দেশের সেরা দুই রিসোর্ট, যেখানে না গেলেই নয়

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : সেরা দুই রিসোর্ট



সেরা দুই রিসোর্ট

ছবি : গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ


 যান্ত্রিক জীবনের কষাঘাতে মানুষের যখন দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম, তখন তার দরকার পরে প্রকৃতির সান্নিধ্য। স্বজন কিংবা বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে অথবা একা প্রকৃতির কাছে গিয়ে মুক্ত বাতাসে লম্বা একটা নিঃশ্বাস হতে পারে কার্যকর পাথেয়। প্রকৃতি কখনই নিরাশ করে না। আধুনিকতার আড়ালে আমরা এখন যন্ত্রমানবে পরিণত, নিশ্চিন্তে দম ফেলার মতো নির্মল পরিবেশ ও এখন দুর্লভ। কংক্রিটের দেয়ালে সবুজের বুনো ঘ্রাণ কি তা ই ভুলে গেছি। শহুরে জীবনে সেসব অলৌকিক। তবে নিরাশ হবার কিছু নেই, আধুনিক এই যুগেও প্রকৃতির নির্মল পরিবেশে কিছু বিলাসবহুল সুবিধা নিয়ে হাজির হয়েছে রিসোর্ট। যা প্রকৃতির খুব কাছে থেকে আধুনিক সব ব্যবস্থা করে রাখা। উন্নত বিশ্বের মতো আমাদের দেশেও এমন কিছু রিসোর্ট গড়ে উঠেছে যা প্রাকৃতিক-কৃত্রিম সুবিধা প্রদান করে থাকে। ট্র্যাভেল বাংলাদেশের পাঠকদের আজকের আয়োজনে থাকছে সিলেট বিভাগের সেরা ২টা রিসোর্ট সম্পর্কে বিস্তারিত।

গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ :

দীর্ঘ পথ জুড়ে সবুজ গালিচা, দু-দিকের ঢালের বাগান থেকে চা শ্রমিকরা নিপুন হাতে দুটি পাতা আর একটি কুঁড়ি সংগ্রহ করে ঝুলিতে ভরছেন। এরই মাঝে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে ছায়াবৃক্ষ, তাতে বসে কিচিরমিচির করে ডাকছে পক্ষীকুল। পিচঢালা পথে চলতে চলতে স্বর্গীয় অনুভূতি আপনাকে ছুঁয়ে যাবে। এমনই এক মায়াবী সৌন্দর্য্যে ঘেরা মৌলভীবাজার জেলায় নির্মিত হয়েছে দেশের প্রথম পাঁচ তারকা মানের হোটেল। সারি সারি চা-বাগানের মধ্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এক রাজ প্রাসাদের নাম গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ।


সেরা দুই রিসোর্ট

ছবি : গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ


দেশের সবচেয়ে বৃষ্টিপাতের অঞ্চল এই সিলেট এলাকা। বর্ষার থাকে অথৈ জল, শীতে শোনা যায় পাখির উল্লাস, বছরজুড়ে উদ্ভিদ-প্রাণী বৈচিত্র নিয়ে দূরের মানুষকে ডাকে। একদিকে বিশ্বের বৃহৎ হাওর হাকালুকি। সাথে দেশের অন্যতম বৃহৎ হাওর কাউয়াদীঘি আর বাইক্কাবিল খ্যাত হাইল হাওর। যেটি হাজারো পাখির কলতান, মাছ ও জলজ উদ্ভিদের আঁধার। আবার কোথাও গহীন অরণ্য; পাহাড়, নদী, সমতল। মিশ্র চিরহরিৎ বন লাউয়াছড়া কিংবা গগন টিলা। মাধবকুন্ড কিংবা হামহাম জলপ্রপাত। কোথাও লেক কিংবা পাহাড়ি ঝরনা। পাখিবাড়ি সহ নয়নাভিরাম প্রকৃতি। যেন পরতে পরতে সাজানো প্রকৃতির রূপকন্যা; উদ্ভিদ জীববৈচিত্রের সম্মিলন।

