২১শে ফেব্রুয়ারী উপলক্ষে যা যা আয়োজিত হয় দেশব্যাপী

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলা একাডেমিতে অসংখ্য লোকসমাগম হয় দিনটিতে

Student_Rally_and_Monajat_21_Feb_1953 ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন কলাভবন ও বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজের গেইটে ভাষা আন্দোলনের চিত্র। ছবি : সংগৃহীত

মাতৃভাষার দাবিতে জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার ও শফিউরসহ নাম না-জানা আরও অনেকে। তাঁদের চেতনা বুকে ধারণ করে বাঙালিরা শুরু করে অমর একুশের প্রথম প্রহর। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকা আগের দিন থেকেই লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর রঙিন হয়ে ওঠে চারুকলার শিক্ষার্থীদের হাত ধরে। শাহাবাগের দোকানগুলোতে ভিড় ঠেলে চলে শ্রদ্ধার ফুলের বিকিকিনি। মিছিলে স্লোগানে প্রতিনিয়ত বাঙালির আবেগ প্রকাশ পায় দিনটিকে ঘিরে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে একুশে ফেব্রুয়ারিকে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করা হয়। এই দিন সকল সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি ভবনসমূহে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। দিনের আলো ফোটার আগে থেকেই সাদা-কালো রঙে শোকের আবহ নিয়ে খালি পায়ে প্রভাতফেরীর আয়োজনে অংশ নেয় নানা বয়সের মানুষ। সাথে উচ্চারিত হয় একুশের স্মরণে আলতাফ মাহমুদের সুরে আবদুল আবদুল গাফফার চৌধুরীর লেখা–'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি।'

আপাতদৃষ্টিতে শোকের মাস হলেও আদতে এই মহান একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। ভাষার মর্যাদা রক্ষায় এর আগে কোনো জাতি এমন অকাতরে প্রাণ দেয়নি। তাই তো তাদের স্মরণে বর্তমানে দেশের বাইরেও তৈরি হয়েছে স্থায়ী এবং অস্থায়ী শহীদ মিনার। ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অবস্থিত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে অমর একুশের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। দেশের রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীসহ বরেণ্য ব্যাক্তিবর্গের হাত ধরে আসতে শুরু করে ফুলেল শ্রদ্ধা। এছাড়া সমগ্র দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত শহীদ মিনারকে ঘিরেও একুশের চাঞ্চল্যতা দেখা যায়। ছোট-বড় নানা বয়সী মানুষেরা বুকে কালো ব্যাজ ধারণ করে খালি পায়ে শহীদ মিনারে ফুল দিতে আসে। পাড়ার মোড়েও শিশু কিশোরেরা তৈরি করে অস্থায়ীও শহীদ মিনার। মসজিদে, মন্দিরে বিশেষ মোনাজাত এবং প্রার্থনার আয়োজন হয়। দিনটিকে ঘিরে বিভিন্ন পত্রিকায় থাকে বিশেষ আয়োজনের ক্রোড়পত্র। প্রখ্যাত সাহিত্যিকেরা গল্প, কবিতা আরো নানা সাহিত্যক্রিয়া পৌঁছে দেন জনগণের নিকট।

central shahid minar ২১শে ফেব্রুয়ারির আগে থেকেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মূল আয়োজনের প্রস্তুতি চলতে থাকে। ছবি : সংগৃহীত


 এর বাইরে ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন থেকে আয়োজিত হয় বাংলা একাডেমির বইমেলা যা চলে মাসজুড়ে। এর বাইরে একুশে ফেব্রুয়ারিতে দিনটির গুরুত্ব এবং চেতনা তুলে ধরে আয়োজন করা হয় বিভিন্ন সেমিনার এবং মঞ্চনাটকের। পাশাপাশি চারুকলায় শিশুদের চিত্রাংকন প্রতিযোগিতারও আয়োজন হয়ে থাকে। বিভিন্ন স্কুল এবং কলেজেও এই দিনটিকে ঘিরে নানা ধরনের আয়োজনে অংশ নেয় শিক্ষার্থীরা। রেডিও এবং টেলিভিশনে সমগ্র দিনব্যাপী নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দিনটির তাৎপর্য তুলে ধরা হয়। ১৯৭৬সাল থেকে ভাষা শহীদদের স্মরণে প্রবর্তিত হয় দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক 'একুশে পদক'। বিশিষ্ট ভাষাসৈনিক, ভাষাবিদ, সাহিত্যিক, শিল্পী, শিক্ষাবিদ, গবেষক, সাংবাদিক, অর্থনীতিবিদ, দারিদ্র্য বিমোচনে অবদানকারী, সামাজিক ব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় পর্যায়ে অনন্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ প্রতি বছর বাংলাদেশ সরকার একুশে পদক প্রদান করে থাকে। ভাষার প্রতি যে অসীম মমত্ববোধ নিয়ে প্রাণ দান করেছিলেন ভাষাশহীদেরা, প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেই আত্মত্যাগের মহিমা লালন করে প্রতি একুশে তাই লাখো মানুষ ভীড় জমান শহীদ স্মৃতিস্তম্ভগুলোতে।   


তথ্যসূত্র : https://banglatribune.com https://bn.wikipedia.org/wiki https://www.dailyinqilab.com/article