কান্দোভন : পাথরের গুহার ভেতরেই শতবর্ষী ঐতিহ্যের যে গ্রাম

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : জীবনযাত্রা যেখানে পাথুরে দেয়ালের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো



কান্দোভন Kandovan

পাথরের গুহার ভেতরেই এখানে গড়ে উঠেছে মসজিদ, মাদ্রাসা, দোকান থেকে সমস্ত জীবন প্রণালী, কান্দোভন, ইরান। ছবি : তেহরান টাইমস


গ্রাম মানেই সবুজ-শ্যামলিমায় ভরপুর ছোট ছোট কুটিরের আবাস। যেখানে নদী আর সবুজের মায়ায় ঘরগুলো জড়িয়ে থাকে। কোথাও বা থাকে পাহাড়ে ঘেরা গ্রাম, কোথাও বা জঙ্গলে ঘেরা গ্রাম। নানা রূপের নানান গ্রামের কথা আমরা প্রত্যেকেই জানি। তবে, পৃথিবীতে এমন গ্রামও আছে যেখানে বাড়ি-ঘর সবকিছুই পাথুরে গুহাতে। ভাবতে অবাক লাগলেও সত্যি যে, ইরানের একটি গ্রাম নাম যার কান্দোভন (Kandovan) তেমনি একটি গ্রাম। পৃথিবীর নানা ধরনের বৈচিত্র্যতায় এটি আরেক আশ্চর্যময় বৈচিত্র্য।

বিস্ময়কর এই গ্রামটি গুহার গ্রাম। আসুন তাহলে এই অবাক করা গ্রাম সম্পর্কে জেনে আসা যাক। ইরানের পূর্ব আজারবাইজানের ওস্কু উপশহরের একটি গ্রাম হল এই কান্দোভন। তাব্রিজ শহর থেকে পঞ্চাশ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে ও ওস্কু শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে সাহান্দ পর্বতের পাদদেশে এই বিস্ময়কর গ্রামটি অবস্থিত। এই গ্রামটি পুরোই পাথরে মোড়া গুহাময়।

গুহাময় গ্রাম কান্দোভন

বিশ্বে যে তিনটি পাথুরে গুহাময় গ্রাম আছে তার মধ্যে একটি হল এই কান্দোভন গ্রাম। তবে, অন্যগুলোতে মানুষের জীবন প্রবাহ না থাকলেও শুধুমাত্র এই গ্রামটিতে পুরোদস্তুর মানুষের বসবাস রয়েছে। গ্রামবাসীরা সবাই এখানে গুহাবাসী৷ প্রত্যেকের বাড়িই গুহার। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে তারা এভাবেই বসবাস করে আসছে। তাদের জীবনযাত্রা এখানে পাথুরে দেয়ালের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে।


কান্দোভন Kandovan

কান্দোভনের গুহার ভেতরে গড়ে ওঠা একটি সাধারণ গৃহের দৃশ্য। ছবি : উইকিপিডিয়া


এখানে বড় বড় পাথরের টিলা দেখা যায়। এই টিলাগুলোর মধ্যে অনেকগুলোর উচ্চতা চল্লিশ মিটার। এগুলোর বুক চিরে তৈরি করা হয়েছে বাড়ি-ঘর। এই গুহা ঘেরা গ্রামটি দেখতে অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। শুধু এই গ্রামের সৌন্দর্যই নয়, গ্রামবাসীর জীবন প্রণালীও পর্যটকদের মুগ্ধ করে। এই আদিমতার সাথে জড়িয়ে আছে তাদের বহু বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি।

ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যে এই কান্দোভন গ্রাম

এছাড়া বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায়ও এই গ্রামটি তালিকাভুক্ত হয়েছে। এই গ্রামটি গুহাময় হলেও এখানে স্বাভাবিকভাবে সবাই বসবাস করে এবং জীবনের সকল আয়োজনই আছে এখানে। এই পল্লীগ্রামে জীবন প্রবাহ চলছে বহুকাল ধরেই। পুরাতত্ত্ববিদদের মতে, এখানে ইসলামে-পূর্ব যুগ থেকেই মানুষ বসবাস করে আসছে। গুহাগুলোর মধ্যে তৈরি করা হয়েছে গোয়ালঘর, গুদাম এবং ছোটো ছোটো কামরা। এছাড়াও মসজিদ, হাম্মাম, মাদ্রাসা, যাঁতাকল, দোকান, খাওয়ার ঘর, স্নানের স্থান, মাদ্রাসা, শিক্ষালয় ও বিরাট বিরাট পেষাইকল রয়েছে গ্রামটিতে৷ জীবনের প্রয়োজনীয় সবকিছুই গুহাতে করা হয়েছে। এই গ্রামের সবচেয়ে বড় গুহাটিতে করা হয়েছে মসজিদ। এই গুহাগুলো দেখতে দারুণ নজরকাড়া। নজিরবিহীন সৌন্দর্যের এই গ্রামটির প্রাকৃতিক পরিবেশ ও আবহাওয়া অত্যন্ত মনোরম। ইরানের পার্বত্য অঞ্চলগুলোর মধ্যে এই জায়গাটিকে সবচেয়ে ভালো আবহাওয়ার অঞ্চল বলে মনে করা হয়।


কান্দোভন Kandovan

রাতের কান্দোভন! গুহা গুলো থেকে এভেবাই বিচ্ছুরিতে হয় আলো। ছবি : হাই তেহরান হোস্টেল ডট কম


সাহান্দ পর্বতের আগ্নেয়গিরির প্রভাব এবং চমৎকার আবহাওয়া এই গ্রামটিকে আরও বেশি নির্মল করে তুলেছে। মনোরম পরিবেশ থাকার কারণে গ্রামবাসীর জীবনযাত্রায় নেই কোনও ক্লেদ বা ক্লান্তির ছাপ৷

জীবনযাপনের সরলতা আর প্রাচীন ঐতিহ্যের এই গ্রামের স্বাভাবিক মাধুর্য তাদের নিত্যদিনের জীবনাচরণে খুঁজে পাওয়া যায়

ইরানের শীতপ্রধান পার্বত্য এলাকাগুলোর মতো এই গ্রামটিও শীত প্রধান অঞ্চল। যখন প্রবল শীত জেঁকে বসে তখন এখানকার জীবনযাত্রাও সংকুচিত হয়ে পড়ে। তুষারপাতও হয় এখানে৷ পাথুরে এই গুহায় ঘর গরম করার ব্যবস্থা আছে। তেমনই আছে গুহার কক্ষেই তন্দুর রুটি তৈরির চুল্লি। সহজ সরল জীবনযাপনের পাশাপাশি এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেও রয়েছে মাধুর্যের ছোঁয়া। এই উপত্যকায় আছে মোটামুটি বড় একটা নদী এবং অনেকগুলো দারুণ ঝর্ণাধারা। এই সদা বহমান ঝর্ণাগুলো গ্রামবাসীর বিশুদ্ধ পানির উৎস।

কান্দোভনের ঝর্ণার রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। এই ঝর্ণাগুলোর পানিতে আছে খনিজ পদার্থ৷ বলা হয়ে থাকে এই খনিজ সমৃদ্ধ পানি কিডনির পাথর দূর করার ক্ষেত্রে খুবই কার্যকরী ৷ কান্দোভনের আশেপাশের উপত্যকাগুলো পশুপালনের জন্যে খুবই উপযোগী। দুগ্ধজাত পণ্য ও মধুর জন্যে কান্দোভনের রয়েছে আলাদা সুখ্যাতি। এখানকার মধু স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। ইরানে ঘুরতে আসা পর্যটকরা কান্দোভন গ্রামে ঘুরতে আসেনই। গ্রামটির চমকপ্রদ সৌন্দর্য ও গ্রামবাসীর জীবনযাত্রা তাদেরকে অভিভূত করে।  

রুবাইদা আক্তার   এস এম