সেরা দুই রিসোর্ট

প্রাকৃতিক এই মনোরম পরিবেশের মধ্যেই ২০১৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর গ্র্যান্ড সুলতান আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। প্রথম বাংলাদেশি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এই রিসোর্টটিই প্রথম। সকল সুবিধাসহ প্রায় ২ লাখ বর্গফুট জায়গার ওপর গড়ে তোলা আটতলা ভবনে রয়েছে ১৩৫টি কক্ষ, এর মধ্যে ৪৫টি কিং সাইজ আর ৪৭টি কুইন সাইজ কক্ষ রয়েছে। এখানে একটি অসাধারণ নাইন হোল গলফ কোর্স ছাড়াও রয়েছে লন টেনিস, ব্যাডমিন্টন, বিলিয়ার্ড ও টেবিল টেনিস খেলার আয়োজন। এছাড়া শিশুদের জন্য আছে আলাদা খেলার জোন। রিসোর্টটিতে অ্যামিবা আকৃতির বিশাল সুইমিংপুলসহ সুনিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রার সর্বমোট ৩টি সুইমিংপুল আছে। রয়েছে মুভি থিয়েটার, যেখানে ৪৪ জন একসঙ্গে বসে এই থিয়েটারে সিনেমা উপভোগ করতে পারবে। দেশের কোন আনন্দ নিবাসে এই প্রথমবারের মত সুবিশাল পাঠাগার সংযোজিত হয়েছে বলে জানান গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট ও গলফ এর ভারপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার আরমান খান। গ্র্যান্ড সুলতানের সর্বনিম্ন রুম ভাড়া কিং ডিলাক্স ২৪,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ প্রেসিডেন্সিয়াল সুইট ৭৮,০০০ টাকা। তবে বিভিন্ন সময় এবং উপলক্ষে রুম ভাড়ার ওপর বিশেষ ছাড় দেয়া হয়। যোগাযোগ : +৮৮ ০১৭৩০ ৭৯৩৫০১-৪, +৮৮ ০১৭৩০ ৭৯৩৫৫২।


সেরা দুই রিসোর্ট

ছবি : গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ


যেভাবে যাবেন :

রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে রেল অথবা সড়কযোগে শ্রীমঙ্গল শহরে যাওয়া যায়। শহর থেকে আনুমানিক ৫ কিলোমিটার দূরত্বে ভানুগাছ-কমলগঞ্জ সড়কেই আপনাকে স্বাগত জানাতে দাড়িঁয়ে আছে 'গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট এন্ড গল্ফ'।

দ্যা প্যালেস লাক্সারি রিসোর্ট :

প্যালেস বা প্রাসাদ শুনলেই আমাদের চোখে অবকাঠামো ভেসে ওঠে তার সাথে তাল মিলিয়েই গড়ে তোলা হয়েছে এই রিসোর্টটি। সবুজে ঘেরা পাহাড়, গিরিখাদ, সরোবর, ঝরনা আর ৩০ হাজার গাছে ঢাকা ১৫০ একর ভূমিকে এমনভাবে সাজনো হয়েছে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না এতটুকু খুত। আর চারিদেকে চা বাগান, আনারস বাগান, রাবার বাগান আর লেবু বাগান দেখে মনে হবে যেন পুরো সিলেট দেখা হয়ে গেল এক স্থান থেকেই। রয়েছে বিদেশী পাইন আর দেবদারুর সাড়ি।




ছবি : দ্যা প্যালেস লাক্সারি রিসোর্ট


পাঁচ তারকা হোটেল বলতেই ইট পাথরের শহরের বিশাল অট্টালিকাকে বুঝালেও দি প্যালেস গড়ে উঠেছে প্রাকৃতিক পরিবেশে এবং প্রকৃতিকে বুকে ধারণ করে। আবাসনের জন্য এখানে রয়েছে পাহাড়ের চূড়ায় পাঁচ তারকাসুবিধা সমেত পাখিডাকা, ছায়াঢাকা ২৩টি ভিলা। এগুলোতে সব ধরনের সুযোগ সুবিধা রয়েছে। আর নামকরণে রয়েছে '৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি। আমেরিকায় মুক্তিযুদ্ধের তহবিল গঠনে কাজ করা পন্ডিত রবি শংকর ও জর্জ হ্যারিসনের নামে নামকরণ করা হয়েছে ভিলা দুটির।

