়া, টাঙ্গাইল, পল্লী বিদ্যুৎ রেস্ট হাউজ, এলজিইডি রেস্ট হাউজ (সরকারি), সুগন্ধা হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট; পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, টাঙ্গাইল, নিরালা হোটেল; নিরালা মোড়, টাঙ্গাইল, পিয়াসি হোটেল; নিরালা মোড়, টাঙ্গাইল।রুবাইদা আক্তার এস এম