ভাড়া :

২৩টি ভিলার মধ্যে ১ বেডরুমের ৮টি বাংলোর প্রতি রাতের ভাড়া ১৫ হাজার টাকা। ২ বেডরুমের ৮টি বাংলোর ভাড়া প্রতি রাতে ২৫ হাজার টাকা। ৩ বেড রুমের ৪টি বাংলোর ভাড়া প্রতি রাতে ৩৫ হাজার টাকা। ২টি প্রেসিডেন্সিয়াল ভিলার প্রতি রাতের ভাড়া ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা।

সেরা দুই রিসোর্ট

স্থাপত্য শৈলীর অনুপম নিদর্শন রয়েছে প্রধান টাওয়ার বহুতল ভবনটির। এটিতে থাকার জন্য আছে ১০৭টি রুম। আর রুমগুলো সাজানো হয়েছে প্রসাদ বলতে যা বুঝায় তার স্বার্থকতা নিশ্চিত করতে যা প্রয়োজন তার সবদিয়ে। রুমগুলোর ভাড়াও আলাদাভাবে নির্ধারণ করা। এক্সিকিউটিভ কিং ৫৫টি রুমের ভাড়া ১০ হাজার টাকা করে। সিগনেচার কিং ২২টি রুমের ভাড়া ১১ হাজার টাকা করে। আর সিগনেচার টুইন ৩০ রুমের ভাড়া ১২ হাজার টাকা করে।




ছবি : দ্যা প্যালেস লাক্সারি রিসোর্ট


দিনের বেলা পাখির ডাক আর রাতের বেলা ঝি ঝি পোকার ডাকের মাঝে প্রাকৃতিক পরিবেশে শোনা যায় শেয়ালের ঢাক। আর চোখে পড়বে খরগোসের দৌঁড়ঝাপ। এর বাহিরেও সুযোগ সুবিধার এত বেশী সমাবেশ যা বাংলাদেশের আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। প্যালেস কর্তৃপক্ষ অবশ্য দাবি করছে এটি এশিয়া মহাদেশের মাঝেই অনন্য। পাঁচ তারকা মানের এই রিসোর্টটিতে রয়েছে সার্বক্ষণিক জরুরী চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা। এছাড়াও, প্যালেসে রয়েছে চারটি বড় সভাকক্ষ, ৪০০ জনের ব্যাংকুয়েট হল, ছোটদের খেলার জায়গা তিনটা, বিলিয়ার্ড, ফুটবল, বাস্কেটবল, ২টি টেনিস কোর্ট, ব্যাডমিন্টন কোর্ট, ক্রিকেট নেট প্র্যাকটিস এর সুবিধা, দুটি জিম, রিমোট কন্ট্রোল কার রেসিংয়ের ব্যবস্থা।


দ্যা প্যালেস লাক্সারি রিসোর্ট

ছবি : দ্যা প্যালেস লাক্সারি রিসোর্ট


পুরুষ ও নারীদের জন্য রয়েছে আলাদা দুটো সুইমিং পুল। স্থাপত্যশৈলীর দেখা মেলে দুটি ঝুলন্ত সেতুতে। মসজিদটিতেও রয়েছে নির্মাণশৈলী। দুটো নিজস্ব বিদ্যুত কেন্দ্র থাকায় নেই কোন ভোগান্তি। চপার নামার হেলিপ্যাড আছে তিনটা। এগুলোও দেখার মত করে নির্মাণ করা হয়েছে। লেকে মাছ ধরা যায়। মাছ ধরার জন্য রয়েছে বড়শি আর আধারের ব্যবস্থা। এক সাথে ৫০ জন এখানে মাছ শিকার করতে পারবেন। তবে মাছ শিকারের পর তা রান্না করতে যেতে হবে রেস্টুরেন্টে। এর জন্য দিতে হবে চার্জ। এ ধরনের ৫টি রেস্টুরেন্ট রয়েছে প্যালেসে। এছাড়াও আরও অনেক সুবিধা মিলবে প্রকৃতির কোলে গড়ে তোলা এই রিসোর্টে।

আরো পড়ুন ঃ অমর একুশে গ্রন্থমেলা : ইতিহাস ও তাৎপর্য  

নাবিলা বুশরা এস এম